Published : 11 Dec 2025, 08:47 AM
মাত্র কয়েক দিন আগে ঘটেছে ঘটনাটি। তবে এই ধরনের ঘটনা হরহামেশাই ঘটে থাকে। সরকারি কর্মকর্তারা অধীনস্থদের ওপর ক্ষমতার দাপট দেখাবেন—এ আবার নতুন কী! অথচ কাগজে-কলমে এই ‘সিভিল সার্ভেন্ট’দের দাপট থেকে তো জনগণেরও নিষ্কৃতি মেলে না।
২০১৯ সালের একটি ঘটনা হয়তো অনেকের মনে থাকতে পারে, একজন যুগ্ম সচিবের গাড়ির অপেক্ষায় মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী ঘাটে তিন ঘণ্টা ফেরি দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। সেখানে ফেরি পার হওয়ার অপেক্ষায় থাকা অ্যাম্বুলেন্সে তিতাস ঘোষ নামে ১১ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রের মৃত্যু হয় সেদিন। সেই সময় সরকারের এটুআই প্রকল্পে দায়িত্বরত ওই যুগ্ম সচিব আবদুস সবুর মণ্ডল এখন কোথায় আছেন জানি না। তবে ওই ঘটনা যে হাই কোর্ট পর্যন্ত গিয়েছিল, তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়েছিল মনে আছে। এরপর সেই তদন্ত আমলাতন্ত্রের কোন কানাগলিতে হারিয়ে গিয়ে সেই খবর আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
ইউএনওসহ সরকারের মাঠপর্যায়ের হর্তাকর্তাদের ‘স্যার’ না ডাকার খেসারত সাধারণ মানুষকে দেওয়ার খবর শুনেছি বহুবার। সেই খবরের কিছু কিছু খবরের কাগজেও পড়েছি। বিসিএস কর্মকর্তাদের ভাই বা আপা না ডেকে ‘স্যার’ ডাকার জন্য সরকারি চিঠি দেওয়ার ঘটনা যতই হাস্যকর হোক, ঘটেছে অনেক জেলা-উপজেলায়।
অধস্তন কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে টেলিফোন আলাপে প্রতি বাক্যের আগে-পিছে ‘স্যার, স্যার, স্যার’ বলতে বলতে দাঁড়িয়ে যাওয়া—বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতার এই দীর্ঘদিনের ‘অভ্যস্ততা’ প্রশ্নাতীতভাবেই চর্চিত হচ্ছে। এটি নিয়ে সময়-অসময়ে আড়ালে আবডালে হাসাহাসি হলেও, এটিকে নিছক ‘অভ্যস্ততা’ কিংবা আমলাতন্ত্রের ঢং হিসেবে দেখা হলেও, মোটেও নিরীহ কোনো রেওয়াজ নয়; বরং এটাই আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার প্রকাশ্য প্রদর্শন। এর মধ্য দিয়ে শুধু ঊর্ধ্বতন ও অধীনস্থের মধ্যকার ক্ষমতার সম্পর্ক স্পষ্ট করা হয় না, বরং এর ব্যত্যয় ঘটলে তাকে ‘অসদাচরণ’ বলে গণ্য করে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি, সাময়িক বহিষ্কার কিংবা কারণ দর্শানোর মতো ঘটনাও হরহামেশাই ঘটেছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এমনই একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার কারণে আমলাতন্ত্রের দাপুটেপণার পাশাপাশি এক অমানবিক ক্ষত হিসেবেই যেন ফিরে এসেছে। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, এই ভিডিওটি করিয়েছেনও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের একজন—তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) নিজে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও অনুযায়ী ঘটনাটির স্থান ময়মনসিংহের একটি সরকারি হাসপাতাল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজি) মো. আবু জাফর আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে যান। যদিও জুতা নিয়ে হঠাৎ করে এভাবে অপারেশন থিয়েটারে যাওয়া কোনো ধরনের চিকিৎসা নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না। বোধ করি, এ বিষয়ে সকল চিকিৎসকই একমত হবেন। ইতোমধ্যে এ নিয়ে সমাজমাধ্যমে ব্যাপক বাহাস চলছে। কারণ অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশের সময় নির্দিষ্ট হাইজেন মেইনটেন করার কথা চিকিৎসকদের তরফ থেকে সব সময় বলা হয়ে।
তবে বিষয়টি ‘ঘটনা’ হয়ে ওঠে অপারেশন থিয়েটারের একটি টেবিলকে ঘিরে মহাপরিচালক ও সেখানকার চিকিৎসক ক্যাজুয়ালটি বিভাগের ইনচার্জ ধনদেব বর্মণের মধ্যকার বাগ্বিতণ্ডার সূত্রে। ভিডিওতে দুজনের তর্ক-বিতর্কে দেখা যায়, ডিজি ধনদেব বর্মণকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘হু আর ইউ’। এই প্রশ্নটি আপাত নিরীহ মনে হলেও নিরীহ কোনো প্রশ্ন নয়। যারা ভিডিওটি দেখেছেন, তারা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন—প্রশ্নকর্তা জানতেন, যাকে তিনি এই প্রশ্ন করেছেন, তিনি তারই সহকর্মী, তিনি একজন ডাক্তার; নইলে তার সেখানে থাকার কথা নয়। এই ‘হু আর ইউ’ মানে হলো—ধনদেব যে ক্ষমতাহীন, সেটি বুঝিয়ে দেওয়া।
এরপর আমরা দেখি, যখন সেই চিকিৎসক উত্তর দিচ্ছেন, তখন ডিজি তিনবার তার নাম জানতে চান। তার মানে কি এই—ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে ডিজি ‘জ্বি স্যার’, ‘ইয়েস স্যার’, ‘আপনি ঠিক বলেছেন স্যার’, কিংবা ‘এক্ষুনি টেবিলটি সরানোর ব্যবস্থা করছি স্যার’—এসব কথাই শুনতে চেয়েছিলেন? এর বিপরীতে যখন ডাক্তার বলেন, টেবিলটি অনেক দিন ধরেই ওই অপারেশন রুমে আছে এবং সেখানে চিকিৎসকেরা লেখালেখির কাজ করেন, তখন তার এই বক্তব্য ডিজির পছন্দ হয়নি। যার ফলেই আসে পরের প্রশ্ন—‘আপনি কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন, কথাবার্তা হুঁশ করে বলবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা ডিজির সঙ্গে এমন ব্যবহার করে, তারা রোগীর সঙ্গে কেমন ব্যবহার করে।’
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, ডিজির এসব কথার প্রতিবাদে চিকিৎসক ধনদেব বর্মণ তাকে সাসপেন্ড করার জন্য বলেন। কারণ তিনি জানেন, এর পরে কী হবে। তাই তিনিও জানিয়ে দেন, তিনি এগুলোতে ভয় পান না।
এর পরে অতি দ্রুত আরও কিছু বিষয় ঘটেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ক্ষমতা দেখিয়ে অতি দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করার কারণে সরকারি চাকরি বিধিমালার পরিপন্থী উল্লেখ করে চিকিৎসক ধনদেব বর্মণকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই দিন তিনি শোকজ নোটিশও পান। সংবাদমাধ্যম বলছে, ধনদেব ইতোমধ্যে শোকজের জবাব দিয়ে নিঃশর্ত ক্ষমাও চেয়েছেন।
এখন কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসা খুবই জরুরি। স্বাস্থ্যের ডিজি কী তার সহকর্মীর প্রতি সৌজন্যমূলক ব্যবহার করেছেন? ভিডিওটি দেখে আপনাদের কী মনে হয়েছে? ‘হু আর ইউ’ সাধারণ অর্থ হলো—‘তুমি বা আপনি কে’। কিন্তু এর রাজনৈতিক অর্থ হলো, আপনি কর্তৃত্বপূর্ণ এবং ক্ষমতাবান একটি সত্তার সামনে দাঁড়াচ্ছেন। এর কারণে এর পরেই যে বাক্যটি আসে—‘আপনি কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন?’ তার রাজনৈতিক মানে হলো, আমি অত্যন্ত ক্ষমতাবান একজন মানুষ, আমার সঙ্গে আপনার ‘জ্বি হুজুর’ টাইপ কথা বা তোষামোদী আলাপ ছাড়া অন্য কোনো কথা চলবে না।
অসৌজন্যমূলক ব্যবহার কিংবা বেয়াদবি কি শুধুমাত্র অধস্তনরাই করেন? ঊর্ধ্বতনরা কি পদ বা পদবির জোরে এর উর্ধ্বে থাকবেন? ঊর্ধ্বতনদের কোনো ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ বা প্রশ্ন করা যাবে না? তারা সবকিছুর উর্ধ্বে? তোষামোদীর ওপরই কি এই আমলাতন্ত্র টিকে আছে, টিকে থাকবে? তিনি চিকিৎসককে প্রশ্ন করেছেন, ‘যারা ডিজির সঙ্গে এমন ব্যবহার করে, তারা রোগীর সঙ্গে কেমন ব্যবহার করে।’ এই প্রশ্ন শুনে আমারও মনে হয়েছে, যারা সহকর্মীর সঙ্গে প্রতিনিয়ত ক্ষমতার চর্চা করে, তারা অন্যদের ভয় দেখায় এবং তা খুব দ্রুত বাস্তবায়ন করে। এ থেকেই বোঝা যায়, তারা সাধারণ মানুষ থেকে কতটা দূরে অবস্থান করছেন।
আমরা আসলে প্রশাসনিক আমলা বা ক্যাডার সার্ভিসের লোকজনকে অসীম ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে দেখি। কিন্তু ‘সিভিল সার্ভেন্ট’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো জনগণের সেবক। কিন্তু বাস্তবে তা উল্টো। জনগণ থেকে দূরে এবং সহকর্মীর সঙ্গে আচরণে প্রতিনিয়তই এই ধরনের ক্ষমতার হুঙ্কার ঊর্ধ্বতন ও অধস্তনের মধ্যে অস্বস্তিকর ভয়ের সম্পর্ককে স্পষ্ট করে।
‘আপনি কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন?’—এই ধরনের প্রশাসনিক হুমকিমূলক বাক্যের অর্থই হলো অধস্তনের প্রতি ভয়ভীতি প্রদর্শন করা। অর্থাৎ, আমি চাইলে আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারি। এই ধরনের হুমকি কেন? তাহলে সেই বিবেচনায় সেই ডিজির কি কোনো জবাবদিহির জায়গা থাকবে না? সরকারি চাকরির নিয়মে কি শুধুমাত্র অধস্তনের আচরণ—যা উর্ধ্বতনের কাঙ্ক্ষিত নয়—সেটিকেই অসৌজন্যমূলক আচরণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে? হুমকি-ধমকি দিয়ে কথা বলা তাহলে কি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাঙ্ক্ষিত এবং গ্রহণযোগ্য? এর বিরুদ্ধে কোনো আইন নেই? না থাকলে কেন নেই? এটি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ওপরের পদে চাকরি করলেই কি অধস্তনকে সব সময় ভয়ের মধ্যে রাখতে হবে? অধস্তনরা কি নিজেদের মতো কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না? কিংবা কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না? করলেই কি সেটি অসৌজন্যমূলক আচরণ বলে গণ্য হবে?
শব্দভাণ্ডারের প্রয়োগও ক্ষমতা-নিরপেক্ষ নয়। শুধু জনগণের সঙ্গে নয়, সহকর্মীদের সঙ্গেও আমলাতন্ত্রের এই কর্তৃত্ববাদী চরিত্র ক্রমশই মানুষ হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন করে দিচ্ছে। আর এই ধরনের শোকজ এবং অব্যাহতির অর্থই হলো ভয় দেখানো। তাই প্রশ্ন তুলতেই হবে, প্রতিবাদ জারি রাখতে হবে। অনেকেই বলেন, প্রতিবাদ করতে রুচিতে বাধে। কিন্তু এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে বলতে চাই, প্রতিবাদ করাই রুচিশীলতা। বলতে হবে—আপনাকে কেন চিনতে হবে? আপনার সামনে দাঁড়িয়ে কেন কথা বলা যাবে না?