রূপকথার ডাইনিরা কেন ঝাড়ুতে চড়ে উড়ে বেড়ায়?
এমন ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন চিত্রকর্মটি পাওয়া যায় ১৪৫১ সালের।
ডাইনি বা ‘উইচ’ শব্দটির কথা মনে হলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে রহস্যময়ী এক নারীমূর্তির ছবি। বিশাল এক টুপি মাথায় দিয়ে, নিশুত রাতে চাঁদের আলোয় ঝাড়ু বা ঝুলঝাড়ুর ওপর ভর করে অসীম আকাশে উড়ে চলেছে। রূপকথা, আধুনিক পপ কালচার, চলচ্চিত্রের জগৎ কিংবা হ্যালোউইনের উৎসবে ডাইনির এই রূপটি বেশ পরিচিত এবং একপ্রকার চিরাচরিত স্থান দখল করে নিয়েছে।
কিন্তু সাধারণ গৃহস্থালি ব্যবহারের জিনিসপত্র কীভাবে অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা এবং ডাইনিবিদ্যার মতো এক ভয়াল ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল? এর পেছনে রয়েছে সমাজবিজ্ঞান, ধর্মান্ধতা, লোকগাথা, হ্যালুসিনেটরি উদ্ভিদ এবং নির্যাতনের এক দীর্ঘ ও অন্ধকার ইতিহাস।
ঝাড়ু বা ঝাঁটা আদিকাল থেকেই মানুষের নিত্যদিনের জীবনের অংশ। যখন মানুষ গুহা থেকে বের হয়ে ঘরবাড়ি বানাতে শুরু করল, তখন থেকেই ঘরদোর পরিষ্কার রাখার প্রয়োজন দেখা দেয়। সে সময় গাছের ডালপালা, খড়কুটো বা শুকনো ঘাস একসঙ্গে বেঁধে ধুলাবালি পরিষ্কারের সরঞ্জাম তৈরি করা হতো। বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টেও এই সাধারণ ঝাড়ু দেওয়ার বা ঘর পরিষ্কারের উল্লেখ পাওয়া যায়।
ইংরেজিতে ‘ব্রুম’ (Broom) শব্দটি এসেছে ‘স্কচ ব্রুম’ নামক উদ্ভিদ থেকে। প্রাচীনকালে এই উদ্ভিদ ঝাড়ু বানানোর কাজে ব্যবহৃত হতো। প্রথম থেকেই এই সাধারণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজটি সমাজে নারী গৃহস্থালির কাজের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে। সমাজে নারীকে গৃহিণী হিসেবে প্রতিফলিত করার এক নীরব প্রতীক হয়ে ওঠে এই ঝাড়ু। কিন্তু এই অত্যন্ত নিরীহ ও সাধারণ বস্তুটি কীভাবে ডাইনিদের রহস্যময় যানবাহনে পরিণত হলো, তা সত্যিই বিস্ময়কর।
ঝাড়ুতে চড়ে উড়াল দেওয়ার সঙ্গে ডাইনিদের সম্পর্কের সূচনা কিন্তু কোনো নারীর মধ্য দিয়ে হয়নি, বরং ইতিহাসের নথিপত্র অনুসারে এই অপরাধে প্রথম স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন এক পুরুষ। প্যারিসের কাছে সেন্ট-জার্মেইন-এন-লে এলাকার একজন যাজক, যার নাম ছিল গিয়োম এডেলিন। ১৪৫৩ সালে তাকে ডাইনিবিদ্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। সেসময় চার্চ বা গির্জা ডাইনিদের বিরুদ্ধে যেসব সতর্কতা জারি করছিল, তার সমালোচনা করেছিলেন এই যাজক।
তবে গ্রেপ্তারের পর তার ওপর অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। মধ্যযুগীয় নির্মম নির্যাতনের মুখে তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হন যে তিনি ঝাড়ুতে চড়ে আকাশে উড়তেন। যদিও পরবর্তীকালে তিনি তার মত পরিবর্তন করে ক্ষমা চেয়েছিলেন, তবুও গির্জা তাকে আজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।
গিয়োম এডেলিনের ঘটনাটি ঘটেছিল পঞ্চদশ শতকে, তবে ততদিনে কিন্তু মানুষের মনে ডাইনিদের ঝাড়ুতে চড়ে ওড়ার ধারণাটি বেশ শক্তপোক্তভাবেই দানা বেঁধেছিল। ডাইনিরা ঝাড়ুতে চড়ে উড়ছে—এমন দৃশ্যময় ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন চিত্রকর্মটি পাওয়া যায় ১৪৫১ সালের একটি পাণ্ডুলিপিতে। ফরাসি কবি মার্তিন ল্য ফ্রাঁ-র লেখা ‘ল্য শাম্পিওঁ দে দাম’ (নারীদের রক্ষক) নামক পাণ্ডুলিপিতে দুটি ছবি আঁকা ছিল। এর একটি ছবিতে দেখা যায় একজন নারী ঝাড়ুর ওপর বসে আকাশে উড়ছেন, আর অন্য ছবিতে আরেকজন নারী সাধারণ একটি লাঠির ওপর সওয়ার হয়েছেন।
উভয় নারীই মাথায় বিশেষ ধরনের স্কার্ফ বা কাপড় প্যাঁচিয়ে ছিলেন, যা তৎকালীন ‘ওয়ালডেনসিয়ান’ নামক একটি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের পরিচয় বহন করত। দ্বাদশ শতকে গড়ে ওঠা এই সম্প্রদায়টিকে তৎকালীন ক্যাথলিক চার্চ ‘বিধর্মী’ বা হেরিটিক হিসেবে ঘোষণা করেছিল। চার্চের অসন্তোষের অন্যতম কারণ ছিল, এই সম্প্রদায়টি নারীদেরও যাজক বা পুরোহিত হওয়ার অনুমতি দিত। মূলত চার্চের চোখে ধর্মদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করা এই নারীদের ‘ভয়ংকর’ কিংবা ‘অতিপ্রাকৃতিক’ হিসেবে চিত্রিত করতেই প্রথম তাদের হাতে ঝাড়ু ও লাঠি তুলে দেওয়া হয়েছিল।
অন্য একদল ইতিহাসবিদ এবং গবেষকের মতে, ঝাড়ুর ওপর ভর করে ওড়ার এই রূপকের শিকড় রয়েছে প্রাচীন পৌত্তলিকদের উর্বরতা সম্পর্কিত নানাবিধ আচার-অনুষ্ঠানে। নৃতত্ত্ববিদ রবিন স্কেলটনের মতে, মধ্যযুগের শুরুর দিকে গ্রামীণ কৃষক সমাজ তাদের ফসলের ফলন ভালো করার জন্য নাচ ও আচারের আয়োজন করত। পূর্ণিমার রাতে দূর-দূরান্তের ফসলের মাঠে কৃষকরা জোয়ান বা খড় রাখার বাঁশ, পিচফোর্ক কিংবা ঝাড়ুকে দুই পায়ের মাঝে চেপে ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে নাচত।
তাদের বিশ্বাস ছিল, তারা যত উঁচুতে লাফাতে পারবে, সেই মৌসুমে শস্যের গাছও ততটাই উঁচু ও উর্বর হয়ে উঠবে। একে বলা হতো ‘ব্রুমস্টিক ড্যান্স’ বা ঝাড়ু নাচ। কিন্তু পরবর্তীতে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং ডাইনিভীতির যুগে সাধারণ কৃষকদের এই নির্দোষ লোকজ উর্বরতার আচারটিকে ডাইনিদের রাতের বেলার অশুভ মিলনমেলা এবং কামোদ্দীপক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। চার্চের লোকজন মনে করতে শুরু করে, এই লাফালাফি মূলত বায়ুমণ্ডলে উড়াল দেওয়ার এবং শয়তানের উপাসনা করার গোপন সংকেত।
ডাইনিদের উড়ন্ত যাত্রার পেছনে আরেকটি চমকপ্রদ ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে, যা তৎকালীন ভেষজবিদ্যা এবং হ্যালুসিনেটরি মলম বা ‘ফ্লাইং অয়েন্টমেন্ট’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। মধ্যযুগে অনেক নারীই ভেষজ ওষুধ ও গাছগাছড়া সম্পর্কে জ্ঞান রাখতেন। তবে সমাজ তাদের এই জ্ঞানকে অলৌকিক ও বিপজ্জনক হিসেবে দেখত। অভিযোগ ছিল, ডাইনিরা উড়তে পারার ক্ষমতা অর্জনের জন্য নিজস্ব কায়দায় গোপন মলম তৈরি করত।
ফার্মাকোলজিস্ট ডেভিড ক্রোল ব্যাখ্যা করেছেন যে, মধ্যযুগের এই নারীরা বিষাক্ত অথচ অনুভূতির পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম বেশ কিছু উদ্ভিদ ব্যবহার করতেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ডেডলি নাইটশেড, হেনবেন, ম্যানড্রেক এবং জিমসনউইড। এই গাছগুলোতে ‘ট্রোপেন অ্যালকালয়েড’ নামক রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা মানুষের শরীরে বিভ্রম, অবচেতনায় উড়াল দেওয়ার অনুভূতি এবং হ্যালুসিনেশন তৈরি করতে পারে।
তবে এই বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রণগুলো মুখে খাওয়া বিপজ্জনক ছিল, কারণ এতে পেটের রোগ বা তৎক্ষণাৎ মৃত্যুর ঝুঁকি থাকত। তাই তারা এই মলম বা তেল সরাসরি ত্বকের মাধ্যমে শরীরে শুষে নেওয়ার পথ বেছে নিতেন। বিশেষ করে যেসব জায়গায় ত্বক পাতলা এবং লোমকূপ বেশি, সেখানে এই ওষুধ দ্রুত কাজ করত। পঞ্চদশ শতকের ধর্মতত্ত্ববিদ জর্ডানেস দে বেরগামো লিখেছিলেন যে, সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে এবং ডাইনিরাও স্বীকার করে যে, কোনো বিশেষ রাতে তারা একটি কাঠের লাঠি বা ঝাড়ুর গায়ে এই তৈলাক্ত মলম মাখিয়ে নিত এবং সেই মলমমাখা লাঠির ওপর সওয়ার হতো, কিংবা শরীরের সংবেদনশীল স্থানে তা প্রয়োগ করত।
সেই তেলের প্রভাবে তাদের মধ্যে শারীরিক এক অনুভূতির সৃষ্টি হতো, যার ফলে তাদের মনে হতো তারা যেন মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অতিক্রম করে বাতাসের ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে। অর্থাৎ, বাস্তবে কোনো নারী আকাশে উড়তেন না; বরং রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট হ্যালুসিনেশন তাদের মনে ওড়ার অবাস্তব অনুভূতি তৈরি করত। আর সেই প্রক্রিয়ায় লাঠি বা ঝাড়ু ব্যবহার করার গল্পই লোকমুখে ছড়াতে ছড়াতে রূপকথায় রূপ নেয়।
এছাড়া লোকালয়ে প্রচলিত সাধারণ কিছু সামাজিক রীতিনীতিও এই কিংবদন্তিকে রূপ দিতে সাহায্য করেছিল। সপ্তদশ শতকের দিকে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে একটি প্রথা ছিল যে, কোনো গৃহিণী যখন কাজ বা প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যেতেন, তখন তিনি দরজার বাইরে বা চিমনির মুখে একটি ঝাড়ু দাঁড় করিয়ে রেখে যেতেন। এটি ছিল আশপাশের মানুষের জন্য সংকেত, যার অর্থ ‘ঘরের মালিক এখন বাড়িতে নেই’।
মানুষের এই প্রচলিত অভ্যাসের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে নতুন এক কাহিনির জন্ম হয়—ডাইনিরা নাকি রাতের আঁধারে ঘরের চিমনি দিয়েই ঝাড়ুতে চড়ে আকাশে উড়াল দেয়। যদিও বিচারে অভিযুক্ত ডাইনিদের মধ্যে খুব কমই চিমনি দিয়ে উড়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছিল, তবুও সাধারণ মানুষের কাল্পনিক ভয় এই রূপকথাকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যায়।
তবে মধ্যযুগে ডাইনিদের সম্পর্কে আমরা যেসব ভয়ংকর বিবরণ এবং তাদের নিজ মুখে ঝাড়ুতে চড়ে উড়াল দেওয়ার ইতিহাস পাই, তার বড় একটি অংশই কিন্তু নির্যাতনের ফসল। মধ্যযুগীয় ইউরোপে যখন ডাইনিদের শিকারের তাণ্ডব চলছিল, তখন ক্যাথলিক চার্চ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো হাজার হাজার নিরপরাধ নারী ও পুরুষকে গ্রেপ্তার করে। তাদের ওপর জল্লাদদের দিয়ে এমন অমানবিক যন্ত্রণা প্রয়োগ করা হতো যে, কেবল যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য ধর্মীয় বিচারকদের শিখিয়ে দেওয়া প্রতিটি কাল্পনিক গল্পকে সত্যি বলে মেনে নিত। তারা যা শুনতে চাইত—শয়তানের আরাধনা, ঝাড়ুতে চড়ে আকাশে ওড়া, শিশুর রক্ত পান করা—অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যন্ত্রণার চোটে সেগুলোর সবকটিতেই সম্মতি জানাত। ফলে সরকারি নথিপত্রে ডাইনিদের উড়াল দেওয়ার ঘটনাগুলো আইনি সত্য হিসেবে স্থান পেতে থাকে, যা প্রকৃতপক্ষে ছিল ধর্মান্ধতা এবং ক্ষমতার অত্যাচার।
অষ্টাদশ শতকে ইউরোপে যখন ‘জ্ঞানালোক’ বা এনলাইটেনমেন্টের যুগ শুরু হয়, তখন মানুষের চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন আসতে থাকে। অন্ধবিশ্বাস, ভয় এবং অলৌকিকতার স্থান দখল করতে শুরু করে বিজ্ঞান, যুক্তি এবং আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্র। ফলস্বরূপ, ডাইনিবিদ্যার প্রতি মানুষের সেই ভয় আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে আসে এবং ডাইনি শিকারের নির্মম প্রথা ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যায়।
সূত্র: হিস্ট্রি ডটকম
