গ্রুমিং: যে বিপদটি সম্পর্কে মা-বাবাদের জানতেই হবে
তারা নিজেদের শিশুদের কাছে ‘বয়স্ক বন্ধু’ বা ‘পথপ্রদর্শক’ হিসেবে উপস্থাপন করে।
আজ আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলব—‘গ্রুমিং’। এটি এমন একটি নীরব বিপদ, যা সম্পর্কে প্রত্যেক শিশু-কিশোর এবং অভিভাবকদের জানা দরকার। ‘গ্রুমিং’ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ধীরে ধীরে এবং কৌশলে শিশু-কিশোরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, আস্থা অর্জন করে, আর পরে তাকে যৌন নির্যাতনের শিকার করে।
এটি হঠাৎ ঘটে না; সপ্তাহ, মাস বা বছর ধরে চলতে পারে। আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, কেউ হঠাৎ করে আপনার সন্তান বা শিশু-কিশোরদের এত কাছে আসতে চাইছে কেন? কিন্তু তার আগে আমাদের জানা দরকার—শিশু কে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফ এর স্পষ্ট সংজ্ঞা দিয়েছে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী, শিশু হলো ১৮ বছরের কম বয়সি যেকোনো মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর ক্লিনিক্যাল গাইডলাইনে লেখা আছে, “শিশু বলতে ১৮ বছরের কম বয়সি যেকোনো ব্যক্তিকে বোঝায়, যা জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ”। ইউনিসেফ-এর শিশু-বান্ধব সংস্করণে সরল ভাষায় বলা হয়েছে, “শিশু হলো ১৮ বছরের কম বয়সি যেকোনো ব্যক্তি”। আমাদের শিশু-কিশোররা কি জানে, আইন অনুযায়ী তারা কত বছর পর্যন্ত শিশু?
‘গ্রুমিং’ সাধারণত কয়েকটি ধাপে করা হয়। প্রথমে অপরাধী এমন শিশুকে বেছে নেয়, যে একা, কম আত্মবিশ্বাসী বা পারিবারিক সমস্যায় আছে। তারপর উপহার, প্রশংসা, মনোযোগ দিয়ে আস্থা অর্জন করে। ধীরে ধীরে তাকে পরিবার ও বন্ধুদের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এরপর অশ্লীল কথা বা ছবি দিয়ে যৌন বিষয়ে অভ্যস্ত করে, আর শেষে ভয়, লজ্জা বা হুমকি দিয়ে চুপ করিয়ে রাখে।
কেউ যদি আপনার সন্তান বা শিশু-কিশোরদের গোপন কিছু করতে বলে, সেটা ভালোবাসা নাকি ফাঁদ? কেন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষরা কিশোরী বা তরুণীদের গ্রুমিং করে? এর পেছনে থাকে মানসিক ব্যাধি, ক্ষমতা প্রদর্শন, নিয়ন্ত্রণ, একাকীত্ব বা হীনম্মন্যতা। কিছু অপরাধীর মধ্যে শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ (পেডোফিলিয়া) থাকে, যা একটি মানসিক রোগ। আবার অনেকে নিজের ক্ষমতার অনুভূতি পেতে বা শিশুকে নির্ভরশীল দেখতে ভালোবাসে। আমরা কি কখনো ভেবেছি, একজন প্রাপ্তবয়স্ক কেন একটি শিশুর উপর এমন ক্ষমতা খাটাতে চায়?
‘গ্রুমিং’ করা ব্যক্তিদের মধ্যে সাইকোপ্যাথি ও নার্সিসিজম প্রবণতা বেশি। তাদের সহানুভূতি কম, অন্যের অনুভূতি বোঝে না, নিজের ভুলের জন্য অনুশোচনা করে না। তারা নিজেদের শিশুদের কাছে ‘বয়স্ক বন্ধু’ বা ‘পথপ্রদর্শক’ হিসেবে উপস্থাপন করে। একজন সত্যিকারের বন্ধু কি কাউকে পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে দেয়? মানসিক রোগের আন্তর্জাতিক বই ডিএসএম-৫ এবং আইসিডি-১১-এ ‘গ্রুমিং’ নিজে কোনো রোগ হিসেবে লেখা নেই। কিন্তু এর পেছনে থাকা ব্যক্তির মধ্যে পেডোফিলিক ডিসঅর্ডার (ডিএসএম-৫ কোড ৩০২.২; আইসিডি-১১ কোড ৬ডি৩২), অ্যান্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (এএসপিডি) এবং নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (এনপিডি) থাকতে পারে বলে বলা হয়েছে।
মনে রাখতে হবে—‘এএসপিডি’ মানে অ্যান্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার এবং ‘এনপিডি’ মানে নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার। আইসিডি-১১-এ পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারকে মৃদু, মধ্যম ও তীব্র ভাগে ভাগ করা হয়েছে। আমরা কি জানি, মানসিক রোগও অপরাধকে বাড়িয়ে দিতে পারে?
কী ভাবছি—শুধু মেয়েরাই গ্রুমিংয়ের শিকার হয়? না, ছেলেরাও হয়। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাইল্ডলাইট গ্লোবাল চাইল্ড সেফটি ইনস্টিটিউট-এর ২০২৬ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইন গ্রুমিংয়ের শিকার হওয়ার হার ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের প্রায় দ্বিগুণ—১৮ বছর হওয়ার আগে ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ মেয়ে এবং ১৯ শতাংশ ছেলে অনলাইন গ্রুমিংয়ের শিকার হয়। গত এক বছরের হিসাবে এই হার ৭ দশমিক ৪ শতাংশ মেয়ে এবং ৫ দশমিক ৩ শতাংশ ছেলে।
বাংলাদেশে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ৩০৬ জন মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যা ২০২৪ সালের পুরো বছরের ২৩৪টির চেয়েও বেশি। একই সময়ে ৩০ জন ছেলেশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যা ২০২৪ সালের মোট ৩৬টির প্রায় সমান। টিবিএস নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি চারজন মেয়েশিশুর মধ্যে একজন এবং প্রতি ছয়জন ছেলেশিশুর মধ্যে একজন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। আমরা কি জানি, ছেলেরাও চুপ করে থাকে, কারণ সমাজ বলে ‘ছেলে কাঁদে না’?
সমাজতত্ত্ব বলে, ‘গ্রুমিং’ শুধু একজন অপরাধীর কাজ নয়—এর গভীর সামাজিক শিকড় আছে। বাংলাদেশে শিশু যৌন নির্যাতনের প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে অপরাধী পরিবারের সদস্য, আত্মীয়, প্রতিবেশী বা পরিচিত কেউ। সামাজিক নীরবতা, লজ্জা আর ‘সম্মান রক্ষার’ মানসিকতা অপরাধীদের নিরাপত্তা দেয়। আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, কেন অনেক পরিবার নির্যাতনের কথা চেপে যায়?
অপরাধতত্ত্বের রুটিন অ্যাক্টিভিটি থিওরি বলে, অপরাধ ঘটাতে তিনটি জিনিস লাগে—উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধী, উপযুক্ত শিকার, আর সক্ষম অভিভাবকের অনুপস্থিতি। অনলাইনে সোশ্যাল মিডিয়া, মেসেজিং অ্যাপ ও গেমিং প্ল্যাটফর্ম অপরাধীদের জন্য এই সুযোগ তৈরি করে। ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৫৩ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কিশোর-কিশোরী অনলাইন গ্রুমিংয়ের শিকার। আপনি কি জানেন, আপনার সন্তানের অনলাইন বন্ধুটি আসলে কে হতে পারে?
পিতৃতন্ত্র হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে পুরুষের আধিপত্য, নারীর প্রতি নিয়ন্ত্রণ আর শিশুদের ‘বস্তু’ হিসেবে দেখা স্বাভাবিক। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ এর সবচেয়ে স্পষ্ট রূপ—১৮ বছরের কম মেয়েকে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দিলে তার সম্মতি থাকে না, সম্পর্কটি জবরদস্তিমূলক হয়। পরিবারের সম্মান রক্ষার জন্য অনেকে শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে সুনামকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কিন্তু ‘সম্মান রক্ষার’ নামে একটি শিশুর নিরাপত্তা কি বিসর্জন দেওয়া উচিত?
‘গ্রুমিং’ শব্দটি প্রথম কে ব্যবহার করেছিলেন, তা নিয়ে একক নাম নেই। ১৯৭০-এর দশকের শেষে মার্কিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তদন্তকারীরা এই শব্দ ব্যবহার শুরু করেন। এর তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে দেন এফবিআই-এর প্রাক্তন এজেন্ট কেনেথ ল্যানিং। তার মতে, গ্রুমিং হলো অহিংস কৌশল, যা শিশু নির্যাতনকারীরা শিকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবহার করে। ২০১৮ সালে জার্নাল অব ইন্টারপার্সোনাল ভায়োলেন্স-এ প্রকাশিত তার নিবন্ধ ‘দ্য ইভোলিউশন অব গ্রুমিং: কনসেপ্ট অ্যান্ড টার্ম’ হলো প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপনকারী কাজ।
বিশ্বে গ্রুমিংয়ের অনেক নথিভুক্ত ঘটনা আছে। যুক্তরাষ্ট্রে জেফরি এপস্টাইন ধনী ব্যক্তিদের নেটওয়ার্ক তৈরি করে কিশোরী মেয়েদের শোষণ করতেন। ল্যারি নাসার নামের এক ক্রীড়া চিকিৎসক শতাধিক তরুণী অ্যাথলেটকে নির্যাতন করেছিলেন। যুক্তরাজ্যে রচডেল গ্রুমিং গ্যাং-এর নয়জন সদস্য ২০১২ সালে দোষী সাব্যস্ত হয়; তাদের নেতা শাবির আহমেদ (যিনি ‘ড্যাডি’ নামে পরিচিত) ৩০টি ধর্ষণের দায়ে দণ্ডিত হন। বাংলাদেশে ২০২৩ সালে ১১ বছর বয়সি আরাবি ইসলাম সুবার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা অনলাইন গ্রুমিংয়ের সম্ভাব্য শিকার হিসেবে আলোচিত হয়। এই অপরাধীরা কীভাবে এত বছর ধরে পার পেয়ে গিয়েছিল?
এ অবস্থা থেকে বাঁচতে গ্রুমিংয়ের লক্ষণগুলো মনে রাখতে হবে: অচেনা প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে হঠাৎ ঘনিষ্ঠতা, ব্যাখ্যাহীন উপহার বা টাকা, ফোন-সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত গোপনীয়তা, পরিবার-বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যাওয়া, আর কারো সঙ্গে গোপনে দেখা করতে চলে যাওয়া। এ অবস্থায় কোথায় সাহায্য পাওয়া যাবে? মনে রাখতে হবে, আপনি একা নন। বাংলাদেশে শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮ আছে। এটি টোল ফ্রি, ২৪ ঘণ্টা খোলা এবং সম্পূর্ণ গোপনীয়। শিশু নির্যাতন, বাল্যবিবাহ বা যেকোনো বিপদে যে কেউ ১০৯৮-এ ফোন করতে পারে। এছাড়া জরুরি সেবার জন্য ৯৯৯, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ১০৯, আর সরকারি আইন সহায়তার জন্য ১৬৪৩০ আছে।
শিশু-কিশোরদের মনে রাখতে হবে, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক যদি তাকে গোপন কিছু করতে বলে, চাপ দেয়, বা পরিবারের অজানা সম্পর্ক তৈরি করে, তবে সেটি বিপদের সংকেত। সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবক, শিক্ষক বা বিশ্বস্ত কোনো প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে কথা বলতে হবে। শিশু-কিশোররা কখনোই দোষী নয়; দোষটি অপরাধীর। শিশু-কিশোরদের শেখাতে হবে, কী কী ধরনের গোপন কথা আর চেপে রাখা যাবে না।
‘গ্রুমিং’ নিজে রোগ নয়—এটি অপরাধ। কিন্তু এর পেছনে পেডোফিলিক ডিসঅর্ডার, অ্যান্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার-র মতো মানসিক ব্যাধি কাজ করে। সঙ্গে থাকে সামাজিক নীরবতা, অপরাধতাত্ত্বিক সুযোগ আর পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধ। তাই মোকাবিলায় দরকার অপরাধীর মানসিক মূল্যায়ন ও চিকিৎসা, সামাজিক সচেতনতা, আর পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন। আমরা কি এই পরিবর্তনের অংশ হতে চাই? আপনার সন্তানের সুরক্ষা সবার আগে।
