২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯ আশ্বিন ১৪৩৩

শার্টের ভাঁজে নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি

বেগুনি জর্জেটের ওপর হালকা গোলাপি আর পিচ রঙের বুনোফুল, প্রথম দেখাতেই শার্টটার ওপর মন আটকে গিয়েছিল নীরার।

মারিয়া সালাম মারিয়া সালাম

Published : 24 Sep 2026, 10:40 AM

Updated : 24 Sep 2026, 10:43 AM

শার্টটা গায়ে চাপাতেই কেমন একটা আঁশটে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের গন্ধ নাকে এসে লাগল। নাক কুঁচকে বাথরুমের চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে নিল নীরা। দেয়ালের স্যাঁতসেঁতে দাগ, কোণায় রাখা ভেজা মগ, সাবানের গন্ধ—সবই স্বাভাবিক। কয়েকবার গভীর শ্বাস নিয়ে বাতাসটাকে বুকের ভেতর টেনে নিল সে।

না, গন্ধটা বাথরুমের নয়। গন্ধটা আসছে ওর শরীর থেকে, আসলে শার্টটা থেকেই। মনে হচ্ছে যেন কাপড়ের আঁশের ভেতরে কোথাও শুকিয়ে আছে বহুদিনের পুরোনো রক্ত। মৃত মানুষের শরীর থেকে যে গন্ধ ধীরে ধীরে বাতাসে মিশে যায়, ঠিক তেমন। অথচ গতকাল রাতেই সে নিজে ভালো করে শার্টটা ধুয়েছে। দুবার ডিটারজেন্ট, একবার ভিনেগার, শেষে ল্যাভেন্ডার ফ্যাব্রিক সফটনার দিয়ে ভালো করে ধুয়ে বারান্দায় শুকাতে দিয়েছিল সেটা।

শুকিয়ে যাওয়ার পরও নাকের কাছে নিয়ে শুঁকেছিল কয়েকবার। কোথাও কোনো গন্ধ ছিল না। কিন্তু, আজ সকালে শার্টটা পরতেই মাথা ভারি করা আঁশটে গন্ধটা টের নীরা। মৃত মানুষের শরীরে যেমন গন্ধ থাকে, ঠিক তেমন। শুধু আঁশটে গন্ধই নয়, কাপড়টা শরীর ছোঁয়া মাত্র মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে এল শীতল, রক্তহিম করা একটা স্রোত। এই দমবন্ধ তীব্র গরমেও নীরার শরীরে কাঁটা দিল। শরীরের ভেতর থেকে কাঁপুনিটা টের পেল ও। মনে হলো, কেউ যেন বরফ শীতল হাতে দুই কাঁধ চেপে ধরেছে, দম নিতেই কষ্ট হচ্ছে।

এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল নীরা। মনে হলো, কাপড়েও যদি স্মৃতি থাকে, তবে এই শার্টের স্মৃতিগুলো বোধহয় জীবিত নেই। ভাঁজে ভাঁজে রয়ে গেছে শুধু এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য। শার্টটা নীরা কিনেছিল ফেইসবুকের একটা পেইজ থেকে, সেকেন্ড-হ্যান্ড কাপড়ের পেইজ। নতুন জামাকাপড় পরার শখ তার ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু শখ আর সামর্থ্য সবসময় এক বিছানায় ঘুমোয় না। টানাটানির সংসারে মাসের এই শেষ দিকটায় ওর হাতে যে টাকা থাকে তাতে নিজের জন্য নতুন কিছু কেনা বিলাসিতা। তাই পুরোনো কাপড়ের ভেতরেই নতুন আনন্দ খুঁজে নিয়েছিল নীরা।

বেগুনি জর্জেটের ওপর হালকা গোলাপি আর পিচ রঙের বুনোফুল, প্রথম দেখাতেই শার্টটার ওপর মন আটকে গিয়েছিল নীরার। ছবির ভেতরেও কাপড়টার মধ্যে অদ্ভুত এক শান্তি ছিল। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজে নিজেই বলল যে, শান্তিটা যে এমন গা ছমছমে শীতল হবে, সেটা তো আগে বুঝিনি। দ্বিধা নিয়ে শার্টের প্রথম বোতামটা খুলে কী মনে করে আবার সেটা লাগিয়ে বাথরুম থেকে বের হলো নীরা। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে রান্নাঘরে মায়ের কাছে গিয়ে বলল, “মা, দেখতো শার্টটা থেকে কোন পচা গন্ধ পাচ্ছ কিনা?”

রোকেয়া বেগম বিরক্তি নিয়ে শার্টের এককোণা টেনে শুঁকে দেখে বলল, কই নাতো! পরক্ষণেই মেয়ের দিকে তাকিয়ে উনি কিছুটা আহ্লাদ নিয়ে বললেন, “এই, এই শার্টে তো তোকে বেশ ভালো মানিয়েছে, কিশোরীদের মতো উচ্ছল লাগছে।” মায়ের কথায় কিছুটা স্বাভাবিক হলো নীরা। শরীরে তীব্র অস্বস্তি নিয়েও শার্টটা পরেই অফিসের জন্য বের হলো। কিন্তু, শরীর হিম করা অদ্ভুত ভাবটা থেকেই গেল আর দুপুর হতে না হতেই শরীর কেঁপে এল জ্বর। এরপর, টানা সাতদিন যেন যমে মানুষে টানাটানি।

কিছুটা সুস্থ হয়েই নীরা ভাবল, শার্টটাই অশুভ, সেটাই সবার প্রথমে ফেলে দিতে হবে। আলমারিতে ঝুলিয়ে রাখা শার্টটা বের করে কিছু একটা ভাবল নীরা। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েই সেটাকে যত্ন করে আবার আলমারির ভেতরে রাখল। কপাট লাগাতে গিয়ে ওর মনে হলো কিছু একটা ওকে যেন ধরে রেখেছে। আলতো হাতে শার্টটা ছুঁতেই কার যেন উপস্থিতি টের পেল নীরা। সেই গা ছমছমে অনুভূতি, সেই রক্তের গন্ধ। ঘরের বাতাসে সেই দমবন্ধ ভাবটা টের পেতেই কিছুটা আতঙ্ক নিয়েই দ্রুত আলমারির পাল্লাটা বন্ধ করে দিল ও।

আলমারি বন্ধ করেই মোবাইল ফোনটা হাতে নিল নীরা। কাঁপা কাঁপা দুর্বল হাতে ফেইসবুকে পুরাতন কাপড়ের সেই পেইজটার নাম লিখে সার্চ দিল। পেইজটা খুঁজে পাওয়া গেল না, কিছুতেই না। চিন্তিত মুখে ফেইসবুকে স্ক্রল করতে করতেই একটা ছবিতে গিয়ে আঙুল থেমে গেল নীরার। এক কিশোরীর হাসিহাসি মুখের ছবি, পরনে সেই বেগুনি শার্ট! ক্যাপশনে লেখা “নিখোঁজ”। নিচে মেয়েটার বিস্তারিত বর্ণনা আর বাসার ঠিকানা লেখা। বয়স লেখা পনেরো।

শার্টের পকেটের নিচে রিফুর দাগটাই সবচেয়ে প্রথমে চোখে পড়ল নীরার। কাঁপাকাঁপা হাতে আলমারি থেকে নিজের শার্টটা নামিয়ে দেখল, সেই একই রিফু। অফিস শেষ করে সেদিন যখন বাড়িটার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সে, তখন সন্ধ্যা নেমেছে গাঢ় হয়ে। গলির শেষ মাথায় পুরোনো একতলা বাড়ি। বাইরের দরজার পাশে শুকিয়ে যাওয়া কয়েকটা মানিপ্ল্যান্ট, বোঝা যাচ্ছে বহুদিন হলো টবগুলোতে আর কেউ যত্ন করে পানি দেয় না।

কাঁপা কাঁপা আঙুলে কলিংবেলটা চেপে অপেক্ষায় থাকল নীরা। দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন মাঝবয়সি এক ভদ্রলোক। ক্লান্ত আর বিমর্ষ চেহারা। চোখে একরাশ কৌতূহল নিয়ে ভদ্রলোকটি বললেন, “জি বলুন।” কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে নীরা বলল, “আসলে ফেইসবুকে নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তিটা দেখেই এসেছি।” ভদ্রলোকের দৃষ্টি হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। একধাপ সামনে এসে উনি প্রায় চিৎকার করে বললেন, “মৃন্ময়ীর কি খোঁজ পাওয়া গেছে? আপনি কি পুলিশের লোক?”

প্রশ্ন শুনে অস্বস্তিটা আরো বেড়ে গেল নীরার। আসলে কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। ফেইসবুকে পুরোনো শার্ট কেনার গল্প বললে, নিজেই হয়তো আরেক নতুন ঝামেলায় পড়ে যেতে পারে। সেটা ভেবেই হড়বড় করে মিথ্যাটা বলে ফেলল নীরা, “আসলে আমি পাশেই থাকি তো, ওকে দেখেছি কয়েকবার। কাল হঠাৎ ফেইসবুকে নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তিটা দেখে খারাপ লাগল। ভাবলাম, একটু খোঁজ নিয়ে যাই।” আগের সেই মলিন কণ্ঠে ভদ্রলোক বললেন, “বুঝলেন, মেয়েটা সবসময় ঘড়ি ধরে বের হতো আবার ঘড়ি ধরেই ফিরত। বাড়ি, স্কুল আর প্রাইভেট পড়তে যাওয়া, এর বাইরে কোথাও তো যেত না। কিন্তু, সেদিন যে প্রাইভেট পড়তে বের হলো, তারপর আর ফিরে এল না।”

বাইরের ঘন হয়ে আসা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে উদাস কণ্ঠে ভদ্রলোক আবার বললেন, “জানেন, আমার মেয়েটা এই অন্ধকার খুব ভয় পেত। একা থাকতে আরো ভয় ওর। মাঝে মাঝে সন্ধ্যার দিকে এই বাগানের গাছগুলোতে যখন ও পানি দিত, তখনও আমি জানালার ফাঁক দিয়ে ওকে এসে দেখে যেতাম।” এতক্ষণে নীরা লক্ষ্য করল, ঘরের একটা জানালা বাগানের দিকে আধখোলা। হয়তো প্রতিদিনই খোলা থাকে। হয়তো ভদ্রলোক প্রতিদিনই মনে মনে ভাবেন—আজ মৃন্ময়ী ঠিকই সময়ের কাঁটা ধরে ফিরে আসবে।

কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে নীরা, নতুন করে আর একটাও মিথ্যা বের হয় না ওর মুখ থেকে। আর কোন প্রশ্নও করতে পারে না নীরা। কিছু বাড়ির বাতাসে শোক এত ঘন হয়ে থাকে, সেখানে একটা শব্দও অনেক ভারী হয়ে যায়। নীরা বুঝতে পারে, মৃন্ময়ী এখন আর কোনো নিখোঁজ রহস্য না, একটা আস্ত কিশোরীর অসমাপ্ত গল্প। পৃথিবীতে হারিয়ে যাওয়া আর মারা যাওয়া এক কথা না। মৃত্যুর একটা শেষ আছে, কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার কোন অন্ত নেই। যে সন্তান হারিয়ে যায়, সে প্রতিদিনই বাবা-মায়ের অপেক্ষার জগতে বেঁচে থাকে। আর যারা অপেক্ষা করে, তারাও প্রতিদিন একটু একটু করে কোথায় যেন হারিয়ে যায়, নিজের মনে মনে ভাবল নীরা।

সন্ধ্যার ম্লান আলোতে নীরার রিকশা যেন বাতাস কেটে ভেসে চলল বাড়ির দিকে। আর নীরার চিন্তায় সেসব নাম না জানা হাজারো হারিয়ে যাওয়া শিশুর কথা। এদেশে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুরা, একজন বা দুজন নয়, শতশত শিশু নিখোঁজের তালিকায়। তাদের মধ্যে কেউ ফেরে লাশ হয়ে, কেউ আর ফেরে না।

সেদিন রাতে আবার শার্টটা বের করে গায়ে জড়িয়ে ধরলো নীরা। কাঁপুনি দিয়ে সেই জ্বরটা আবার ফিরল, একশো দুই, একশো তিন, থার্মোমিটারের পারদ যখন শেষ দাগ ছুঁইছুঁই, তখন শার্টটা আবার আলমারিতে ঝুলিয়ে দিল নীরা। ইদানিং সেই শার্ট পরেই অফিস করে সে, ঘোরের মধ্যেই বাসে ওঠে, ফাইল গুছিয়ে রাখে, ই-মেইল লেখে, মিটিং করে। চারপাশের কেউ টেরই পায় না, তার শরীর আগুনে পুড়ছে। জ্বরের ঘোরে পৃথিবীটা ঝাপসা হয়ে আসে ওর। সেই ঝাপসা আলোয় নীরার মনে হয়, সে একা নয়, অথবা মৃন্ময়ী একা নয়। দুজনই নিঃশব্দে আঁকড়ে ধরে একে অন্যকে, কোন কথা হয় না তাদের, তবুও সংযোগ হয়, পাশাপাশি চলা হয়। কেউ একজন আরেকজন মানুষের শরীরের সামান্য উষ্ণতা ধার করে বেঁচে থাকে।

মাঝে মাঝে মেটে মলাটের ডায়েরিটা বের করে ঘোরের মধ্যে নীরা দুকলম লেখে, প্রকৃতি হয়তো এভাবেই রহস্য রাখতে চায়, মৃন্ময়ীদের নিঃসঙ্গ হতে দিতে চায় না। পুরোনো শার্ট কেনা, ফেইসবুকে হঠাৎ করেই নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি ভেসে ওঠা বা অনলাইন পেইজের গায়েব হয়ে যাওয়া, সবই একটা সংযোগ, একটা অসমাপ্ত গল্প। পৃথিবীর মানুষেরা মনে হয় কোনো একটা অদৃশ্য তরঙ্গের মাধ্যমে একজন আরেকজনের সঙ্গে যুক্ত থাকে। মৃন্ময়ী হয়তো তার তরঙ্গে আমাকেই পেয়েছে। মানুষ যেমন ঘর খোঁজে, তেমনি কিছু স্মৃতিও আশ্রয় খোঁজে। কিছু অপেক্ষা থাকে, যাদের কোনো ঠিকানা নেই। তারা হয়তো কোনো পুরোনো শার্টের ভাঁজে, কোনো বইয়ের পাতায়, কোনো চিরকুটের কালি হয়ে বছরের পর বছর অপেক্ষা করে।

বাড়ির শিশুরা নিখোঁজ হলে শুধু সে-ই হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় না তার বিছানার উষ্ণতা, তার আলমারিতে ভাঁজ করে রাখা কাপড়ের পরিচিত গন্ধ, তার অসমাপ্ত কথা। যে জানালাটা মৃন্ময়ীর ফেরার অপেক্ষায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় খোলা থাকে, সেটাও হয়তো ভাবে, বাড়ি বলে কোথাও একটা জায়গা আছে। সেখানে কেউ একজন আছে, যার কাছে ফিরে গিয়ে মাথাটা একবার রেখে বলা যায়—“আমি ফিরে এসেছি।”

কিন্তু, মৃন্ময়ীরা যখন ফিরতে পারে না, তখন হয়তো তার নিঃসঙ্গতা একটা শরীরের স্পর্শ খোঁজে, মানুষের উষ্ণতা খোঁজে। হয়তো এই শার্টটাও সেই অপেক্ষারই একখণ্ড চিহ্ন। শার্টটা যতবার নীরা পরে, তার শরীর জ্বরে পুড়ে, তীব্র শ্বাসকষ্ট হয়। তবু সে শার্টটা ফেলে দিতে পারে না। নীরার মনে হয়, এই জ্বর তার একার নয়। এই কাঁপুনি হয়তো আরেকটি শরীরের শীত। এই দমবন্ধ হওয়া অনুভূতি এমন একজনের, যে অনেক দূর হেঁটে আর বাড়ি পৌঁছাতে পারেনি। অথচ, বাড়ি ফেরার প্রবল ইচ্ছেটা তার থেকে গেছে।

পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী জিনিস বোধহয় শোক নয়। একজন শিশুকে মমতা নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়ার মতো কেউ পাশে নেই—এই অনুভূতিটাই মনে হয় তার জন্য সবচেয়ে ভারী। ডায়েরির পাতা উল্টে নীরা লিখতে থাকে, শার্টটা শরীরে থাকলে মনে হয়, দীর্ঘদিন পরে একটা নিঃসঙ্গ শিশু একটু নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে। নীরা ফিসফিস করে বলে, “যদি কোথাও সত্যিই বাড়ি বলে কিছু থেকে থাকে... তুমি একদিন সেখানে পৌঁছে যেও। আর যদি না পারো, যতদিন মন চায় আমার সঙ্গে থেকো। একা থেকো না।”