১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

১৫০ বছর আগে দস্তয়েভস্কি যেভাবে ‘ফেইসবুক’ চালাতেন

তিনি এমন এক অভিনব পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন, যা তাকে সরাসরি পাঠকের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।

১৫০ বছর আগে দস্তয়েভস্কি যেভাবে ‘ফেইসবুক’ চালাতেন
ফিওদর দস্তয়েভস্কি (১৮২১-১৮৮১), ছবি: গেইটওয়ে টু রাশিয়া

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 05 Oct 2025, 09:33 AM

Updated : 26 Aug 2026, 02:24 PM

আজকের যুগে লেখকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেন, পাঠকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন। রয়েছে ফেইসবুক, টুইটার ও ইউটিউবসহ যোগাযোগের নানা মাধ্যম। কিন্তু আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে, যখন ইন্টারনেটের অস্তিত্ব ছিল না, তখন রাশিয়ার বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক ফিওদর দস্তয়েভস্কি এমন এক অভিনব পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন, যা তাকে সরাসরি তার অসংখ্য পাঠকের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। 

তার এই প্রয়াস ছিল পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন। ১৮৭৩ সালের ঘটনা। দস্তয়েভস্কি তখন ‘গ্রাঝদানিন’ (নাগরিক) নামক একটি সুপরিচিত পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। এই পত্রিকায় তিনি ‘একজন লেখকের ডায়েরি’ শিরোনামে কলাম লেখা শুরু করেন। 

কিন্তু পত্রিকার নির্দিষ্ট সম্পাদকীয় নীতি বা কাঠামো দস্তয়েভস্কির মতো স্বাধীনচেতা লেখকের জন্য যথেষ্ট ছিল না। তিনি অনুভব করলেন, আরও বৃহত্তর পরিসরে, কোনো প্রকার সীমাবদ্ধতা ছাড়াই নিজের ভাবনা, সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে নিজের গভীর পর্যবেক্ষণগুলো সরাসরি পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। এই চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় এক নতুন ধারণা, সম্পূর্ণভাবে একজন লেখকের দ্বারা প্রকাশিত একটি মাসিক পত্রিকা! 

এটি ছিল সেই সময়ের জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। পাঠকসমাজ শুরুতে কিছুটা বিস্মিত হয়েছিল, “এটা কি কোনো ম্যাগাজিন, নাকি বই?” এই প্রশ্নই তাদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল, কারণ তারা এমন ব্যক্তিগত প্রকাশনার সঙ্গে পরিচিত ছিল না।

দস্তয়েভস্কির এই একক লেখকের মাসিক পত্রিকাটি নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করে ১৮৭৬ সাল থেকে। প্রথমে ১৮৭৬-১৮৭৭ সাল পর্যন্ত, এবং পরবর্তীতে ১৮৮০-১৮৮১ সাল পর্যন্ত এটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে। দস্তয়েভস্কি নিজেই এর স্বরূপ বর্ণনা করে বলেছিলেন, “এক মাসে ব্যক্তিগতভাবে আমাকে তা নাড়া দিয়েছে।” আর এই উক্তি থেকেই বোঝা যায়, কেন এই ‘ডায়েরি’ এত বিচিত্র বিষয়ে সমৃদ্ধ ছিল।

এর পাতায় উঠে আসত জীবনের নানা অনুষঙ্গ, যা একজন লেখকের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ও চিন্তার গভীরতাকে প্রকাশ করত। ছিল শিশু ও শৈশবের আনন্দ-বেদনা, যুব সমাজের সমস্যা, কৃষকদের মুক্তি এবং তাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন। রাশিয়া ও ইউরোপের পারস্পরিক সম্পর্ক, জাতীয় পরিচিতির জটিল প্রশ্ন, ফরাসি প্রজাতন্ত্রের ঘোষণা, পূর্বাঞ্চলীয় প্রশ্ন এবং সার্ব ও মন্টেনিগ্রোবাসীদের স্বাধীনতা যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ঘটনাবলিও স্থান পেত।

শুধু তাই নয়, উঠে আসতো আত্মহত্যা এবং এর কারণ, মানুষের আধ্যাত্মিক জগত, বিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং তার প্রভাব। সমসাময়িক সাহিত্যকর্মের পর্যালোচনা, নতুন বইয়ের আলোচনা এবং দস্তয়েভস্কির নিজস্ব ছোট গল্প বা কথাসাহিত্যও প্রকাশ পেতে থাকলো।

‘একজন লেখকের ডায়েরি’-এর কিছু পৃষ্ঠা, ছবি: গেইটওয়ে টু রাশিয়া

‘একজন লেখকের ডায়েরি’-এর কিছু পৃষ্ঠা,

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এসব বিষয় নিয়ে লেখাগুলো আসত কেবল একজন লেখকের কলম থেকে, স্বয়ং ফিওদর দস্তয়েভস্কির। এটি ছিল তার একার একটি মহাবিশ্ব, যেখানে তিনি নির্দ্বিধায় তার গভীরতম চিন্তা ও পর্যবেক্ষণগুলো প্রকাশ করতেন।

দস্তয়েভস্কির এই অভিনব উদ্যোগ কেবল নজিরবিহীনই ছিল না, এটি জনপ্রিয়তাও লাভ করেছিল। পত্রিকা ছাপা হতো প্রায় ৬ হাজার কপি, সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে নিশ্চয়ই উল্লেখযোগ্য। বিজ্ঞাপনে বলা হত, এটি প্রতি মাসের শেষ দিনে প্রকাশিত হবে এবং প্রতিটি সংখ্যার দাম হবে ২০ কোপেক। বার্ষিক গ্রাহকদের জন্য ছিল বিশেষ ছাড়, মাত্র ২ রুবলে পুরো বছরের সাবস্ক্রিপশন! অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই প্রকল্পটি কেবল স্বাবলম্বীই ছিল না, বরং লেখকের জন্য একটি স্থিতিশীল আয়ের উৎসও হয়ে উঠেছিল।

এই ডায়েরি দস্তয়েভস্কিকে সারা রাশিয়ার পাঠকদের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করেছিল। তিনি প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য চিঠি পেতেন। দস্তয়েভস্কি মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি চিঠি পড়তেন এবং অনেক চিঠির উত্তরও দিতেন। এই উত্তরগুলোও নিয়মিতভাবে ‘একজন লেখকের ডায়েরি’-তে প্রকাশিত হতো। এটি ছিল লেখকের সঙ্গে পাঠকের সরাসরি যোগাযোগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যা পাঠকের মনে লেখকের প্রতি একাত্মতা ও নির্ভরতার জন্ম দিত। পাঠক অনুভব করত যে, লেখক তাদের ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন।

‘একজন লেখকের ডায়েরি’-র শেষ সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৮১ সালের জানুয়ারি মাসে। এর ঠিক এক মাস পরেই, ১৮৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে, রাশিয়ার এই কিংবদন্তী সাহিত্যিক মারা যান। তিনি রেখে যান তার অমর সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি এই অনন্য ‘ডায়েরি’, যা প্রমাণ করে যে, কিছু কিছু দূরদর্শী মানুষ তাদের সময়ের চেয়ে বহু যোজন এগিয়ে থাকেন। 

দস্তয়েভস্কি কেবল একজন ঔপন্যাসিকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন পাঠকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের এক অভিনব পদ্ধতির পথিকৃৎ, যিনি নিজের ভাবনাগুলোকে একটি নতুন আঙ্গিকে জনসমক্ষে তুলে ধরার এবং পাঠকের সঙ্গে এক সেতু বন্ধন তৈরি করার সাহস দেখিয়েছিলেন। তার এই প্রয়াস আজও আমাদের মুগ্ধ করে এবং গণমাধ্যমের বিবর্তনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

সূত্র: গেইটওয়ে টু রাশিয়া