১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

স্মাইলি ফেইস: সাদামাটা ড্রয়িং যেভাবে গ্লোবাল আইকন হলো

এই হাসিমুখ বিক্রি করে কোম্পানিটি বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা আয় করে।

স্মাইলি ফেইস: সাদামাটা ড্রয়িং যেভাবে গ্লোবাল আইকন হলো
স্মাইলি ফেইসের স্রষ্টা হার্ভি বল। ছবি: পল কনরস/এপি

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 14 Sep 2026, 01:26 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:59 AM

প্রতিদিন স্মার্টফোনে চ্যাট করার সময় কতবার আমরা স্মাইলি বা হাসিমুখের ইমোজি ব্যবহার করি? শুধু কি চ্যাটবক্সে? টি-শার্ট, কফি মগ, চাবির রিং থেকে শুরু করে বিলবোর্ড—সব জায়গায় উজ্জ্বল হলুদ রঙের এই গোলাকার মুখটা আমাদের নিত্যসঙ্গী। 

কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই আইকনিক ‘স্মাইলি ফেইস’-এর জন্ম কোথায়? কীভাবে একটি সাধারণ স্কেচ পরিণত হলো কোটি ডলারের এক সাম্রাজ্যে? চলুন, ফিরে যাওয়া যাক ছয় দশক আগের সেই দিনটিতে।

সময়টা ১৯৬৩ সাল। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের ওরচেস্টার শহরের ‘স্টেট মিউচুয়াল লাইফ অ্যাসিউরেন্স কোম্পানি’ তখন একীভূত হয়েছে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। এই মার্জারের কারণে কর্মীদের মনমেজাজ বেশ খারাপ, কাজের পরিবেশেও থমথমে ভাব। কর্মীদের মানসিক অবস্থা চাঙ্গা করতে কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরা দ্বারস্থ হলেন হার্ভি রস বল নামের এক স্থানীয় গ্রাফিক আর্টিস্টের। তাকে বলা হলো এমন একটা কিছু ডিজাইন করে দিতে, যা দেখলে কর্মীদের মন ভালো হয়ে যায়।

হার্ভি খুব বেশি সময় নিলেন না। মাত্র দশ মিনিট সময় নিয়ে একটি হলুদ রঙের বৃত্ত আঁকলেন, কালো মার্কার দিয়ে তাতে দিলেন একটু অসমান দুটি বিন্দু (চোখ) আর চওড়া একটি বাঁকা দাগ (হাসি)। এই সাদামাটা কিন্তু দারুণ সংক্রামক ডিজাইনের জন্য হার্ভি পারিশ্রমিক হিসেবে পেলেন মাত্র ৪৫ ডলার!

ইতালির তুরিন ইউনিভার্সিটির গবেষক গ্যাব্রিয়েল মারিনো, যিনি ইন্টারনেট মিম ও ভাইরাল কালচার নিয়ে কাজ করেন, তার মতে— আধুনিক মার্কেটিংয়ের দুনিয়ায় স্টাইলাইজড হাসিমুখের প্রথম সার্থক প্রয়োগ করেছিলেন এই হার্ভি বল।

অবশ্য হার্ভি বলই যে প্রথম হাসিমুখ এঁকেছেন, তা কিন্তু নয়। গবেষকদের মতে, জড়বস্তুর মাঝে মুখাবয়ব খোঁজার একটা সহজাত মানসিক প্রবণতা মানুষের সবসময়ই ছিল। মানব সভ্যতার ইতিহাসে ১০ থেকে ২৭ হাজার বছর পুরোনো ফ্রেঞ্চ ও ইন্দোনেশীয় গুহাচিত্রেও এমন স্টাইলাইজড মুখের সন্ধান পাওয়া যায়। আমরা আসলে অবচেতনভাবেই আমাদের পছন্দের জিনিসগুলোতে একটা মানবিক রূপ দিতে চাই।

হার্ভি বলের আঁকা সেই হাসিমুখ স্টেট মিউচুয়ালের কর্মীদের মাঝে দারুণ সাড়া ফেলে। কোম্পানিটি হাজার হাজার পিন বা ব্যাজ তৈরি করে কর্মীদের মাঝে বিলিয়ে দেয়। কিন্তু এরপরই ঘটে ইতিহাসের অন্যতম বড় একটি ব্যবসায়িক ভুল। হার্ভি বল বা ওই ইনস্যুরেন্স কোম্পানি—কেউই এই যুগান্তকারী ডিজাইনের কপিরাইট বা স্বত্ব সংরক্ষণ করেননি। আর এই একটি ভুলের কারণেই অন্যের পকেটে ঢুকে যায় কোটি কোটি ডলার।

সত্তরের দশকে ফিলাডেলফিয়ার দুই ভাই বার্নার্ড ও মারে স্পেইন এই ডিজাইনের বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা দেখতে পান। কপিরাইট না থাকার সুযোগে তারা খুব সহজেই হাসিমুখের নিচে জুড়ে দিলেন একটি স্লোগান—‘হ্যাভ অ্যা হ্যাপি ডে’। ১৯৭১ সালে নিজেদের এই নতুন ডিজাইনের স্বত্ব নিয়ে নেন তারা। অভাবনীয় ব্যাপার হলো, মাত্র এক বছরের মধ্যে তারা এই স্মাইলি-সংবলিত পাঁচ কোটিরও বেশি পণ্য বিক্রি করে ফেলেন!

এর ঠিক পরের বছর, ১৯৭২ সালে ফ্রান্সে ফ্রাঙ্কলিন লুফরানি নামের এক ফরাসি সাংবাদিক এই হাসিমুখের নাম দেন ‘স্মাইলি’। তিনিও নিজের মতো করে এর ট্রেডমার্ক করে ফেলেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন ‘দ্য স্মাইলি কোম্পানি’। শুধু টি-শার্টে ছাপিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি, বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লাইসেন্সিং চুক্তি করেন। বর্তমানে ফ্রাঙ্কলিনের ছেলে নিকোলাস লুফরানি এই কোম্পানি পরিচালনা করছেন। জানলে অবাক হবেন, শুধু এই একটি হাসিমুখ বিক্রি করে কোম্পানিটি বছরে প্রায় ৫০ কোটি ডলার (প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা) আয় করে!

স্মাইলি শুধু একটা সাময়িক ট্রেন্ড হয়ে থাকেনি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি পপ কালচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ১৯৯৪ সালের বিখ্যাত ‘ফরেস্ট গাম্প’ সিনেমায় দারুণ এক দৃশ্যে দেখানো হয়—কাদামাখা মুখ মোছার পর হলুদ টি-শার্টে একটি স্মাইলি তৈরি হয় আর ফরেস্ট গাম্প বলে ওঠে, “হ্যাভ আ নাইস ডে!”

মূলত এই স্মাইলি ফেইসই হলো আজকের দিনের ইমোজির আদি পিতা। ১৯৮২ সালে কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞানী স্কট ফাহলমান কোলন আর ব্র্যাকেট দিয়ে :-) প্রথম ডিজিটাল ইমোটিকন তৈরি করেছিলেন। এরপর নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে দ্য স্মাইলি কোম্পানির নিকোলাস লুফরানি প্রথম স্মাইলির থ্রিডি ভার্সন তৈরি করে একটি ইমোজি ডিকশনারি বানান, যা আজকের দিনের আধুনিক ইমোজির পথ প্রশস্ত করে।

সবসময় যে কেবল ইতিবাচক অর্থেই স্মাইলি ব্যবহৃত হয়েছে, তা কিন্তু নয়। কখনো কখনো একে ব্যবহার করা হয়েছে প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি বিদ্রুপ বা ডার্ক হিউমার হিসেবে। আশির দশকের শেষের দিকে পশ্চিমা ‘রেভ কালচার’-এ উদ্দাম পার্টি বা এক্সট্যাসি পিলের গায়েও এর ব্যবহার দেখা যায়।

রক ব্যান্ড ‘নির্ভানা’র ফ্রন্টম্যান কার্ট কোবেইনের আঁকা স্মাইলির চোখে ছিল ক্রস (X) চিহ্ন আর জিভ ছিল একপাশে বের করা। এটি হয়ে উঠেছিল অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট বা প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্রোহের প্রতীক। অন্যদিকে, ১৯৮৬ সালের ‘ওয়াচমেন’ কমিকসে এই উজ্জ্বল হাসিমুখের ওপর রক্তের ছিটে দিয়ে এক ডার্ক বা অন্ধকার জগৎকে বোঝানো হয়েছিল।

নিজের সৃষ্টির এমন বাণিজ্যিকীকরণ ও নানা বিকৃত ব্যবহার দেখে স্রষ্টা হার্ভি বল হয়তো কিছুটা ব্যথিত হয়েছিলেন। তাই স্মাইলির মূল উদ্দেশ্য—অর্থাৎ মানুষের মাঝে নিঃস্বার্থ হাসি ও আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখতে ১৯৯৯ সালে তিনি ‘ওয়ার্ল্ড স্মাইল ডে’ (বিশ্ব হাসি দিবস) চালু করেন। প্রতি বছর অক্টোবরের প্রথম শুক্রবার দিবসটি পালিত হয়। ২০০১ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি এই দিনটির প্রচার করে গেছেন।

মাত্র ৪৫ ডলার পারিশ্রমিকে আঁকা দশ মিনিটের একটি সাদামাটা ড্রয়িং আজ দুনিয়াজোড়া এক কালচারাল আইকন। হার্ভি বল সেদিন হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি, তার আঁকা ওই দুটি সামান্য বিন্দু আর একটি বাঁকা দাগ একদিন পুরো বিশ্বকে হাসতে শেখাবে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান