চিয়াংলার চা-শাস্ত্র: সম্রাট শেন নং থেকে হাক্কা ঐতিহ্য
এখানে চা পরিবেশিত হয় বড় বাটিতে। আর এর নাম ‘লেই চা’।
ভ্রমণের সার্থকতা কেবল পাহাড়, নদী বা প্রাচীন স্থাপত্য দেখায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং অজানার মাঝে নিজেকে বা ইতিহাসের কোন শেকড় আবিষ্কার করার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আসল সৌন্দর্য। চীনের পথে পথে ঘুরতে গিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শহরগুলোর বাইরেও এমন এক প্রাচীন ও প্রথাগত চীনের দেখা মেলে, যা আজও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে।
ফুচিয়ান প্রদেশের সানমিং শহরের অন্তর্গত চিয়াংলা কাউন্টির ভ্রমণটি আমার কাছে ঠিক এমনই এক অভিজ্ঞতার জন্ম দিয়েছিল। সেখানে গিয়ে চীনের হাজার বছরের পুরনো চা-সংস্কৃতির এক ভিন্ন রূপের সঙ্গে পরিচয় তো হলোই, পাশাপাশি এক বাটি চায়ের মাঝে আমি খুঁজে পেলাম হাজার মাইল দূরের আমার নিজের দেশ বাংলাদেশকে।
চীনের চা-সংস্কৃতি বলতে গেলে মানুষের জীবন ও দর্শনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ‘টি অব ক্লাসিক’ বা চা-শাস্ত্র অনুযায়ী, কিংবদন্তি সম্রাট শেন নং-কে বিশ্বে প্রথম চা আবিষ্কারক হিসেবে ধরা হয়। থাং ও সং রাজবংশের স্বর্ণযুগে চা-পানের যে নান্দনিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল, মিং ও ছিং রাজবংশের সময়ে তা আরও বিস্তৃত হয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
অতিথিকে চা দিয়ে আপ্যায়ন করা চীনা সমাজের এক সুপ্রাচীন রীতি। কিন্তু চিয়াংলার চা যেন চেনা ছকের বাইরে। এখানে চা কেবল ছোট পেয়ালায় পরিবেশন করা হয় না, বরং পরিবেশিত হয় বড় বাটিতে। আর এর নাম ‘লেই চা’।
স্থানীয়দের কাছে লেই চা কেবল পানীয় নয়, এটি তাদের আত্মপরিচয় ও সুদীর্ঘ ইতিহাসের এক জীবন্ত স্মারক। ‘লেই’ (Lei) শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো কোনো কিছুকে গুঁড়ো করা বা পেষা। এই চায়ের ইতিহাস ঘাঁটলে শুধু হান রাজবংশ নয়, বরং বিখ্যাত ‘থ্রি কিংডমস’ বা তিন রাজ্যের আমলের এক রোমাঞ্চকর কিংবদন্তির খোঁজ পাওয়া যায়।
বলা হয়ে থাকে, থ্রি কিংডমস যুগে বিখ্যাত সেনাপতি ঝাং ফেইয়ের সৈন্যরা একবার এক অজানা মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। কোনো ওষুধেই যখন কাজ হচ্ছিল না, তখন এক বৃদ্ধ চিকিৎসক সেনাপতির কাছে এসে এক দাওয়াইয়ের কথা জানান। তিনি কাঁচা চা পাতা, কাঁচা আদা এবং কাঁচা চাল একসঙ্গে পিষে ফুটন্ত জল দিয়ে মিশ্রণ তৈরি করে সৈন্যদের পান করতে দেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ জাদুকরী পানীয় পান করার কয়েকদিনের মধ্যেই পুরো সেনাবাহিনী সুস্থ হয়ে ওঠে। সে যুগে এই পানীয়টিকে বলা হতো ‘সান শেং থাং’ বা ‘থ্রি লাইফ স্যুপ’ (তিন কাঁচা উপাদানের স্যুপ)। অনেকেই মনে করেন, এটিই ছিল বর্তমান লেই চায়ের আদি রূপ।
লেই চায়ের প্রকৃত বিকাশ ও বিস্তারের সঙ্গে চীনের বিখ্যাত ‘হাক্কা’ (Hakka) জনগোষ্ঠীর এক গভীর ও বেদনাবিধুর ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ‘হাক্কা’ শব্দের অর্থ হলো ‘অতিথি পরিবার’। প্রাচীনকালে যুদ্ধবিগ্রহ ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে চীনের উত্তরাঞ্চল থেকে এ জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে দক্ষিণের দিকে পরিযান করতে বাধ্য হয়। পাহাড়ি ও দুর্গম অঞ্চলে আশ্রয় নেওয়া এই যাযাবর মানুষদের কাছে লেই চা ছিল টিকে থাকার মোক্ষম হাতিয়ার।
দীর্ঘ যাত্রাপথে পুষ্টিকর খাবারের অভাব মেটাতে হাক্কা নারীরা চা পাতার সঙ্গে তিল, চিনাবাদাম, ভেষজ লতাপাতা এবং নানা ধরনের শস্যদানা পিষে সঙ্গে রাখতেন। এটি ছিল সহজে বহনযোগ্য। গরম পানি পেলেই এর সঙ্গে মিশিয়ে তারা এক ধরনের ঘন স্যুপ তৈরি করে খেতেন, যা তাদের সারাদিনের ক্লান্তি দূর করত এবং শরীরে শক্তি জোগাত। অর্থাৎ, যা একসময় ছিল যাযাবর মানুষের টিকে থাকার খাবার, তা-ই কালের বিবর্তনে পরিণত হয়েছে এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে। পরবর্তীতে হাক্কাদের এ দক্ষিণমুখী পরিযানের সঙ্গেই লেই চা ফুচিয়ান, গুয়াংদং ও চিয়াংশি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
চিয়াংলায় গিয়ে লেই চা তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটি কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল। এটি নিছক চা বানানোর কোনো যান্ত্রিক পদ্ধতি নয়, বরং পারিবারিক ও সামাজিক উদযাপন। এই চা তৈরির জন্য বিশেষ ধরনের মাটির পাত্র ব্যবহার করা হয়, এর ভেতরের দিকে খাঁজ কাটা থাকে। একে বলা হয় ‘লেইবো’। আর উপাদানগুলো পেষার জন্য যে কাঠের লাঠি বা দণ্ড ব্যবহার করা হয়, তাকে বলে ‘লেইগুন’।
মজার ব্যাপার হলো, এই দণ্ডটি সাধারণত পেয়ারা গাছ, চা গাছ বা ক্যামেলিয়া গাছের ডাল থেকে তৈরি করা হয়। কারণ পেষার সময় কাঠের যে সামান্য অংশ ক্ষয়ে চায়ের সঙ্গে মেশে, তা শুধু ভক্ষণযোগ্যই নয়, চায়ের স্বাদ ও সুবাস বাড়াতেও সাহায্য করে।
চা পাতা, তিল, চিনাবাদাম এবং নানা ধরনের স্থানীয় সবুজ ভেষজ উপাদান (যেমন—পুদিনা, ধনেপাতা বা মগওয়ার্ট) লেইবোতে নিয়ে লেইগুন দিয়ে পরম যত্নে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরানো হয়। উপাদানগুলো গুঁড়ো করার সঙ্গে সঙ্গেই চারপাশের বাতাসে মোহনীয় সুবাস ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ফুটন্ত গরম পানি মিশিয়ে, ছেঁকে নিয়ে তৈরি করা হয় ঘন সবুজাভ এই তরল। উপাদানগুলোর ভিন্নতার ওপর ভিত্তি করে লেই চায়ের স্বাদ ও ধরনও বদলে যায়।
চিয়াংলার মানুষের সামাজিক জীবনের প্রতিটি স্তরে লেই চা ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। আধুনিক শহুরে জীবনে মানুষ যখন ক্রমশ একা হয়ে পড়ছে, তখন চিয়াংলার মতো পাহাড়ি জনপদে এই চা এখনো সমাজকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। এখানে লেই চা কেবল পান করার বিষয় নয়, মূলত মানুষকে একত্রিত করার একটি উপলক্ষ।
শিশুর জন্মের পর যখন প্রথম মাস পূর্ণ হয়, তখন নতুন শিশুর আগমনী বার্তা সবাইকে জানাতে লেই চা তৈরি করে প্রতিবেশীদের বিলি করা হয়। নতুন ঘরে ওঠা, বিয়ে বা পারিবারিক কোনো বড় অনুষ্ঠানে এই চা অপরিহার্য। এমনকি পাড়ায় নতুন কোনো প্রতিবেশী এলে তাকে আপন করে নেওয়ার প্রথম ধাপই হলো এক বাটি লেই চা দিয়ে আপ্যায়ন করা। কোনো শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলে, তার বাবা-মা গর্বভরে শিক্ষকদের বাড়িতে ডেকে এনে এই চা দিয়ে সম্মান জানান।
স্থানীয়দের একটি বিখ্যাত প্রবাদই আছে, ‘এক বাটি লেই চা, এক পরিবার।’ অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আপনার সঙ্গে এক বাটি লেই চা ভাগ করে নিল, সে আপনার পরিবারেরই একজন হয়ে গেল। ২০০৭ সালে চিয়াংলার লেই চা প্রাদেশিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায় এবং ২০১৪ সালে হাক্কা লেই চা তৈরির কৌশলটি চীনের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান করে নেয়।
সব ইতিহাস আর সংস্কৃতি জানার পর সবচেয়ে আকর্ষণীয় যে দিকটি আমার মন ছুঁয়ে গেল, তা হলো এর পরিবেশন। আমার সামনে যখন লেই চায়ের বাটিটি এল, প্রথম চুমুকেই এক নতুন অথচ ভেষজ স্বাদের সঙ্গে পরিচয় হলো। বাংলাদেশের পরিচিত দুধ চা বা লাল চায়ের সঙ্গে এর সরাসরি কোনো মিল নেই, তবে ঘনত্বের কারণে দেখতে কিছুটা দুধ চায়ের মতোই লাগে। কিন্তু আসল চমকটি অপেক্ষা করছিল বাটির পাশে রাখা নাশতার প্লেটে। সেখানে জ্বলজ্বল করছে আমাদের অতি পরিচিত এক খাবার—মুড়ি!
হাজার মাইল দূরের এক অচেনা পাহাড়ি জনপদে, চীনের এক প্রাচীন সংস্কৃতির প্রতীক এক বাটি চায়ের পাশে মুড়ি দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। মনে হলো, হঠাৎ করে বাংলাদেশেরই একটি টুকরো যেন এখানে এসে হাজির হয়েছে। আমাদের দেশে চা কেবল পানীয় নয়; এটি সম্পর্ক, আড্ডা, আর আতিথেয়তার এক সার্বজনীন ভাষা। শহরের টং দোকান থেকে শুরু করে গ্রামের মেঠো পথ—সবখানেই চায়ের সঙ্গে মুড়ি খাওয়ার এক সাধারণ অথচ আপন অভ্যাস আমাদের রয়েছে। চিয়াংলায় বসে চায়ের সঙ্গে মুড়ির এ যুগলবন্দি দেখে এক নিমেষে সংস্কৃতির সব ভৌগোলিক দূরত্ব যেন ঘুচে গেল।
