২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫ কার্তিক ১৪৩৩

‘ওই টাইমটার মধ্যে কত হাজারবার যে কলেমা পড়ছি’

“আমরা প্রস্তুতি নিয়ে মতিনগর শরণার্থী ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। আমার কাঁধে অ্যামুনেশন ভরা একটা ব্যাগ।”

‘ওই টাইমটার মধ্যে কত হাজারবার যে কলেমা পড়ছি’
মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম স্বপন, ছবি: সালেক খোকন

সালেক খোকন সালেক খোকন

Published : 01 Dec 2025, 12:13 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:13 PM

মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম স্বপন। একাত্তরে ছিলেন মতিঝিল সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট স্কুলের (মতিঝিল সরকারি বালক বিদ্যালয়) এসএসসি পরীক্ষার্থী। তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন আগরতলায়, মেলাঘরে। 

তার ভাষায়, ট্রেনিংয়ে আমাদের ক্রলিং করায় নাই। কারণ হাতে দাগ পড়বে। ঢাকায় প্রবেশ করতে চেক করলে আর্মিরা বুঝে ফেলবে। তাই ক্রলিং ছাড়া সব হয়েছে। এলএমজিসহ সব অস্ত্র চালানো প্রশিক্ষণও করায়। তিন সপ্তাহের মতো ট্রেনিং হয়। আমরা ছিলাম ৫২ জন।

অগাস্টে ঢাকায় গেরিলারা অনেকেই ধরা পড়ে যায়। হাইড-আউট ক্যাম্পগুলোও ওপেন হয়ে যায় তখন। শহীদও হয় কেউ কেউ। ফলে একাত্তরের অগাস্টে ঢাকা ছিল গেরিলা অপারেশন মুক্ত। সেপ্টেম্বরের শেষদিকে স্বপনদের ভেতরে পাঠানোর নির্দেশ আসে। ৫০ জনের গ্রুপটাকে লিড করে রেজাউল করিম মানিক। 

গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু। ১০ জন করে মোট পাঁচটি সেকশন ছিল। সবাই ইন্ডিয়ায় হাইয়ার ট্রেনিং করা এবং মে মাস থেকেই বর্ডারেই ফাইট করছিলেন। শুধু স্বপন আর বাবলু ছিলেন ইয়ুথ ক্যাম্প ট্রেন্ড। 

যাত্রাপথের ঘটনা স্বপন বললেন যেভাবে, ভেতরে ঢোকার আগে হায়দার ভাই তিনটা নির্দেশনা দিয়েছিলেন, প্রথমত: তোমাদের ওপর যদি আর্মি অ্যাটাক করে তোমরা রিটান অ্যাটক করবা না। এটা করলেও আমাদের পরিকল্পনা ওপেন হয়ে যাবে। বরং ওরা অ্যাটাক করলে যেভাবেই হোক পালিয়ে নিজেকে সেভ করবা। 

দ্বিতীয়ত: দশজন মারা গেলেও একটা রাইফেল ফেরত আনতে হবে। ওয়ান রাইফেল ইস টু টেন মুক্তিযোদ্ধা।

তৃতীয়ত: রাতে মুভমেন্ট করবা। কিন্তু বর্ডার এরিয়ায় কেউ সিগারেট জ্বালাবে না। সিগারেট তোমার মৃত্যু ডেকে আনবে।

আমরা প্রস্তুতি নিয়ে মতিনগর শরণার্থী ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। আমার কাঁধে অ্যামুনেশন ভরা একটা ব্যাগ। বাঁ কাঁধে রাইফেল আর কেরোসিনের চুলার মতো দুটো অ্যান্টিট্যাঙ্ক মাইন। এগুলো নিয়ে হাঁটা-দৌড় দিয়ে এগোচ্ছি। টার্গেট হলো যত তাড়াতাড়ি পৌঁছতে পারি।

কসবা স্টেশনের কাছাকাছি তখন। এক বাঙালি যুবক দূরে বসা। শরণার্থী ক্যাম্পেই থাকে সে। ব্যঙ্গ করে দূর থেকে জোরে জোরে বলে, গাধার পিঠে বোঝা বেশি হলে গাধা হাঁটে না দৌড়ায়। 

শুনে মনটা খুব খারাপ হয়। কথাটা এখনও কানে বাজে ভাই। আমরা তো ওইপাড়ে সেইফ সাইডে চলেই গিয়েছিলাম। ট্রেনিং নিয়ে দেশকে বাঁচাতে আবার ভেতরে মরতেই ঢুকছি। সো আমরা ‘গাধা’। আর ওরা ওখানে বসে বসে রিলিফ খাচ্ছে। ওরা খুব ভালো। পরবর্তীতে কিন্তু এদের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার খাতায় নাম লিখিয়েছে, ভাতাও পেয়েছে!

তারপর কী করলেন? বর্ডারের কাছে একটা খাল পার হই সন্ধ্যার মধ্যেই। ভেতরে ঢুকছি। একজনের পেছনে আরেকজন। হাঁটু পর্যন্ত কাদার পথে। হাঁটছে সবাই। হঠাৎ লাইনটা দাঁড়িয়ে যায়। মানিক ভাই আমার ঠিক পেছনে। 

কী হলো সামনে? বলেই তিনি আমার কাছে তার ব্যাগ আর এলএমজিটা দিয়ে এগিয়ে যান। আমি তার ব্যাগ আর অস্ত্রসহই অনেক কষ্টে হাঁটছি। পরে একটা বাড়িতে সবাই একত্রিত হই। তারপর আবার রওনা দিই নৌকায়। ১৭ জন এক নৌকায়। ডান পাশে আমি। বাঁ পাশে আরেকজন। সামনে একজন। এভাবে ৮ দিকে দুজন করে ১৬ জন। এক পাশে মাঝি আর অন্য পাশে আরেকজন অস্ত্র নিয়ে পজিশনে থাকে। 

নৌকা চলছিল। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি টের পাইনি। হঠাৎ গোলাগুলির শব্দ। পাকিস্তানিদের অ্যাম্বুসের ভেতর পড়ে যাই আমরা। মাঝি তখন লগি দিয়ে নৌকাটায় একটা ধাক্কা দিলো। নৌকা ঝোপের ভেতর আটকে যায়। আশপাশে তাকিয়ে দেখি সহযোদ্ধা সাহার ছাড়া কেউ নেই। জীবন বাঁচাতে পানিতে ডুব দিয়ে যে যার মতো সরে পড়েছে। 

কিন্তু নৌকা ভর্তি অ্যামুনেশন। সেটা রক্ষা করতেই হবে। প্রচণ্ড গোলাগুলি চলছিল তখন। আমার মনে হয় লাইফে ওই টাইমটার মধ্যে কত হাজারবার যে কলেমা পড়ছি! আর আল্লাহকে বলেছি, যদি তুমি বাঁচায়া দেও, তোমার রাস্তায় চলব, দেশের জন্য বাঁচবো। আর যদি নিয়া যাও শহীদ করে ফেল। ওদের হাতে যেন ধরা না পড়ি বা পঙ্গু না হই। 

বিশ্বাস করেন আল্লাহ ডাক শুনছে। ওই গোলাগুলির মধ্যেও একটা গুলি গায়ে লাগে নাই। ট্রেনিংয়ের সময় ওস্তাদরা বলতেন, গুলির মধ্যে নাম লেখা থাকে। তোমার নামে গুলি যদি না আসে তুমি মরবা না। তাই-ই হয়েছিল। 

ঝোপের ভেতর থেকে নৌকা বের করি আমরা। গোলাগুলির মধ্যেই পেছনে ফিরে প্রথম বাড়িটার কাছে গিয়ে নৌকাটা সাইড করে রাখি। দুজন মিলে দ্রুত নামিয়ে রাখি সমস্ত আর্মস অ্যামুনেশন। এরপর আমি স্টেনগান আর সাহার একটা অস্ত্র নিয়ে পজিশনে থাকে। 

মানিক ভাই আর বাচ্চু ভাইরা ছিলেন পেছনের দিকে, অন্য নৌকায়। ভোরে এসে তারা আমাদের অবস্থা দেখে অবাক হন। সবাইকে তখন ক্যাম্পে ব্যাক করতে বলেন।

বাকিরাও ক্যাম্পে ফিরে আসে। মানিক ভাই সবাইরে খুব ধোলাই দেন। বলেন, সাহার আর স্বপন এত বড় দায়িত্ব পালন করল, নৌকা ছাড়ল না। আর তোরা সব বর্ডারে ফাইট করা মুক্তিযোদ্ধা। তোরা এভাবে নৌকা ফেলে পালিয়ে গেলি!

তখন হায়দার স্যার এসে আবার একটা ব্রিফ করেন। তারপর বললেন, তোমরা আজ রেস্ট নেও। কালকে রওনা দিও। ফলে ওইদিন আর ভেতরে যাওয়া হয়নি আমাদের।