মাসের পর মাস টিকে থাকে এডিস মশার ডিম!

এডিস মশার ডিম শুকনা পরিবেশেও অন্তত আট মাস সক্রিয় থাকে, নষ্ট হয় না। আর যখনই স্বচ্ছ পানির সংস্পর্শে আসে, তখন তা থেকে লার্ভা হয়, যা পরে রূপ নেয় পূর্ণ মশায়, যে মশা হল ডেঙ্গু জীবাণুর বাহক।

মঈনুল হক চৌধুরী জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 July 2019, 07:32 PM
Updated : 29 July 2019, 07:34 PM

ঢাকা থেকে পুরো বাংলাদেশে ডেঙ্গু ছড়িয়েপড়ার মধ্যে সোমবার জনসচেতনামূলক এক অনুষ্ঠানে এই তথ্য তুলে ধরেন স্বাস্থ্যঅধিদপ্তরের ডেঙ্গু বিষয়ক কর্মসূচি ব্যবস্থাপক অধ্যাপক ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান।

তিনি বলেন, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা যে শহরেবা যে এলাকায় একবার বিস্তার করে, সে এলাকায় আর ‘নিস্তার নেই’।

“কারণ এডিস মশার ডিম শুকনা পরিবেশেও নয়মাস পর্যন্ত সক্রিয় থাকে, নষ্ট হয় না। আর যখনই স্বচ্ছ পানির সংস্পর্শে আসে তখন তালার্ভা হয়;  রূপ নেয় পরিপূর্ণ মশায়।”

ডা. আক্তারুজ্জামান বলেন, বিদেশ থেকে গাড়িরটায়ারে করেও যদি এডিসের ডিম আসে, সেটা যদি পানির সংস্পর্শে আসে, সেখান থেকেইএডিসের জন্ম হবে।

ঢাকায় ডেঙ্গুর বাহক হিসেবে এডিস এজিপ্টিমশা ইতোমধ্যে সবার কাছে পরিচিতি পেয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি প্রতিষ্ঠানসেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) ওয়েবসাইটের তথ্যঅনুযায়ী, প্রতিটি এডিস এজিপ্টি মশা একেবারে একশর মতো ডিম দেয়। আর ডিম ছাড়ার জন্যএই মশা বেছে নেয় স্বল্প গভীরতার পানি, যেমন বোতল, কাপ, টব, টায়ারের মতো স্থান।এদের ডিমের খোলস হয় বেশ শক্ত। তা শুষ্ক পরিবেশেও অন্তত আট মাস সক্রিয় থাকে। যখন পানিডিমটি পুরো ঢেকে দেয়, তখন ডিম থেকে লার্ভা হয়। লার্ভা থেকে পিউপা হয়ে পরিপূর্ণমশায় রূপ নিতে সময় লাগে আট-থেকে ১০ দিন।

এডিস মশা তাদের ৪০ দিনের মতো জীবনকালে গড়েপাঁচ বারের মতো ডিম দেয়।

ছবিতে এডিস মশার জীবন চক্রের চারটি ধাপ; ওপরে ডিম এবং পানিতে ডুবে থাকা লার্ভা। নিচে- পিউপা থেক বেরিয়ে আসছে পূর্ণাঙ্গ মশা এবং মানুষের রক্ত শুষে নিচ্ছে পূর্ণাঙ্গ মশা

সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, এডিস মশা মানুষেরকাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। এজন্য ঘর, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি স্থানে এদেরদেখা মেলে বেশি। আর তাদের ওড়াউড়ি জন্মস্থানের কাছাকাছিই সীমাবদ্ধ থাকে।

বাংলাদেশে প্রায় দুই দশক ধরে বর্ষায় ডেঙ্গুরোগের প্রকোপ দেখা দিলেও এবার তা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রথমে ঢাকায় দেখা দেওয়ার পরএখন ৫০টি জেলায় তা ছড়িয়েছে। মারা গেছে ২৫ জনের মতো, আক্রান্ত হয়েছে ১৩ হাজারেরবেশি।

ডা. আক্তারুজ্জামান তার অভিজ্ঞতার কথাতুলে ধরে বলেন, “২০১৭ সালে আমরা যে পরিমাণ লার্ভা (এডিস মশার) পেয়েছিলাম, এবার তারতুলনায় শতভাগ বেশি পাওয়া গেছে। মূলত, নির্মানাধীন ভবন, জমে থাকা পানি, ডাবের খোসাইত্যাদিতে আমরা লার্ভা পেয়েছি।”

ঢাকায় এডিস এজিপ্টি মশাইপ্রধানত ডেঙ্গুর বাহক; তবে ঢাকার বাইরে থাকা এডিস এলবোপিকটাস মশাও ডেঙ্গু রোগেরকারণ হতে পারে বলে জানিয়েছেন আইইডিসিআরের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক ডা. এ এস এম আলমগীর।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরডটকমকে বলেন, “এডিস এলবোপিকটাস মশাও ডেঙ্গুর কারণ হতে পারে। আর এই মশাটি ঢাকারবাইরের অঞ্চলগুলোতে রয়েছে। সুতরাং এই মশার (এডিস এলবোপিকটাস) কোনটি যদি ঢাকা থেকেযাওয়া কোনো ডেঙ্গু রোগীকে কামড় দেয়, তবে ওই এলাকায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়তে পারে।”

ঢাকার মুগদা হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর ভিড়

ডা. আখতারুজ্জামান বলেন, “ব্যক্তি সচেতনতাছাড়া ডেঙ্গু থেকে নিস্তার পাওয়ার কোনো উপায় নেই। পানি জমে থাকলে সেখানে এই মশাজন্ম নেবেই।

“ঘরের স্যাঁতস্যাঁতে মেঝেতেও এডিসের ডিমযদি থাকে, পানি পাওয়ার পর সেখান থেকে লার্ভা হবে। পরিপূর্ণ মশা জন্ম নেবে। তাইস্যাঁতস্যাতে ঘরের মেঝেতে ব্লিচিং পাউডার ছিটানো কার্যকর হবে। এছাড়া মশারি ব্যবহার,এরোসল ব্যবহার করা যেতে পারে।”

এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবদেখা দেওয়ায় তা প্রতিরোধে বাড়ির আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে বলা হচ্ছে সরকারের পক্ষথেকে। অফিস, ঘর ও আশপাশে যে কোনো পাত্রে (এসির ট্রে/ফুলের টব) জমে থাকা পানি তিন দিনেরমধ্যে পরিবর্তন করতে পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

এবার ঢাকায় এডিস মশা নিধনে দুই নগরকর্তৃপক্ষের ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন অনেকে। ছিটানো ওষুধ অকার্যকর বলেও গবেষণায়বেরিয়ে এসেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সতর্কবার্তা দেওয়ারপরও ডেঙ্গু মোকাবেলায় সমন্বিত কার্যক্রম নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে।স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ঢাকার দুই মেয়রের পদত্যাগের দাবিও উঠেছে।

নির্বাচন ভবনে এক সচেতনতামূলক সভায় গিয়েএডিস মশা ও ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে নানা তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি সবাইকে আশ্বস্তও করেন অধ্যাপকডা. আক্তারুজ্জামান।

জ্বর হলেই না ঘাবড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন,“৬ ঘণ্টার মধ্যে রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। ডেঙ্গু জ্বর প্রথমবার হলে তেমন সমস্যানেই। দ্বিতীয়, তৃতীয়বার হলে সমস্যা ভয়াবহ হয়। তখন শরীরের বিভিন্ন অর্গান ফেইলর হয়।তাই দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।”

ডেঙ্গু প্রতিরোধে ইসির সচেতনতামূলক সভা

সভায় থাকা প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এমনূরুল হুদা ডেঙ্গু মোকাবেলায় ইসির ফোয়ারা বন্ধ রাখাসহ আশেপাশের ভবনেও যেন পানিজমতে না পারে, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ইসি সচিবকে নির্দেশ দেন।

এর আগে ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা ও মাংসপেশিতে ব্যথা, শরীরে লালচে দানা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা গেলেও এবার এর ব্যতিক্রমপাওয়া যাচ্ছে, যা বিভ্রান্ত করছে চিকিৎসকদেরও।

 তাই জ্বর হলেই কাছের হাসপাতালে কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শনিয়ে রক্তের পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিয়েছে সরকার।

চিকিৎসকরা জ্বরে প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য ব্যথানাশকওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি রোগীকে বেশি বেশি তরল খাবার খাওয়াতেবলেছেন।

এবার ডেঙ্গুজ্বরে রক্তের ঘনত্ব কমে যাওয়ারলক্ষণ দেখা দেওয়ায় আক্রান্তের রক্তচাপ কমে যাচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে বলাহচ্ছে।

জ্বর ভালো হওয়ার পরও ডেঙ্গুজনিত মারাত্মক জটিলতাদেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করছেন চিকিৎসকরা।

এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলা কামড়ায় বলে দিনেঘুমানোর ক্ষেত্রেও মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক