Published : 14 Aug 2025, 06:11 PM
নন্দিত চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনের দুই ছেলের মধ্যে সোহেল আরমান নির্মাণে এসেছিলেন তিন দশক আগে। সে সময় বাবার কাছ থেকে তেমন কোনো উৎসাহ বা সহযোগিতা তার জোটেনি। যা নিয়ে অভিমান ছিল আরমানের মনের মধ্যে। কিন্তু আমজাদ হোসেনের কাছ থেকে এমন একটি পরামর্শ আরমান পেয়েছিলেন, যা তাকে জীবনের পথ খুঁজে দিতে সাহায্য করেছিল।
১৯৪২ সালের ১৪ অগাস্টে জামালপুরে জন্ম নেওয়া আমজাদ হোসেন একাধারে লেখক, অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক।
বৃহস্পতিবার প্রয়াত এই চলচ্চিত্রকারের ৮২তম জন্মবার্ষিকীতে গ্লিটজের কাছে বাবাকে নিয়ে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেন সোহেল আরমান।
বাবার জন্মদিনে তাকে নিয়ে আরমান ফিরে গেলেন বহু বছরের পুরনো এক মুহূর্তে।
আরমান কেবল নির্মাতাই নয়, অভিনয়ও করেছেন নব্বই দশকে।
তিনি বলেন, “উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বাবাসহ আমার পুরো পরিবার ভেবেছিলেন আমি মিডিয়ায় আসব না। আমার সেই কোয়ালিটি নেই, গুণ নেই। বাবা ভেবেছিলেন ছেলে ভালো লিখে, কবিতা লিখে তার গুণ এই পর্যন্তই।
“আমার প্রথম নাটক ‘সবুজের হলুদ ব্যাধি’ প্রান্তিকের শ্রেষ্ঠ নাটক হওয়ার পরেও বাবা নিশ্চুপ ছিলেন। তখন বাবার প্রতি একটু অভিমান কাজ করেছিল, পড়াশোনা নিয়ে এত প্রশংসা করেন, কিন্তু আমার একটা কাজ ভালো হল, অথচ বাবার কোনো মন্তব্য পেলাম না।”
তবে একদিন আমজাদ হোসেন আরমানকে ডেকে একটি উপদেশ দিয়েছিলেন।
আরমান বলেন, “আমাকে বাবা বললেন বটগাছের নিচে কোনো গাছ হতে পারে না। তোমাকে এই বটগাছের বহুদূরে গিয়ে গাছ হতে হবে। আমার মত কাজ করতে হবে না, তুমি তোমার মত, তোমার জেনারেশনের গল্প নিয়ে কাজ কর।"
আরমান বলেন, তখন বাবার কথাগুলো শুনে কিছুটা বোকা হয়েছিলেন।
“পরে বুঝলাম বাবার যে ব্যাপ্তি, যে খ্যাতি সেইখানে হয়ত আমার সৃষ্টিগুলো মানুষের নজরে নাও পড়তে পারে। তখন থেকেই নিজের কাজগুলো নিয়ে আলাদা হওয়ার চেষ্টা করেছি, বাবা আমাকে শিখিয়েছে নিজেকে নিজে চিনে। স্ট্রাগল করেই নিজের অবস্থান তৈরি করলাম।”
আরমানের কথায়, অবুঝ মনে থাকা সেই অভিমান পরে রূপ নেয় কৃতজ্ঞতায়।
“এখন মনে হয় বাবা প্রশংসা করেননি বলেই জীবনের টানাপোড়নে গিয়ে সৃষ্টিকর্মের প্রতি শক্ত হতে পেরেছি। দূরে গিয়ে গাছ হতে বলাটা বাবার ট্রেইনিং ছিল, আদর্শের জায়গা থেকেই তিনি এটি করেছেন। এখন বুঝি প্রতিটা মানুষ তার নিজের সৃষ্টিতে বড় হয়। উনার সেই পরামর্শ এখন আশীর্বাদ হয়ে ফলছে।”
আমজাদ হোসেনের জনপ্রিয়তা কেমন ছিল, তা বোঝাতে একটি গল্প আরমান করেছেন গ্লিটজের কাছে।
তিনি বলেন, “বাবাকে জীবিত থাকতে দেখেছি, তিনি যখন এফডিসিতে ঢুকতেন, গেইট থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত হাত উঁচু করে রাখতেন। সবাই এত বেশি সালাম দিতেন যে উত্তর দিতে সময় লাগত বলে উনি হাত নামাতেন না।”
আমজাদ হোসেন মারা যান বিদেশের মাটিতে ২০১৮ সালে ডিসেম্বরের ১৪ তারিখে।
ওই দিনের কথা উঠে আসে আরমানের ভাষ্যে।
"ওইদিন থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালের নিচে মৃত্যুর খবর শুনে বহু মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। বিদেশের মাটিতে এমন দৃশ্য হওয়ার কথা ছিল না, কিন্তু সেটি হয়েছিল। এই দুটো দৃশ্য মনে পড়ে যে একজন মানুষ সাধারণ হয়ে কীভাবে অসাধারণ হয়ে উঠেছিল। দেশ, দেশের মাটি, দেশের মানুষকে উনি খুব ভালোবাসতেন।”
বাবা হারানোর শূন্যতা প্রতিদিন বয়ে বেড়ান আরমান। বাবা আর কখনো ফিরে আসবেন না এটা মনে হলে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন তিনি।
আরমান বলেন, “মনটা ভরে যায় যখন বাবাকে স্মরণ করে অসংখ্য গুণগ্রাহী, ভক্তরা ফোন করে, বার্তা পাঠিয়ে বলেন, তোমার বাবাকে খুব মনে পড়ে। তখন বেশ আপ্লুত হয়ে যাই। যখন সবাই বলে, বাবার মত এমন মানুষ আর পৃথিবীতে আসবেন না, তখন বুক ভেঙে কান্না আসে, বাবা কেন এত তাড়াতাড়ি চলে গেল। বাবাকে বলতে ইচ্ছে করে, বাবা তোমার আরেকটু দেখে যাওয়ার দরকার ছিল বাংলাদেশের মানুষ তোমাকে কতটা ভালোবাসে।”
বাবাকে নিয়ে তথ্যচিত্র ও চলচ্চিত্র তৈরির পরিকল্পনা আছে বলেও জানিয়েছেন আরমান।
“আমরা দুই ভাই মিলে বাবাকে নিয়ে নানান রকম কিছু করার চিন্তা করি। আমার বড় ভাই সাজ্জাদ হোসেন দুদুল তৈরি করেছেন ‘আমজাদ হোসেন চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র’। বাবার কাজ, পুরস্কার ও সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে।
"আমার ইচ্ছে আছে বাবার একটা বায়োগ্রাফিক্যাল চলচ্চিত্র তৈরি করার। সেটার চিত্রনাট্য লিখছেন দুদুল ভাই। উনার সহযোগিতায় চলচ্চিত্রটি তৈরি করতে পারলে আমি নিজেকে সফল মনে করব।”
আমজাদ হোসেন ১৯৬১ সালে ‘হারানো দিন’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে রুপালি পর্দায় যাত্রা শুরু করেন; পরে চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় মনোযোগ দেন। ১৯৬৭ সালে মুক্তি পায় তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘খেলা’।
‘ভাত দে’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’সহ তার একাধিক চলচ্চিত্র দর্শকপ্রিয়তা ও সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছে। কাজ করেছেন টেলিভিশনের নাটকেও।
গান লেখা, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পুরস্কার পান তিনি।