Published : 15 Feb 2026, 12:01 AM
সত্তরের দশকে এক সংগীতসম্মেলন থেকে তাদের পরিচয়, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রেম তারপর আজীবনের বন্ধন। তারা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে একই ছাদের নিচে বাস করা সংগীতশিল্পী জুটি রফিকুল আলম ও আবিদা সুলতানা।
শনিবার বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। এই দিন ঘিরে এই জুটির প্রথম দেখা, ভালোবাসা ও বিয়ের দিনের স্মৃতি নিয়ে গ্লিটজের সঙ্গে কথা বলেছেন রফিকুল আলম।
একটি সংগীত সম্মেলনে গিয়ে আবিদা সুলতানার সঙ্গে পরিচয় হয় রফিকুল আলমের।
শুরুর দিনের কথা মনে করে এই শিল্পী বলেন, "১৯৭৩ সালে মিউজিক কলেজের আয়োজনে ওস্তাদ বারীণ মজুমদার ও সাংবাদিক কামাল লোহানী একটি সংগীত সম্মেলন করেছিলেন। সেই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন বিখ্যাত সব সংগীতজ্ঞজন। এ মুহূর্তে যাদের নাম মনে পড়ছে তারা হলেন শাস্ত্রীয় সংগীতের পুরোধা ওস্তাদ দবির খাঁ, আলী হোসেন খাঁ সাহেব।
"সম্মেলনে আরও এসেছিলেন আধুনিক গানের বিখ্যাত শিল্পী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়সহ আরও অনেকে। বাংলাদেশের ওই সময়ের শীর্ষ শিল্পীরাও ছিলেন আবদুল জব্বার, মাহমুদুন নবী, খন্দকার ফারুক আহমেদসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।"
সেই অনুষ্ঠানে লাকী আখান্দের মাধ্যমে আবিদা সুলতানার সঙ্গে পরিচয় হয় বলে জানিয়েছেন রফিকুল।।
তিনি বলেন, “আমি তখন নবীন শিল্পী। রাজশাহী থেকে এসেছি। বাংলাদেশ বেতারে প্রচার হওয়া ‘তোমাকে যেন ভুলে না যাই’ গানটি ওই সময় বেশ শ্রোতাপ্রিয় ছিল। সেই গান ধরেই শিখার (আবিদা সুলতানার ডাক নাম) সঙ্গে উনি আমার পরিচয় করিয়ে দেন।"
এরপর গানের জগতে একসঙ্গে পথ চলতে চলতেই একে অন্যের কাছাকাছি আসেন এই সংগীত জুটি। আবিদা ও রফিকুল প্রেম করেছেন চার বছর। এর মধ্যে দুই পরিবারেই বিষয়টা জানাজানি হয়ে যায়।
সেই গল্প তুলে ধরে রফিকুল আলম বলেন, " শিখার বড় বোন রেবেকা সুলতানা থাকতেন সার্কিট হাউস রোডে। একদিন আমি শিখাকে রিকশায় করে দিয়ে এসেছিলাম বা কোনো একটা কারণে হয়ত তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। একদিন আপা শিখাকে জিজ্ঞেস করেছে ‘শিখা, তুই কি রফিককে বিয়ে করবি?’ সেও সাহস করে বলে ফেললো, ‘হ্যাঁ। বিয়ে করব।
“তখন আপা আমাদের বিষয়টা শিখার বাবা–মাকে জানালেন আর আমাদের বাড়ি থেকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে বললেন।”
রফিকুলের পক্ষ থেকে আবিদার বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন শিল্পীদম্পতি এম এ হামিদ ও নীনা হামিদ।
রফিকুল বলেন, "রাজশাহী আমাদের বাড়িতেও আমাকে বিয়ে করার জন্য খুব পীড়াপীড়ি করছিলেন আমার মা। এরপর শিখার কাছ থেকে বিয়ের বিষয়টা জানার পর আমার পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে শিখাদের বাড়িতে গেলেন শিল্পীদম্পতি এম এ হামিদ ও নীনা হামিদ, সঙ্গে আমার মামাত বোন লাইলী আপা। বিয়ে নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা হলো। একটা তারিখও ঠিক হল।"
তবে বিয়ের তারিখ ঠিক হওয়ার পর জটিলতা তৈরি হয় জানিয়ে রফিকুল বলেন, "বিয়ের তারিখ ঠিক হয়, কিন্তু ওই তারিখে বিয়ে করতে বারণ করলেন আমার বন্ধু সুকুমার সরকারের (বিটিভির সাবেক মহাপরিচালক) বাবা সুধীর সরকার। তারা রাজশাহীতে আমাদের বাড়ির পাশে থাকতেন। তিনি মায়ের কাছ থেকে আমার জন্মের দিনক্ষণ জেনে মাকে বললেন, চৈত্র মাসে আমার বিয়ে করা ঠিক হবে না। তখন বিয়ের তারিখ ঠিক হলো ১ বৈশাখ। অর্থাৎ ১৯৭৮ সালের ১৪ এপ্রিল আমরা বিয়ে করি।"
আবিদা ও রফিকুলের বিয়ে হয় ঢাকা অফিসার্স ক্লাবে। বিয়ের অনুষ্ঠানে সেসময় কারা এসেছিলেন জানতে চাইলে এই শিল্পী বলেন, "সুরকার আবদুল আহাদ, শিল্পী সমর দাস, এম এ হামিদ, নীনা হামিদ, সৈয়দ আব্দুল হাদী, ফেরদৌসী রহমান, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, নিলুফার ইয়াসমীন, ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী, আলাউদ্দিন আলী, সুবীর নন্দী,সাবিনা ইয়াসমীন, পরিচালক দীলিপ বিশ্বাসসহ সংগীতের অনেক বিখ্যাত জনরা এসেছিলেন আমাদের বিয়ে ও বউভাতের অনুষ্ঠানে। ”
বিয়ের দিনের এক স্মরণীয় উপহারের কথা তুলে ধরে এই শিল্পী বলেন, "বিয়েতে যারা এসেছিলেন, সবাই বিভিন্ন উপহার দিয়েছিলেন। এর মধ্যে সংগীত পরিচালক সত্য সাহা বউভাতে এসে খেয়ে বিদায় নেওয়ার সময় আমাদের বললেন, "তোদের বিয়ের গিফটটা পরে দেব। আর এমন গিফট দেব, যা সারা জীবন থেকে যাবে।"
এই ঘটনার পাঁচমাস পর বিয়ের গিফট পেয়েছিলেন জানিয়ে এই শিল্পী বলেন, “সত্যদা ফোন করে বললেন, ‘তোরা দুজনই একটু শ্রুতি স্টুডিওতে আয়’। পরদিন আমরা গেলাম স্টুডিওতে। দাদা বললেন, ‘তোদের জন্য একটা গান করেছি। আয় গানটা তুলে নে। এটাই তোদের বিয়ের গিফট’। আমরা গানটি গাইলাম এবং অসম্ভব সুন্দর একটি গান।
“গানটি হল ‘এক নদীরই উজানভাটির আমরা দুটি ধারা'; এই গানটি লিখেছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার ভাই। 'উজানভাটি' সিনেমার সেই গান এখনো মানুষের মুখে মুখে।"
৪৮ বছর ধরে কাটানো দাম্পত্য জীবন নিয়ে এই শিল্পী বলেন, "সৃষ্টিকর্তার রহমতে আমরা খুব ভালো আছি, আমাদের মতের কখনো অমিল হয়নি। পরস্পরকে সম্মান এবং একে-অপরের মতামত সহ্য ও গ্রহণ করার ক্ষমতা থাকলে যে কোনো জীবন সুন্দর হয়ে উঠে।"
'বৈশাখী মেঘের কাছে’,‘এক হৃদয়হীনার কাছে’, ‘আশা ছিল মনে মনের মত, ‘তুমি আমার মনের মানুষ’, ‘এক নদীরই উজান-ভাটি, আমরা দুটি ধারা’, কবি শামসুর রাহমানের ‘কখনো আমার মাকে', 'অঙ্গে দিলাম ফাগুন ঢলো ঢলো' সহ বহু জনপ্রিয় গান রয়েছে রফিকুল আলমের ঝুলিতে।
তিনি ২৮টি ভাষায় গান করেছেন এবং প্রায় তিনশ চলচ্চিত্রে প্লে-ব্যাক করেছেন। সব মিলিয়ে দুই হাজারের বেশি গান করেছেন এই শিল্পী।
বর্তমানে টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও নতুন মৌলিক গান প্রকাশ নিয়েই ব্যস্ত আছেন তিনি। গেল বছর প্রকাশ পেয়েছিল এই শিল্পীর ‘পাহাড়ের কান্না’ ও 'সকাল সন্ধ্যায় চায়ের চুমুকে' শিরোনামের দুইটি গান।