‘খুন হতে পারতেন’ শাহরুখও! বলিউডে নব্বইয়ের আতঙ্ক ফিরছে?
“আপনি কাকে গুলি করবেন, সেটা নিয়ে আমি কোনো কথা বলি না। তাই আমি কোন সিনেমা করব, তা আপনি আমাকে বলতে পারেন না।”
নব্বইয়ের দশক ও চলতি শতকের শুরুর দিকে বলিউডের ওপর আন্ডারওয়ার্ল্ডের ব্যাপক প্রভাব ছিল। তারকা থেকে পরিচালক-প্রযোজক, অনেকেই ছিলেন অপরাধ চক্রের হুমকি ও চাপের মুখে।
সম্প্রতি টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলি চালনার ঘটনাটি নব্বইয়ের দশকের সেই আতঙ্কের দিনগুলোকে ফিরিয়ে এনেছে। লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের একের পর এক হুমকি ও হামলার ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে, বলিউড কি তবে ফের সেই পুরনো সন্ত্রাসের যুগে ফিরে যাচ্ছে?
এনডিটিভি জানিয়েছে, ওই সময়টি চাঁদাবাজি, এলাকা দখলের লড়াই এবং আর্থিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সহিংসতার এক দীর্ঘ পথ রেখে গিয়েছিল। টি-সিরিজের প্রতিষ্ঠাতা গুলশান কুমার, প্রযোজক মুকেশ দুগ্গাল, জাভেদ রিয়াজ সিদ্দিকী এবং অজিত দিওয়ানিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। অন্যদিকে চলচ্চিত্র পরিচালক রাকেশ রোশন, রাজীব রাই এবং লরেন্স ডি'সুজা পরিকল্পিত হামলার পর অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।
কিন্তু গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোই সালমানের দিকে নজর দেওয়ার কয়েক দশক আগেই, আরেক সুপারস্টার শাহরুখ খান নিজেকে মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের মুখোমুখি হন। গ্যাংস্টার আবু সালেমের নিশানায় ছিলেন শাহরুখ। হুমকিটি এতটাই গুরুতর ছিল যে, মুম্বাই পুলিশ আশঙ্কা করেছিল সন্ত্রাসীরা ‘শাহরুখকে হত্যা করতে চলেছে’, যা বলিউডের ইতিহাসে অন্যতম লোমহর্ষক একটি অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়।
সম্প্রতি প্রখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক অনুপম চোপড়ার লেখা ‘কিং অব বলিউড শাহরুখ খান’ বইয়ে উঠে আসা শাহরুখ খানসহ এই ইন্ডাস্ট্রির অন্যান্যদের নিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ত্রাসের সেই পুরনো কাহিনীগুলো এখন নতুন করে শোরগোল ফেলেছে।
চার বছর ধরে শাহরুখকে আবু সালেমসহ অন্যান্য গ্যাংস্টার হুমকি দিয়ে এসেছেন। ওই সময়ে শাহরুখকে মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাতে হয়।
যশ চোপড়ার 'দিল তো পাগল হ্যায়' সিনেমার চলাকালীনই শাহরুখ আবু সালেমের কাছ থেকে ফোনটি পেয়েছিলেন বলে লিখেছেন অনুপম চোপড়া।
আবু সালেম শাহরুখকে তার গ্যাংয়ের পছন্দমত সিনেমায় কাজ করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন।
কিন্তু শাহরুখ বলেছিলেন, “আমি কারও ফরমাযেশ মত কোনো সিনেমা করব না, কোনো অনুষ্ঠানও করব না। আমি পাঠান—চাইলে গুলি করে দাও।’
আবু সালেমকে উদ্দেশ্য করে শাহরুখ অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে বলেছিলেন, “আপনি কাকে গুলি করবেন, সেটা নিয়ে আমি কোনো কথা বলি না। তাই আমি কোন সিনেমা করব, তা আপনি আমাকে বলতে পারেন না।”
"আমি যেমন তোমাকে বলি না কাকে গুলি করতে হবে, তেমনি আমাকেও বলো না কোন ছবিটা করতে হবে।"
কোনো হুমকিতে শাহরুখ ভয় পাচ্ছেন না, এমনটাই জানিয়ে দিয়েছিলেন; তবে কোনো ধরনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কাজ করবেন না।
সালেমের সঙ্গে শাহরুখের কথোপকথন কেমন হয়েছিল, তার ধারণা মেলে বইয়ের লেখায়।
মুম্বাইয়ের রাস্তার প্রচলিত ভাষায় সালেম জিজ্ঞেস করলেন, ‘হ্যাঁ, কী ব্যাপার, কী চলছে?’
শাহরুখ জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে বলছেন?’ এই প্রশ্নে হিন্দিতে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজের ঝড় ওয়ে। শাহরুখ পাল্টা জবাব দেন না।
নম্রভাবে ইংরেজিতে শাহরুখ বলেন, ‘কী সমস্যা, স্যার?’
সালেম বলেন, তিনি শুনেছেন, কোনো একজন মুসলিম প্রযোজকের সিনেমা করতে শাহরুখ আপত্তি জানিয়েছেন। এজন্য তিনি (সালেম) ক্ষুব্ধ।
তখন শাহরুখ সালেমকে জানিয়েছিলেন, সালেমের জানা তথ্যটি সঠিক নয়। তিনি বেশ কয়েকজন মুসলিম পরিচালকের সঙ্গে কাজ করছেন।
এসব শুনে সালেম শাহরুখকে বলেন, "লোকে বলে তোর খুব অহংকার, কিন্তু তুই একজন ভদ্র মানুষ। আমি তোকে মারব না।"
সে সময় পুলিশ কর্মকর্তা রাকেশ মারিয়া শাহরুখকে কিছুদিন লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন, চলাচলও সীমিত করতে অনুরোধ করেন। নায়কের নিরাপত্তার জন্য সাদা পোশাকে একজন স্পেশাল অপারেশনস স্কোয়াড কমান্ডোকেও নিযুক্ত করা হয়েছিল।
অনুপম চোপড়ার বই ছাড়াও ২০০১ সালে যুক্তরাজ্যের টিভি সিরিজ ‘হট ওয়াক্স’ এর জন্য কমেডিয়ান ও অভিনেত্রী রুবি ওয়াক্সের সাথে এক সাক্ষাৎকারে শাহরুখ আন্ডারওয়ার্ল্ডের হুমকি নিয়ে অকপটে কথা বলেছিলেন।
নব্বইয়ের সেই অন্ধকার অধ্যায় কাটিয়ে বলিউড যখন বেশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিল, ঠিক তখনই লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের উত্থান পরিস্থিতি আবার বদলে দিয়েছে।
সালমান খানকে লক্ষ্য করে চলা দীর্ঘদিনের হুমকি, বাবা সিদ্দিকী হত্যা এবং সম্প্রতি টাইগার শ্রফের ওপর হামলা আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
টাইগারকে হামলাকারীরা সালমান ছাড়াও অমিতাভ বচ্চন, অক্ষয় কুমার এবং আমির খানসহ বেশ কয়েকজন তারকাকেও নজরে রেখেছে বলে উঠে এসেছে।
এ পরিস্থিতিতে শুটিং সেট ও স্টুডিওর নিরাপত্তা জোরদারের দাবি উঠেছে।
