অর্থনীতি পুনরুদ্ধার: বাংলাদেশ ব্যাংককে জাহিদ হোসেনের ৩ পরামর্শ
কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে তিন বিষয়কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে সেগুলো ঠিকই আছে বলে মনে করেন তিনি।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আলোচনার মধ্যে চাপে পড়া বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংককে তিনটি বিষয়ে এখনই ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত আলাপের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকে যান জাহিদ হোসেন। এ সময় তার দৃষ্টিতে অর্থনীতির বর্তমানের চ্যালেঞ্জগুলো কী কী, তা তুলে ধরার পাশাপাশি তুলে ধরেন উত্তরণের পরামর্শও।
বৈঠক শেষে জাহিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “অর্থনীতির সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন দিয়েছি। অর্থনীতি নিয়ে আমার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ একই।’’
বাংলাদেশ ব্যাংক যে তিনটি বিষয়কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে সেগুলো ঠিকই আছে মনে করে জাহিদ হোসেন বলেন, ‘‘আমিও মনে করি এই তিনটি বিষয় নিয়েই এখন কাজ করতে হবে।’’
সেসব বিষয় কী- সেই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘ঋণের সুদহারকে আরো কিছুটা নমনীয় করতে হবে। মানি মার্কেটের জন্য যে সুদহার করিডোর করা হয়েছে, সেটার উৎকর্ষতা আরও বাড়াতে হবে।’’
স্মার্ট রেট পদ্ধতি বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে এবং সেটাকে আরও কিছুটা নমনীয় করা যায় কি না সে বিষয়ে কিছু প্রস্তাব দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন জাহিদ হোসেন।
বর্তমানে ডলারের বিপরীতে টাকার মান নির্ধারণ পদ্ধতি পাল্টানো হলো তার দ্বিতীয় পরামর্শ।
বর্তমানে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি ও বিদেশি মুদ্রা লেনদেনকারী ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাফেদা ডলারের দর নির্ধারণ করে দিচ্ছে। কিন্তু ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের দর ও খোলাবাজারের মধ্যকার দরের পার্থক্য সাত থেকে আট টাকা। এই পার্থক্যের কারণে প্রবাসী আয় আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের বদলে হুন্ডিতে চলে যাচ্ছে বলে ধারণা করছেন অর্থনীতিবিদরা। এর ফলে রিজার্ভ চাপে পড়েছে।
জাহিদ হোসেন বলেন, “বিনিময় হারকে বাজারমূখী করতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রার যোগান বাড়বে। এখন যোগান বাড়ানোটা মুখ্য বিষয়- সে বিষয়ে বলেছি।
“রপ্তানি আয়ের যে অংশটুকু দেশে আসছে না, সেটিও দেখতে হবে। অনেকেই প্রত্যাশা করছেন ডলারের দাম আরো বাড়বে। তাই হয়ত অনেক আয় দেশে আসছে না। এগুলোও চিহ্নিত করতে বলেছি।”
ব্যাংক খাতে মন্দ ঋণ কমানোর ওপর জোর দেওয়া তার তৃতীয় পরামর্শ। জাহিদ হোসেন বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণের যে তথ্য প্রকাশ করছে, সেটি যেন বজায় থাকে। এ বিষয়ে যেসব আইন করা হয়েছে-সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়নের উপর জোর দিতে হবে।”
যদিও তার দেওয়া তিন পরামর্শের মধ্যে এটাকেই অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন জাহিদ হোসেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বলেন, অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেগুলো তারা তুলে ধরেছেন।
বলেন, একক বিনিময়হার, অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের উদ্যোগ ও ভবিষ্যতে সময়োপযোগী নীতি উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে জাহিদ হোসেনকে জানানো হয়।
জাহিদ হোসেন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন জানিয়ে মেজবাউল বলেন, “সুদহার ক্রমান্বয়ে বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সমন্বয়েরও পরামর্শ আসে বৈঠকে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা এবং তা সংরক্ষণের নীতি গ্রহণেরও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।”
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া ও টাকার বিনিময় হার ঊর্ধ্বমুখী থাকা নিয়ে চাপে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমন প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির চাপ সামলাতে করণীয় জানতে অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক শুরু করেছে তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকে এসব বৈঠকে নিয়মিত উপস্থিত থাকছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হাবিবুর রহমান ও ডেপুটি গভর্নররা।
