সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বার্থে শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
রাজস্ব আহরণে কর্মকর্তাদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “আপনারা পারেন, আপনারাই পারেন এবং আপনারা অবশ্যই পারবেন ইনশাআল্লাহ।”
সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বার্থে দেশে একটি ‘শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬ উদ্বোধন করে তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের সকলের প্রয়োজন দেশপ্রেম এবং আন্তরিকতা। আসুন সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বার্থে আমরা সবাই মিলে একটি শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলি।”
তিনি বলেন, “আরও সমৃদ্ধ, আরও বিনিয়োগ এবং আরও ব্যবসাবান্ধব একটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনার প্রত্যাশায় আমি এই রাজস্ব সম্মেলনে সফলতা কামনা করছি।”
রাজস্ব আহরণে কর্মকর্তাদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “আমি একটি আশা, সম্ভাবনা এবং প্রত্যাশার কথা বলতে চাই। গত ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত সময়টিতে রাজস্ব আহরণের পরিমাণ ছিল ইতিবাচক।
“এটি প্রমাণ করে আপনারা পারেন, আপনারাই পারেন এবং আপনারা অবশ্যই পারবেন ইনশাআল্লাহ।”
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে।
সম্মেলনে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও শুল্ক—এই তিন খাতের কর্মকর্তারা নিজেদের কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। পাশাপাশি রাজস্ব ও কর ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি তথ্যচিত্র উপস্থাপন করা হয়।
মাঠপর্যায়ে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন শুল্ক ও কর কর্মকর্তারা। এসব সমস্যা সমাধানে তারা বিভিন্ন মতামত ও প্রস্তাব দেন।
প্রধানমন্ত্রী তাদের বক্তব্য শোনেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।
‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এনবিআরের ঘটনা দুঃখজনক’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এনবিআর সংস্কার নিয়ে আন্দোলন-ধর্মঘটের প্রসঙ্গও আসে প্রধানমন্ত্রীর কথায়।
তিনি বলেন, “আমাদের ইন্টেরিম গভার্নমেন্টের সময় এই ডিপার্টমেন্টে (এনবিআর) একটি ঘটনা ঘটেছিল। ঘটনাটিকে আমরা দুঃখজনক ঘটনা বলে অভিহিত করতে চাই।
“আমি আগেই বলেছি সরকার চায় সকলকে সাথে করে নিয়ে বাংলাদেশকে গড় তুলতে। প্রত্যেকটি মানুষের কন্ট্রিবিউশনকে সম্মানের সাথে দেখতে চায় সরকার। সমস্যা আছে, সমস্যা থাকবেই। আমরা আলোচনা করে ধীরে ধীরে সমস্যার সমাধান বের করার চেষ্টা করব।”
তিনি বলেন, “এনবিআরে যে দুঃখজনক ঘটনাটি ঘটেছিল… আমরা চাই সরকারে দায়িত্বে যারা আছেন, সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তাবৃন্দ, আমরা চাই আপনারা নিরাপদে, স্বস্তি নিয়ে দেশ গঠনে কাজ করুন। সরকারের অবস্থান থেকে আমরা অবশ্যই চেষ্টা করব দেশের স্বার্থে, দেশের প্রয়োজনে যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ সেগুলিকে প্রায়োরাটাইজ করতে।”
বিশৃঙ্খলা এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও প্রধানমন্ত্রী বলেন।
“আসুন আমরা যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলাকে পরিহার করার চেষ্টা করি এবং সেজন্য যদি সরকার প্রয়োজন মনে করে, অবশ্যই সরকার ভবিষ্যতে যাতে এই ঘটনাকে পরিহার করা যায়, বর্তমানে যাতে সকলকে স্বস্তিতে কাজ করার পরিবেশ করে দেওয়া যায়, তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সরকার গ্রহণ করবে ইনশাআল্লাহ।”
‘ডিজিটাল কর প্রশাসনের বিকল্প নেই’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আধুনিক কর প্রশাসনের লক্ষ্য শুধু বেশি কর আদায় নয়, বরং আরও বেশি মানুষকে স্বেচ্ছায় কর দিতে উৎসাহিত করা।
“একজন করদাতা যিনি নিয়মিত কর দিচ্ছেন, রাষ্ট্র যেমন তাকে সম্মানিত করবে, একইভাবে যিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কর পরিহার করছেন, তাকেও কর প্রদানের জন্য যথাযথভাবে উদ্বুদ্ধ বা আগ্রহী করে তোলা প্রয়োজন।”
মানুষ যাতে নিজে থেকে কর দিতে উদ্বুদ্ধ হয়, সেজন্য কর ব্যবস্থাপনা ও আদায় পদ্ধতি সহজ এবং দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত করার ওপর জোর দেন সরকারপ্রধান।
তিনি বলেন, “আমার কাছে মনে হয় একই করদাতার উপর বারবার করের বোঝা বাড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধির নীতি খুব সম্ভব টেকসই পদ্ধতি নয়। বরং কর প্রদানে সক্ষম ব্যক্তিদেরকে শনাক্ত করে তাদেরকে যথাযথ নিয়মে করের আওতায় আনার ব্যবস্থা করার কার্যক্রম উদ্যোগ গ্রহণ করা বোধহয় অত্যন্ত প্রয়োজন। এজন্য ডিজিটালি আধুনিক ডাটা ভিত্তিক কর প্রশাসন গড়ে তোলার খুব সম্মত কোন বিকল্প নেই।”
‘ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় ব্যবসা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়’
ভ্যাটকে আধুনিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস হিসেবে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর বাস্তবায়ন কার্যকর করতে হবে এবং ভ্যাট প্রশাসনের জটিলতার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, “কাস্টমস, ভ্যাট কিংবা ট্যাক্স আদায় শুধু এনফোর্সমেন্টের বিষয় নয়, বরং রাজস্ব ব্যবস্থাপনার উপরে ভ্যাট ট্যাক্সদাতাদের আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হলে রাজস্ব আহরণ অনেক সহজ হয়ে যায়।”
কর প্রশাসনের সঙ্গে জনগণের আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব কোডকে এমনভাবে গড়ে তোলা প্রয়োজন যেখানে মানুষ এই প্রতিষ্ঠানকে ভয় না করে বরং বিশ্বাস করবে।
“আমি আশা করি দেশের স্বার্থে আপনারা এনবিআরকে জনগণের আরো বিশ্বস্ত এবং আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সক্ষম হবেন। ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে প্রতিষ্ঠান তথা সবার আগে দেশের স্বার্থ রক্ষা করা প্রয়োজন।”
‘এনবিআরকে আস্থার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায় জনগণ’
এনবিআরের প্রতি মানুষের আস্থা ‘কমে যাওয়ার’ কারণ হিসেবে অতীতের বিভিন্ন অনিয়মের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “আপনাদের জানা আছে, দীর্ঘ দেড় দশকেরও ফ্যাসিবাদ শাসন-শোষণের অভিশাপ থেকে রাষ্ট্রের অন্য সকল প্রতিষ্ঠানের মত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও মুক্ত থাকতে পারেনি। এনবিআরের নীতি-নিয়ম উপেক্ষা করে ব্যক্তি কিংবা দলীয় স্বার্থে কাউকে পৃষ্ঠপোষকতা, কারো প্রতি বিরূপ মনোভাব কিংবা রাজস্ব আহরণে স্বেচ্ছাচারিতা এনবিআরকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। এনবিআরের উপরে মানুষের আস্থা বিনষ্টের অন্যতম কারণ ছিল এই বিষয়গুলো।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা। অর্থাৎ বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা। দেশের জনগণ বর্তমানে এনবিআরকে একটি নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রত্যাশা করে। দেশের জনগণ বিশেষ করে করদাতাগণ এনবিআরকে তাদের আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়।”
দক্ষ ও টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “উন্মুক্ত আলোচনায় যেটি আপনাদের কারো কারো বক্তব্য থেকে উঠে এসেছে। করদাতাদের সেই প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব আপনাদেরকে অবশ্যই নিতে হবে। বর্তমান সরকার এনবিআর তথা রাজস্ব কাঠামোকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।”
রাজস্ব কর্মকর্তাদের বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জনের তাগিদ
পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজস্ব কর্মকর্তাদের বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জনের ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। একের পর এক অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধরণ পরিবর্তিত হচ্ছে। ব্যবসায় নতুন নতুন মডেল তৈরি হচ্ছে। নানা রকম চ্যালেঞ্জও তৈরি হচ্ছে।
“আন্তর্জাতিক কর বা রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় এসেছে পরিবর্তন। পরিবর্তিত বিশ্বের অর্থনৈতিক সমস্যা, সম্ভাবনা, সুবিধা এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় রাজস্ব কর্মকর্তাদেরকে বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জন এখন সময়ের দাবি।”
তিনি বলেন, “ডিজিটাল ইকোনমি, ই-কমার্স, ট্রান্সফার প্রাইসিং, ইন্টারন্যাশনাল ট্যাক্সেশন, ট্রেড ফাইনান্স, ফাইনান্সিয়াল ক্রাইম, মানি লন্ডারিং, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স—এই সবগুলো বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট নলেজ থাকাটা এখন বোধহয় অত্যন্ত প্রয়োজন।
“এটি অস্বীকার করার উপায় নেই, বর্তমানে দেশে ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও এখনো সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম। কর ভিত্তি এখনো তুলনামূলকভাবে অনেক সংকীর্ণ। অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক। সীমিত সংখ্যক নিয়মিত করদাতার উপরে নির্ভরতা হ্রাস করতে হবে মনে হয়। করদাতা ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সম্পর্কও আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন।”
এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বক্তব্য দেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী এনবিআরের বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন।
