০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

আইএমএফের সঙ্গে চুক্তি: অর্থমন্ত্রীর কথায় ‘ধোঁয়াশা’, বাস্তবতা কী?

অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, নতুন কর্মসূচির মূল আলোচনা হবে থাইল্যান্ডের বার্ষিক সভার পর। সেজন্য আগামী অক্টোবরের শেষ দিকে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসবে। ওই সফরেই ঋণ কর্মসূচির শর্ত চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনা হবে।

আইএমএফের সঙ্গে চুক্তি: অর্থমন্ত্রীর কথায় ‘ধোঁয়াশা’, বাস্তবতা কী?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী

হামিমুর রহমান ওয়ালিউল্লাহ

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 07 Oct 2026, 12:47 AM

Updated : 07 Oct 2026, 01:46 AM

সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে চাপে থাকা বিএনপি সরকার উন্নয়ন সহযোগী বিশ্ব ব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অর্থায়নের ওপর ‘নির্ভর করতে চাইছে না’ বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, তাতে ‘ধোঁয়াশা’ তৈরি হয়েছে।

থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ঠিক আট দিন আগে এসে তার এমন বক্তব্যে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, তাহলে আইএমএফের সঙ্গে নতুন চুক্তির আলোচনাও কি ভেস্তে গেল?

রোববার রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, “আইএমএফ টাকা দেবে, বিশ্ব ব্যাংক টাকা দেবে–এটা ভুলে যান। আমি আইএমএফের প্রোগ্রাম ক্যানসেল করে দিয়েছি, আপনারা দেখেছেন। তাদের শর্ত আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।”

রিজার্ভে বিদেশি মুদ্রার ঘাটতি সামলাতে বাংলাদেশ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আইএমএফের সঙ্গে যে ঋণ চুক্তি করেছিল, তা বাতিলের পাশাপাশি নতুন আলোচনা বাতিলেরও ইঙ্গিত ছিল তার কথায়।

অর্থমন্ত্রী এও বলেছেন, আইএমএফ এর আর কোনো শর্ত ‘মানবে না’ বাংলাদেশ।

আইএমএফের ঋণ মানেই শর্তের বেড়াজাল। সেখানে রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কারই বড় অংশ জুড়ে থাকে। এছাড়া জ্বালানি খাতের ভর্তুকি কমিয়ে বাজার মূল্যে সরবরাহের চাপ, কর ছাড়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন করে কর বসানোর চাপ থাকে। পাশাপাশি সরকারি চাকুরেদের বেতন বৃদ্ধির ব্যয় সঙ্কুলান নিয়েও সংস্থাটির প্রশ্ন ছিল।

এখন বাংলাদেশ ‘কোনো শর্ত মানবে না’–এমন অবস্থানে ধারণা হয়, সরকার শর্ত মেনে ঋণ নিতে রাজি নয়।

আবার দেশের জ্বালানি ব্যয় মেটাতে অর্থের জোগান ছাড়াও সরকারের হাতে খুব বেশি সুযোগ নেই। এমন পরিপ্রেক্ষিতে নতুন আলোচনা বাতিলের বাস্তবতাইবা কতটুকু?

অর্থ বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মন্ত্রী মহোদয় তার বক্তব্যে কী বুঝিয়েছেন, তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। ব্যাখ্যা করতে পারবেন।

“তবে আমার মনে হয়, তিনি মূলত পুরনো চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার কথা বলছেন। সেই চুক্তির শর্ত এখন আর মানা হচ্ছে না–সেটিই হয়ত তিনি বলেছেন।”

এমন মনে হওয়ার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “আমরা তো আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ চুক্তির আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।”

ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার জন্য সরকার ইতোমধ্যে আইএমএফের কাছে সংস্কার পরিকল্পনাও জমা দিয়েছে বলে জানান আরেক কর্মকর্তা।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশি প্রতিনিধি দল ওই সভায় অংশ নেবে। সভার ফাঁকে আইএমএফের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

নতুন আলোচনাও সরকার বাতিল করল কিনা, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের তরফে সেই প্রশ্ন করা হলে অর্থমন্ত্রী ব্যস্ততার কথা বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

মঙ্গলবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) এক সেমিনার শেষে তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

আর্থিক সংকটের মধ্যে ২০২২ সাল থেকে কয়েক দফা আলোচনা শেষে ২০২৩ সালের প্রথম দিকে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করে বাংলাদেশ। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঋণের অঙ্ক বেড়ে হয় সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার।

২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার পায় বাংলাদেশ। এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে।

ষষ্ঠ কিস্তি ছাড়ের আলোচনা এক বছর আটকে থাকার পর গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠন করলে আইএমএফ এর ঋণের শর্ত নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়। আগের ঋণ থেকে বেরিয়ে নতুন ঋণ নেওয়ার জন্য আইএমএফ এর কাছে প্রস্তাব দেয় সরকার।

নতুন কর্মসূচির আওতায় তিন বছরের জন্য ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যে গত ৩ জুন আইএমএফ আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি দিয়ে বলে, বাংলাদেশ নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য আবেদন করেছে।

তবে ঋণের অঙ্ক কত, তা নিয়ে কোনো তথ্য দেয়নি আইএমএফ। সেই ঋণের শর্ত ঠিক করতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান চিত্র ও সংস্কার নিয়ে সরকারের অবস্থান জানতে মিশন পাঠায় আইএমএফ।

সেই আলোচনা চলমান থাকার মধ্যেই রোববার ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, “আইএমএফের ঋণ চুক্তি বাতিল করে আমরা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। দাতা সংস্থার সাহায্য ছাড়াই ২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি।”

মন্ত্রী বলেন, বিশ্ব ব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও আইএমএফ এর মত দাতা সংস্থার অর্থায়নের ওপর নির্ভর করতে চাইছে না সরকার।

তিনি বলেন, “আমরা বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল আর্কিটেকচার, পাবলিক ফাইন্যান্স আর্কিটেকচার এবং প্রাইভেট সেক্টরের ফাইন্যান্সিং ব্যবস্থা পরিবর্তন করছি। বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ টাকা দেবে আর আমরা দেশ চালাব—এটা আর হবে না।”

বাস্তবতা কী বলছে?

২০২২ সাল থেকেই বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি নানামুখী চাপে রয়েছে। প্রায় ৫০ বিলিয়ন হতে যাওয়া বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ কমতে কমতে একসময় অর্ধ বছরের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়।

রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ ঘিরে জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করলে মূল্যস্ফীতি এক লাফে বেড়ে গিয়ে ৯ শতাংশের ঘরে ঢুকে পড়ে। তাতে চাপে পড়ে সাধারণ মানুষ, অর্থনীতির নাজুক চেহারা স্পষ্ট হয়।

এরমধ্যেই ২০২৪ সালের অগাস্টে রাজনৈতিক পালাবদল হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা যায়। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুটিয়ে যায়; মানুষ হারায় কর্মসংস্থান।

নির্বাচিত সরকারের আশায় দিন গুনতে থাকা ব্যবসায়ীরা ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার দেখে আশ্বস্ত হলেও ওই মাসেই পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ শুরু হলে দেশে শুরু হয় জ্বালানি সংকট।

এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসা-বিনিয়োগ চাঙ্গা তো দূরে থাক, স্বাভাবিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই কঠিন হয়ে পড়ে সরকারের উপরে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে চলতি অর্থবছরে বিদ্যুতে ভর্তুকির জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা এবং এলএনজিতে ভর্তুকির জন্য আরও ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখতে অর্থ বিভাগ গত আড়াই মাসে প্রায় ২৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ছাড়ও করেছে।

সরকারের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় মার্চ থেকে অগাস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বিপিসির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। বর্তমান আন্তর্জাতিক দরে ডিজেলে লিটারপ্রতি লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। অর্থাৎ শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। তাতে ডিজেল থেকে লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমবে বলে দাবি করেছে সরকার। সেক্ষেত্রে সমন্বয়ের পরও বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকার মত ঘাটতি থেকে যাবে।

এরমধ্যে সরকার তার কর্মীদের বেতন দ্বিগুণ বা তারও বেশি করে তার একটা অংশ বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে দুই দফায় মূল বেতনের যে অংশ বাস্তবায়িত হবে তার জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যখন জটিল হয়ে উঠেছে, তখন উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ না নেওয়ার বাস্তবতা সরকারের ‘নেই’ বলে মনে করছেন অর্থ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা।

তবে নতুন ঋণ চুক্তির আলোচনায় আইএমএফকে বাংলাদেশের তরফে যে সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছেন।

অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, “নতুন কর্মসূচির আওতায় এসব বড় অঙ্কের ভর্তুকি ব্যয় আইএমএফ মেনে নেবে না। ব্যাংককের আলোচনায়ও মানবে বলে মনে হয় না। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমিয়ে মূল্য কিছুটা হলেও সমন্বয় করায় সেটা দিয়ে কনভিন্স করার চেষ্টা করা হতে পারে।”

‘বড় ইস্যু’ রাজস্ব আদায়

বিএনপি সরকার যে বাস্তবতায় ক্ষমতায় এসেছে, তার কাছে এসব ব্যয় কমানোর খুব বেশি সুযোগ নাই। বরং ভোটের ময়দানে জয়ী হতে বিভিন্ন কার্ড চালুর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও সরকারের ভর্তুকি বাবদ খরচ বেড়েছে।

আওয়ামী লীগ আমলের ষোল বছরের আমলাদের আস্থায় আনতে তাদের বেতন বৃদ্ধির দাবি না মানারও উপায় ছিল না সরকারের হাতে।

কিন্তু বিভিন্ন খাতে যেভাবে ব্যয় বেড়েছে, তার বিপরীতে রাজস্ব আদায়ে সুখবর মিলছে না।

আইএমএফের পুরনো ঋণ চুক্তি বাতিল করে নতুন আলোচনার মধ্যে অর্থায়ন পাবে কি পাবে না–এই শঙ্কা থেকে চলতি অর্থবছরের বাজেটে বড় আকারে কর ছাড়ের প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি একদিকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেন আগের অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের প্রায় ৪৫ শতাংশ বাড়িয়ে; অপরদিকে ব্যবসায়ীদের নানাভাবে কর ছাড় দেন।

যেসব আইন প্রয়োগ করে বাড়তি কর আদায়ের সুযোগ রাখত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ‘বিনিয়ন্ত্রীকরণের’ আদলে তা থেকেও মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা দেখা যায় বাজেটে।

তবে এতে করে বিপত্তি ঘটে রাজস্ব আদায়ে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন প্রান্তিক শেষ হলেও কর আহরণের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেনি এনবিআর। কর আহরণ কমে যাওয়াই এর কারণ বলে একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য।

এর মধ্যে প্রতিমাসে মূল্য সংযোজন কর-মূসক বা ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে যে রেহাই দেওয়া হয়েছিল বাজেটে, সেখান থেকেও ফিরে আসে সরকার। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে আগের মতই মাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট রিটার্নও চাওয়া হচ্ছে এখন।

সব মিলিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনাতেও খুব বেশি ‘স্বস্তি’ দেখা যাচ্ছে না বলে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তার ভাষ্য।

তিনি বলেন, “আইএমএফের সঙ্গে নেগোসিয়েশনে রাজস্ব আদায়ই বড় ইস্যু। আগের ঋণ চুক্তির আওতায় প্রথম দুই বছরে কর-জিডিপি বাড়ানোর কথা ছিল বছরে দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট করে, আর তৃতীয় বছরে দশমিক ৭ শতাংশ পয়েন্ট।

“কিন্তু এনবিআর তা তো করতেই পারেনি, উল্টো কর-জিডিপি কমে গেছে। এখন নতুন অর্থবছরে কর ছাড় দেওয়া হল অনেক। হতে পারে এতে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ল। জিডিপি গ্রোথ হল। কিন্তু দেখা গেল, সেই অনুপাতে কর আহরণ হল না। এটাই ‘ইস্যু’।”

এর মধ্যে এনবিআর থেকে রাজস্ব আদায়ের যে পরিকল্পনা আইএমএফকে পাঠানো হয়েছে, তা তারা ‘যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য’ মনে করেনি বলে একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য।

তারা বলছেন, আইএমএফ মূলত চায় ‘কোয়ান্টিফিকেশন’। অর্থাৎ যে কাঠামোগত সংস্কার বা নীতি প্রণয়ন করা হবে, তার বিপরীতে কত অর্থ আদায় হবে, তা জানতে চায়।

আওয়ামী লীগ আমলেও তারা এটাই চেয়েছিল। বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সেই রূপরেখা তৈরি করতেন এনবিআর কর্মকর্তারা।

তবে আইএমএফের সঙ্গে ওই ঋণচুক্তি করার সময় কর-জিডিপি অনুপাত যেখানে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল, তা এখন কমতে কমতে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। ফলে আইএমএফ আশ্বস্ত হচ্ছে না। তবে পরবর্তী ঋণ কর্মসূচিতে রাজস্ব খাতের সংস্কার ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে’ বলেই কর্মকর্তাদের ভাষ্য।

সরকারের অবস্থান কী?

আগের ঋণ থেকে বের হওয়ার পর নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে ঢাকায় আসা আইএমএফ প্রতিনিধি দল গত ১৭ জুলাই তাদের সফর শেষ করে বলে যায়, ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা আগামীতেও ‘অব্যাহত থাকবে’।

আইএমএফের ১২ সদস্যের ওই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির মুদ্রা ও পুঁজিবাজার বিভাগের ডেপুটি ডিভিশনের প্রধান ইভো ক্রজনার।

সফর শেষ করে ফিরে যাওয়ার আগে আইএমএফের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইভো ক্রজনার বলেন, “নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাব্য রূপরেখা নির্ধারণ, আকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আগামী কয়েক মাসে প্রতিশ্রুত সংস্কারের বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা চলবে।”

এর আগে আইএমএফের সঙ্গে বৈঠকের পরে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিতে 'রাতারাতি' বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়, এ বিষয়ে দুই পক্ষই একমত হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, "আইএমএফের সঙ্গে নতুন কর্মসূচি কোন ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, তা স্পষ্ট করা হয়েছে এবং প্রস্তাবিত ভিত্তিসমূহের ওপর তারা সম্পূর্ণ একমত পোষণ করেছেন।

"সংস্কার কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ধাপে ধাপে পরিবর্তনগুলো আনা হবে। রাতারাতি কোনো বড় পরিবর্তন সম্ভব নয় এবং আইএমএফ এ বিষয়ে সহমত প্রকাশ করেছে।"

সরকার এক্ষেত্রে সংস্কারের পক্ষে। তবে সবকিছু ‘রাতারাতি’ বদলে ফেলা, কর ছাড় তুলে দেওয়া, ভর্তুকি কমানো বা সরকারি চাকুরেদের বেতন বৃদ্ধি না করার বিপক্ষে ছিল সরকার।

অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, নতুন কর্মসূচির মূল আলোচনা হবে থাইল্যান্ডের বার্ষিক সভার পর। সেজন্য আগামী অক্টোবরের শেষ দিকে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসবে। ওই সফরেই ঋণ কর্মসূচির শর্ত চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনা হবে।

কত টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “অর্থ কত মিলবে বা কত কিস্তিতে মিলবে এই সবকিছুই নির্ধারণ হবে কী কী শর্ত আছে তার ওপর। তখন বোঝা যাবে।”

সব ঠিকঠাক থাকলেও নতুন কিস্তির অনুমোদন পেতে সময় লাগবে। সরকার ওই পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ ‘স্বাভাবিক’ রাখা এবং নতুন বিনিয়োগ টানার চেষ্টা করছে। সেক্ষেত্রে নতুন ঋণ চুক্তির আওতায় পুরনো চলমান থাকা কিছু কর ছাড় আগামী অর্থবছরে তুলে দেওয়ার সুযোগ থাকবে।

সরকার কেন শেষ পর্যন্ত আইএমএফকে রাজি করানোর চেষ্টা করবে, তার ব্যাখ্যায় এক কর্মকর্তা বলেন, “এটা কেবল সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ সামলানোর জন্য না বরং আইএমএফ কোনো ঋণ চুক্তি থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিলে পরবর্তীতে অন্য সহযোগীদের কাছ থেকেও ঋণ ছাড়ে জটিলতা তৈরি হয়। দেশের ভাবমূর্তি এবং বিদেশি বিনিয়োগ নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়।

অর্থমন্ত্রী অবশ্য উচ্চ সুদে ঋণের বদলে কম খরচে অর্থ পেতে পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট গড়ে তোলার পরামর্শ দিচ্ছেন।

রোববারের আলোচনায় তিনি বলেন, “ক্যাপিটাল মার্কেট ইজ দ্য আন্সার, বন্ড মার্কেট ইজ দ্য আন্সার।”

ভবিষ্যতে অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থ গ্রহণে পুঁজিবাজারকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, পদ্মা সেতু, যমুনা সেতুকেও পুঁজিবাজারে আনার প্রক্রিয়া হচ্ছে।

“আই অ্যাম গোয়িং টু দ্য মার্কেট, আই অ্যাম গোয়িং টু গেট মাই মানি।”