এনসিটি চুক্তি ও সিসিটি ইজারা প্রক্রিয়া বাতিলের দাবি স্কপ’র
“চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালগুলো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে এত আগ্রহ কেন?”
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে দেওয়ার চুক্তি বাতিল এবং চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধের দাবি জানিয়েছে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) চট্টগ্রাম শাখা।
সোমবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এস রহমান হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্কপ নেতারা এই দাবি জানান।
লিখিত বক্তব্যে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এ এম নাজিম উদ্দিন বলেন, “জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক রাষ্ট্রীয় সম্পদের পরিচালনাগত নিয়ন্ত্রণ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার কোনো অন্যায্য চুক্তি দেশের মানুষ মেনে নেবে না।
“বন্দরের আধুনিকায়নের নামে জাতীয় অর্থনীতি, সার্বভৌমত্ব, শ্রমিকের অধিকার ও দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।”
তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। রাষ্ট্রীয় অর্থে নির্মিত ও আয়-উৎপাদনকারী এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের আগে চুক্তির আর্থিক শর্ত, রাজস্ব আয়, কর-সুবিধা, বিনিয়োগের দায়বদ্ধতা এবং জাতীয় স্বার্থের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা প্রয়োজন ছিল।
“চুক্তির পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ না করে এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি করেছে।”
বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এস কে খোদা তোতন বলেন, “বন্দরের আধুনিকায়নের জন্য বিদেশি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ গ্রহণে আপত্তি নেই। কিন্তু নতুন অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ এবং রাষ্ট্রের অর্থে নির্মিত বিদ্যমান লাভজনক টার্মিনালের পরিচালনাগত নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর এক বিষয় নয়।
“নতুন টার্মিনাল নির্মাণে বিল্ড-অপারেট-ট্রান্সফারসহ (বিওটি) উপযুক্ত বিনিয়োগ মডেল বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে কোনো মডেলেই জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও শ্রমিকের অধিকার উপেক্ষা করা যাবে না।”
ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) কেন্দ্রীয় সংগঠক ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালগুলো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে এত আগ্রহ কেন? এনসিটি, সিসিটি ও জিসিবি একের পর এক ইজারা দেওয়া হলে দেশিয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত টার্মিনাল অবশিষ্ট থাকবে না।
“এতে বন্দরের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা ও দক্ষতা বিকাশের সুযোগ সংকুচিত হবে এবং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে।”
পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের (পিসিটি) পরিচালনা চুক্তি অনুযায়ী বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে সেই প্রশ্নও তোলেন স্কপ নেতারা।
একই সঙ্গে এনসিটি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ এবং কাস্টমসের স্বাধীনতা, কনটেইনার পরীক্ষা, জাতীয় নিরাপত্তা ও সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপের ক্ষমতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরি, বেতন-ভাতা, জ্যেষ্ঠতা, পেনশন, অবসরকালীন সুবিধা, ট্রেড ইউনিয়ন ও যৌথ দরকষাকষির অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে সুস্পষ্ট নিশ্চয়তার দাবি জানানো হয় সংবাদ সম্মেলন থেকে।
সংবাদ সম্মেলনে স্কপের পক্ষ থেকে এনসিটি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল, সিসিটি ও জিসিবি ইজারা প্রক্রিয়া বন্ধ, চুক্তির সব শর্ত প্রকাশ এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, বন্দর ও লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞ এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ পর্যালোচনা কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়।
পাশাপাশি দেশীয় ব্যবস্থাপনায় বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের অধিকার সুরক্ষায় সময়বদ্ধ পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ চট্টগ্রামের যুগ্ম সমন্বয়ক খোরশেদুল আলম, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক শ ম জামাল উদ্দিন, জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল বাতেন, বিএফটিইউসির সাধারণ সম্পাদক কে এম শহিদুল্লাহ, বিএফটিইউসির যুগ্ম সম্পাদক রিজওয়ানুর রহমান খান, বিএলএফ চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সভাপতি নুরুল আবসার তৌহিদসহ শ্রমিক নেতারা।
গত ৮ অক্টোবর ঢাকায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামে এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কনসেশন চুক্তি সই হয়।
গত কয়েক বছর ধরে এনসিটি বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিরোধীতা করে আন্দোলন করে আসছে স্কপসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন।
