চট্টগ্রামে সেমিনার: ‘ক্লাস্টারভিত্তিক’ অর্থনৈতিক বিকাশ দরকার, বলছেন অধ্যাপক ওবায়দুল করিম
“অর্থনীতি সচল রাখতে কোনো দেশের জন্য দরজা বন্ধ করে রাখা যায় না,” বলেন ব্যবসায়ী আমিরুল হক।
চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ‘ক্লাস্টারভিত্তিক’ সমন্বিত উন্নয়নের কথা বলেছেন চট্টগ্রাম বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ ওবায়দুল করিম।
তিনি মনে করেন, কোনো দেশের উন্নয়ন এককভাবে হয় না। উন্নয়নের জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ‘ক্লাস্টারভিত্তিক’ অর্থনৈতিক বিকাশ প্রয়োজন।
শুক্রবার চট্টগ্রামের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘চট্টগ্রাম: ইকোনোমিক গেটওয়ে অ্যান্ড লাইফলাইন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে অধ্যাপক ওবায়দুল করিম এ অভিমত তুলে ধরেন।
ইউরোপের জার্মানি, নরওয়ে, সুইডেন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের অর্থনৈতিক বিকাশের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “দেশগুলো পাশাপাশি থেকে প্রায় সমমাত্রিক অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। উত্তর আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যেও অর্থনৈতিক সংযোগ রয়েছে। আসিয়ানের থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের উন্নয়নও পারস্পরিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত।”
একইভাবে চীন, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের অর্থনৈতিক বিকাশে আঞ্চলিক সংযোগের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন অধ্যাপক ওবায়দুল করিম।
কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের ‘ক্লাস্টারভিত্তিক’ উন্নয়নের ধারণা কার্যকরভাবে বিকশিত হয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, “ভারতের উন্নয়ন বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, একইভাবে বাংলাদেশের উন্নয়ন ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এ ধারণাকে আরও বিস্তৃত করতে হবে। নেপাল ও পাকিস্তানের উন্নয়নকেও বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। প্রতিবেশী দেশগুলোকে বাদ দিয়ে কোনো দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি টেকসই হবে না।”
সেমিনার আয়োজক ছিল কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ চ্যাপ্টার।
সেখানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক।
প্রবন্ধে তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম থেকে সেবা নিলে নেপালের মতো স্থলবেষ্টিত দেশের পণ্য পরিবহনে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। অন্য কোনো বন্দর ব্যবহার করলে দূরত্ব প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার হতে পারে। ফলে চট্টগ্রামকে ব্যবহার করে এসব দেশের পরিবহন ব্যয় ও সময় কমানোর সুযোগ রয়েছে।”
‘সেভেন সিস্টার্স’ হিসেবে পরিচিত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোসহ প্রতিবেশী দেশগুলোকে সেবা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে আমিরুল হক বলেন, “চেম্বার রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বিষয়টি বিবেচনা করে না। অর্থনীতি সচল রাখতে কোনো দেশের জন্য দরজা বন্ধ করে রাখা যায় না।
“ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সেভেন সিস্টার্স, নেপাল এবং মিয়ানমারের কিছু অংশকে চট্টগ্রাম বন্দর ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর মাধ্যমে সেবা দিতে হবে। ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে এ ধরনের আঞ্চলিক সংযোগ বড় ভূমিকা রাখবে।”
এদিকে, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
চট্টগ্রামের এই ব্যবসায়ী বলেন, “অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার শুরুতেই পানি সরবরাহ, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিশ্চয়তা দেওয়া প্রয়োজন ছিল। এসব ইউটিলিটি নিশ্চিত না করায় বিনিয়োগ আকর্ষণে সমস্যা তৈরি হয়েছে।”
মুল প্রবন্ধে চট্টগ্রাম-ঢাকা যোগাযোগের সময় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, “দুই শহরের মধ্যে যোগাযোগের সময় দুই ঘণ্টার মধ্যে নামিয়ে আনা প্রয়োজন।”
উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার আগে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়ে প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বলেন, “আমরা যখন কোনো প্রকল্পের সীমাবদ্ধগুলো যুক্তি দিয়ে বিচার করি, তখন বলা হয় আমরা উন্নয়নের বিপক্ষে। এখন বলা হচ্ছে, ঢাকা চট্টগ্রাম দুরত্ব কমানোর জন্য এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হবে, উপরে গাড়ি চলবে, নিচ ট্রেন চলবে। আমার কি এখন এই মুহুর্তে প্রয়োজন আছে?”
চটট্টগ্রামের ১৫ উপজেলাগুলোয় যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্যের উন্নয়ন করা হতো তাহলে গ্রাম থেকে শহরে শিক্ষা, চিকিৎসার জন্য আসতে হয় না, এ কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “তাহলে আমার জন্য প্রায়োরিটি কোনটা? কর্ণফুলী টার্নেলের মতো প্রজেক্ট করে প্রতিদিন ১২ লাখ টাকা লোকসান দিচ্ছি।”
তাই কোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে অগ্রাধিকার ঠিক করা এবং জনগণের কথা শোনার আহ্বান জানান সুভাষ বড়ুয়া।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শাহাদাত হোসেন চট্টগ্রামের উন্নয়নে ‘সিটি গভর্নমেন্ট’ গড়ার কথা বলেন।
সাবেক এ সিটি মেয়র বলেন, “মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকে সিটি গভর্নমেন্ট বা নগর সরকার গড়ার কথা বলে আসছি।
“নগরের বিভিন্ন সেবা ও অবকাঠামোর দায়িত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে রয়েছে। এখানে শুধু আমরা বসে সমন্বয় করলেই হবে না। নগর সরকার ছাড়া পরিকল্পিত শহর গড়ে তোলা সম্ভব নয়।”
তিনি বলেন, “সিটি গভর্নমেন্ট ছাড়া আপনি আমাকে সিঙ্গাপুর বানাতে বলছেন, টরন্টোর মতো একটি শহর গড়ে তুলতে বলছেন। কিন্তু সেই ক্ষমতা আমাকে দিচ্ছেন না। তাহলে কীভাবে কাজ করবো।”
জ্বালানি নিরাপত্তায় পাঁচ খাত উন্নয়নের প্রস্তাব
চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেন চট্টগ্রামের সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক শরীফ আশরাফউজ্জামান।
তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৭৫ লাখ টন এলএনজি আমদানি করা হয়। কিন্তু চাহিদা পূরণে আরও প্রায় ৭০ লাখ টন প্রয়োজন রয়েছে। এ ঘাটতি মোকাবেলায় আরও দুটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা জরুরি।
তার মতে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে এ ধরনের টার্মিনাল নির্মাণের সুযোগ রয়েছে এবং দ্রুত উদ্যোগ নিলে স্বল্প সময়ের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
তার পাঁচটি প্রস্তাব হল-
• কৌশলগত তেলের মজুদ বাড়াতে হবে।
• এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বাড়াতে দুটি স্থলভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণ।
• নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
• দেশে বিদ্যমান কয়লার মজুদ ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
• দেশের সব মানুষের জন্য সাশ্রয়ী জ্বালানি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তজার্তিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) ঢাকার নতুন ব্যুরোপ্রধান সাংবাদিক জুলহাস আলমের সঞ্চালনায় সেমিনারে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন, দৈনিক আজাদী পত্রিকার সম্পাদক এম এ মালেক।
