Published : 13 May 2026, 11:25 PM
সারা দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে চট্টগ্রামে নয়টি হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে।
নগরীর যেসব এলাকায় হামের রোগী বেশি শনাক্ত হয়েছে, সেই তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার ‘হটস্পট’ নির্ধারণের কথা জানিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার সার্ভিল্যান্স অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন মেডিকেল অফিসার (এসআইএমও) খাদিজা আহমেদ।
হটস্পটগুলো হলো- নগরীর ২ নম্বর জালালাবাদ, ৪ নম্বর চান্দগাঁও, ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী, ১৪ নম্বর লালখান বাজার, ১৮ নম্বর পূর্ব বাকলিয়া, ৩১ নম্বর আলকরণ, ৩৮ নম্বর দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর, ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর ও ৪০ নম্বর উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ড।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে খাদিজা আহমেদ বলেন, “ডব্লিউএইচওর গাইডলাইন অনুসারে এখন বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি চলছে। শুধু চট্টগ্রামে নয়, সবখানে পজিটিভ কেস আছে। হাম ছড়িয়ে পড়েছে।”
নগরীর যেসব এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ আর শিল্প এলাকা হিসেবে পরিচিত এবং বাইরের জেলা থেকে নিয়মিত লোকজনের আনাগোনা আছে, সেসব এলাকায় হাম বেশি শনাক্ত হচ্ছে বলে তথ্য দেন এ কর্মকর্তা।
খাদিজা আহমেদ বলেন, “নগরীর বন্দর-পতেঙ্গা, সদরঘাট-আলকরণ-কোতোয়ালী এবং বাকলিয়া এলাকায় হাম শনাক্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।”
এই পরিস্থিতিতে হামের টিকা দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, জনসমাগম এড়িয়ে চলা এবং হাম শনাক্ত হওয়াদের আলাদাভাবে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

জেলায় হামের লক্ষণ নিয়ে ৬ মৃত্যু
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, চট্টগ্রাম জেলায় এখন পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে চারজনই নগরীর বাসিন্দা। অন্য দুজন উপজেলার বাসিন্দা। জেলায় এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে এক শিশুর।
রোববার পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় হামের লক্ষণ নিয়ে মৃত্যুর কোনো তথ্য দেয়নি সিভিল সার্জন অফিস। সোমবারই প্রথমবারের মতো তথ্য দেওয়া হয়।
সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মূলত বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্যে ভিত্তিতে আমরা তথ্য দিই। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে সন্দেহজনক হামে ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।”
জেলায় সবচেয়ে বেশি হাম আক্রান্ত শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানকার মেডিসিন ইউনিটের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ৫০টি শয্যায় এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ‘এক্সটেনশন’ অংশে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বলেন, “১৫ জন শিশু আইসিইউতে আছে। তারাসহ মোট ১৩০ জনের মতো চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রতিদিনই নতুন রোগী আসছে। জ্বর, সর্দি, কাশিসহ বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে এসব শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।”
মার্চের শেষ দিক থেকে এখন পর্যন্ত হামের লক্ষণ বা উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলে ৩৫ শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছেন পরিচালক তসলিম উদ্দিন। যদিও সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুধবারের দেওয়া বুলেটিনের তথ্যের সঙ্গে এই তথ্যের সঙ্গে মিল নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বুধবার জানিয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে হামের লক্ষণ নিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগে মারা গেছে ৩১ জন।

নগরীতে শনাক্ত বেশি
হামের প্রাদুর্ভাবের পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, জনসমাগম এড়িয়ে চলা এবং হাম শনাক্তদের আলাদা রেখে চিকিৎসা দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা।
সংক্রমণ ঠেকাতে আক্রান্ত শিশুদের আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। পাশাপাশি হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য দুটি সরকারি হাসপাতালে পৃথক ব্যবস্থাপনার চিন্তা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলায় মঙ্গলবার পর্যন্ত ১১৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে নগরীতেই ৭১ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। উপজেলাগুলোতে হাম শনাক্ত হয়েছে ৪৪ জনের।
সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “আক্রান্ত শিশুদের সংস্পর্শে আসায় অন্য রোগে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যেও হাম সংক্রমিত হচ্ছে। যেমন চমেক হাসপাতাল বা মা ও শিশু হাসপাতালে ডায়েরিয়া বা নিউমোনিয়া নিয়ে আসা শিশুদের মধ্যেও হাম ছড়াচ্ছে।
“বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। হামে আক্রান্ত ও হামের উপসর্গ থাকা শিশুদের আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দিতে হবে। তাদের আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়টি আমরা ভাবছি।”
এজন্য আগামী সপ্তাহে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পরিচালিত মেমন হাসপাতাল ও বাংলাদেশ রেলওয়ে হাসপাতাল শুধুমাত্র হামের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট করার কাজ চলছে বলেও তথ্য দেন তিনি।

উপায় কী
চমেক হাসপাতালের পরিচালক তসলিম উদ্দিন বলেন, শিশুদের জ্বর, সর্দি, কাশি থাকলে যে চিকিৎসা, সেটিই দেওয়া হয়। কারো শ্বাসকষ্ট বা নিউমোনিয়া থাকলে তাদের অক্সিজেন প্রয়োজন হলে অক্সিজেন দেওয়া হয়।
“এছাড়া কোনো শিশুর নিউমোনিয়া মারাত্মক হলে তখন আইসিইউ সাপোর্ট দিতে হয়; এভাবে চিকিৎসা চলছে।”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এসআইএমও খাদিজা আহমেদ বলেন, “হাম আক্রান্ত হওয়ার কারণে অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে সেটার চিকিৎসা করা হয়। সরাসরি হামের কোনো চিকিৎসা নেই। হাম প্রতিরোধের একমাত্র উপায় ভ্যাকসিনেশন।”
চট্টগ্রাম জেলায় গত ১০ এপ্রিল শুরু হওয়া টিকা ক্যাম্পেইনের আওতায় এখন পর্যন্ত জেলায় ৬ লাখ ৯৩ হাজার ও নগরীতে ২ লাখ ৮১ হাজার টিকা দেওয়া হয়েছে বলে সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “টিকা ক্যাম্পেইন চলছে। আশা করি সপ্তাহ দুয়েক পর সংক্রমণের গতি কমতে শুরু করবে।”
সংক্রমণ কমাতে টিকাদানের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধির ওপর জোর দিয়ে খাদিজা আহমেদ বলেন, “এখন বড়দেরও হাম হচ্ছে। তাই জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে। পাশাপাশি হাঁচি-কাশির সময় স্বাস্থ্যবিধি মানা, নিয়মিত হাত ধোয়া এবং মাস্ক ব্যবহারের মতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।”
পাশাপাশি হামে আক্রান্ত ও হামের উপসর্গ আছে এমন শিশুদের আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।
চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে মঙ্গলবার হামের উপসর্গ নিয়ে ২৫০ শিশু চিকিৎসাধীন ছিল।