২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

সাগরে গিয়ে দুই মাসেও ফেরেননি ১৮ জেলে, উদ্বেগ পরিবারের

আইন শৃঙ্খলাবাহিনী বলছে, তারাও খোঁজ করছে ট্রলারটি, কিন্তু কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

সাগরে গিয়ে দুই মাসেও ফেরেননি ১৮ জেলে, উদ্বেগ পরিবারের
সাগরে মাঝ ধরতে যাওয়া ‘এফভি খাজা আজমীর’ নামে কাঠের এ ট্রলার ও ১৮ জেলের সন্ধান মিলছে না।

চট্টগ্রাম ব্যুরো

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 12 Nov 2025, 01:09 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:06 PM

মাছ ধরতে ট্রলার নিয়ে দুই মাস আগে সাগরে যাওয়া ১৮ জেলের কোনো খোঁজ পাচ্ছে না তাদের পরিবারের সদস্যরা। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে তাদের সন্ধানে নৌ পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীসহ বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরছেন তারা।

হদিস না মেলা ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, মাঝ ধরতে গেলে সাধারণত সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে ট্রলার, জেলে, মাঝিমাল্লারা ফিরে আসেন। কিন্তু এবার দুই মাস হয়ে গেলেও তারা ফেরেনি। ১৮ জনের কারও সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারছেন না তারা।

আইন শৃঙ্খলাবাহিনীও বলছে, তারাও খোঁজ করছে ট্রলারটি। কিন্তু কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

চট্টগ্রাম নগরীর নতুন ফিশারি ঘাট থেকে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ১৮ মাঝিমাল্লা নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে রওনা করে কাঠের তৈরি ট্রলার ‘এফভি খাজা আজমীর’। ট্রলার মালিক আলী আকবরও রয়েছেন সেই দলে। সেদিন রাত পৌনে ১০টার দিকে মোবাইল ফোনে যোগযোগ করেন তার স্ত্রী সেলিনা আক্তার। এরপর থেকে আর ট্রলারটির সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।

ট্রলারটির সন্ধান পেতে গত ২৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের সদরঘাট নৌ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন সেলিনা আক্তার।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ট্রলারটি চট্টগ্রাম নগরীর নতুন ফিশারিঘাট থেকে রওনা করে। রাত পৌনে ১০টার দিকে আলী আকবরের সঙ্গে সবশেষ যোগাযোগ হয়। এরপর থেকে তার ও মাঝিসহ অন্য যে কয়জনের ফোন নম্বর ছিল, সেগুলোতে আর সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না।

সেলিনা বলেন, বিভিন্ন সময়ে সাগরে মাছ ধরতে ট্রলার যায়। সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে ট্রলার ফিরে আসে মাছ নিয়ে, কিন্তু এবার দুই মাসেও ট্রলারটি ফিরে আসেনি। কোনো খবর না পেয়ে ট্রলার রওনা করার ১৩ দিন পর আমরা সাধারণ ডায়েরি করেছি।

ট্রলারের ১৮ জনের মধ্যে কক্সবাজার পৌর সদরের নুনিয়াছড়ার ছয়জন, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার গণ্ডামারা ইউনিয়নের বড়ঘোনা এলাকার দুইজন এবং অন্যরা কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার বাসিন্দা।

সোমবার নগরীর সদরঘাট নৌ থানার সামনে ভিড় করেন নিখোঁজদের স্বজন ও ট্রলার মালিকের পরিবারের সদস্যরা। দুই ছেলে ও ছোট মেয়েকে নিয়ে সেখানে এসেছিলেন ট্রলার মালিকের স্ত্রী সেলিনা আক্তার।

কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, “১৩ সেপ্টেম্বর রাতে যখন আমার স্বামীর সাথে কথা হয় তখন তিনি আমাকে ‘দোয়া করতে’ বলেছিলেন। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।

“ট্রলারসহ নিখোঁজের পর থেকে নৌ পুলিশ, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনীসহ বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেছি। সবাই শুধু আমাদের বলছেন তারা বিষয়টি দেখছেন।”

তিনি বলেন, “১৮ জন জলজ্যান্ত মানুষসহ একটা ট্রলার হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেলে। এটা কীভাবে সম্ভব। প্রতিদিন আমি আমার স্বামী আর সন্তানরা তাদের বাবার জন্য অপেক্ষায় থাকেন। কখন তাদের বাবা ফিরে আসবে, কখন ফোন করবে সেই আশায় থাকে।”

নগরীর সদরঘাট নৌ থানার সামনে কথা হয় ছেলের সন্ধানে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে আসা মো. সিদ্দিকের সঙ্গে।

তিনি বলেন, তার পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তার ছেলে হেলাল। দুই বছর ও সাত মাস বয়েসী দুই সন্তান রয়েছে হেলালের। 

“হেলাল কখনও রাজমিস্ত্রি আবার কখনও খালে বিলে মাছ ধরে বিক্রি করে সংসার চালান। ট্রলারের মাঝি আবু তাহেরের সঙ্গে গত ১৩ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে আসে ট্রলারে কাজ করতে। বছর খানেক আগে দুই-তিন বার আমার ছেলে হাঙর ধরার ট্রলারে গিয়েছিল। সেগুলো দিনে দিনে ফিরে আসে সাগর থেকে। এবার প্রতিবেশী তাহেরের সঙ্গে প্রথমবার বড় ট্রলারে যায়।”

সিদ্দিক বলেন, “ট্রলারের মাঝিসহ ছয়জন আমরা একই এলাকার বাসিন্দা। তাদের কারো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।”

নৌ পুলিশ সদরঘাট থানার ওসি মিজানুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ট্রলারটি সাগর থেকে নিখোঁজ হয়েছে। সেখানে আমাদের কিছুই করার নেই। আমরা বিষয়টি কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনীকে জানিয়েছি।

“অনেক সময় ট্রলার সীমান্ত অতিক্রম করলে অন্য দেশে আটক হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সে বিষয়ে বিজিবিকেও বলা হয়েছে। তারাও কোন সন্ধান দিতে পারেনি।”

“আমরা বিভিন্নভাবে খোঁজ নিচ্ছি। পাশাপাশি তাদের সংগঠনগুলোর নেতাদেরও বলেছি তারা যেন কিছু জানতে পারলে আমাদেরকে জানায়। সাগরে অনেক সময় ঝড়ের কবলে পড়ে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন স্থানে লাশ উদ্ধার হলে সেখানে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের খোঁজ নিতেও আমরা পরামর্শ দিয়েছি,” যোগ করেন ওসি।