তিন বছর আগে ‘অপহৃত’ শিশুকে ফিরে পেল পরিবার

চট্টগ্রাম থেকে ‘অপহরণ হওয়া’ ওই শিশু এতদিন কেরানীগঞ্জের একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করছিল।

চট্টগ্রাম ব্যুরোবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 August 2022, 01:24 PM
Updated : 3 August 2022, 01:24 PM

চার লাখ টাকা মুক্তিপণের জন্য প্রতিবেশী এক ব্যক্তি চট্টগ্রাম থেকে ফুসলিয়ে শিশুটিকে নিয়ে যায় ঢাকার কেরানীগঞ্জে। সেখানে ‘অপহরণকারীর’ হাত ফসকে সটকে পড়লেও বাড়ির ঠিকানা বলতে না পারায় আর পরিবারের কাছে ফেরা হয়নি ওই সময় আট বছরের শিশুটির।

তিন বছর ধরে মো. সিয়াম নামের শিশুটি কেরানীগঞ্জের পানগাঁও কন্টেইনার টার্মিনালের একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করছিল। ‘আল আমিন রেস্টুরেন্ট’ নামের ওই রেস্তোরাঁর সামনে ঘোরাঘুরির সময় মালিক তাকে কাজে রাখেন।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের বাকলিয়ার বগারবিল এলাকায় সিয়ামের পরিবারের আরেক প্রতিবেশী হারানো বিজ্ঞপ্তি দেখে তাকে চাঁদপুরে দেখার কথা জানায়। সেই সূত্র ধরে চট্টগ্রামের পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাকে মঙ্গলবার উদ্ধারের পর বুধবার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।

পিবিআইর কর্মকর্তারা জানান, ২০১৯ সালের এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ওই সময় সিয়ামের পরিবারের প্রতিবেশী নাছিরকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। এরপর আড়াই বছর কারাগারে থাকার পর সম্প্রতি তিনি জামিনে ছাড়া পেয়েছেন।

পিবিআই এর চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার নাঈমা সুলতানা শিশুটিকে অপহরণ ও উদ্ধারের ঘটনা তুলে ধরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, এবার কোরবানি ঈদের আল আমিন রেস্টুরেন্টের মালিক সিয়ামকে গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তখনই এ ঘটনার জট খোলার সূত্রপাত হয়।

তিনি বলেন, চাঁদপুরের ওই এলাকার এক নারীর মেয়ের শ্বশুড় বাড়ি নগরীর বাকলিয়ার বাদামতলীতে। ওই নারী সম্প্রতি চট্টগ্রামে শিশু নিখোঁজ সংবাদের পোস্টার দেখে এবং স্থানীয়দের কাছ থেকে শুনতে পেয়ে সিয়ামের মত এক শিশুকে চাঁদপুরে দেখতে পেয়েছেন বলে জানান।

“সেই সূত্র ধরে কেরানীগঞ্জে আল আমিন রেস্টুরেন্টের সন্ধান পাওয়া যায়। তখন সিয়ামের পরিবারের সদস্যদের সেখানে পাঠানো হয় বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করতে। তারা কেরানীগঞ্জে গিয়ে সিয়ামের সেখানে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের সেখান থেকে উদ্ধার করে।“

সিয়াম অপহরণের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পরিদর্শক মো. মোজাম্মেল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, ২০১৯ সালের ২৫ জুন সিয়ামকে মার্বেল কিনে দেয়ার কথা বলে তাদের প্রতিবেশী নাছির নামে এক ব্যক্তি অপহরণ করে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরে নাছিরকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও সিয়ামের কোনো খোঁজ মেলেনি। এমনকি এই ব্যক্তি শিশুটির পরিবারের কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা মুক্তপণও নিয়েছিল।

তিনি জানান, সিয়ামের বাবা প্রবাসী হওয়ায় টাকার জন্য নাছির ফুসলিয়ে শিশুটিকে অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং পরদিন টেলিফোনে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।

সিয়ামের মা ৪০ হাজার টাকা পরিশোধ করলেও সে তাকে ফেরৎ না দিয়ে টালবাহানা শুরু করে জানিয়ে তিনি জানান, এ ঘটনায় বাকলিয়া থানায় একটি অপহরণ মামলার পর পুলিশ নাছিরকে গ্রেপ্তার করে। আদালতে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন। কিন্তু সিয়ামের কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে পিবিআই বাকলিয়া থানা থেকে মামলাটি নিজেদের কাছে নেয়।

নাছিরে দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা মোজাম্মেল জানান, নাছির সিয়ামকে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে করে কুমিল্লা নিয়ে যায়। পরে নারায়ণগঞ্জ হয়ে কেরানীগঞ্জে চলে যায়। সেখানে সিয়াম তার হাত থেকে ফসকে যায়। না পেয়ে সে চট্টগ্রাম ফিরে আসে।

ঋণগ্রস্থ হয়ে যাওয়ায় সে সিয়ামকে অপহরণ করে। তার ধারণা ছিল সিয়ামের বাবা প্রবাসী, তাকে নিয়ে যেতে পারলে মুক্তিপণ বাবদ টাকা আদায় করে ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন। তবে শিশুটির পরিবার এত টাকা দিতে পারেনি।

সিয়াম উদ্ধারের পর পুলিশ জানতে পারে, ওই রেস্তোরাঁ মালিক একটি শিশুকে তার প্রতিষ্ঠানের সামনে ঘুরতে দেখে ঠিকানা বা ফোন নম্বর জানতে চান। তবে কিছু জানাতে না পারলে তাকে রেস্তোরাঁর কাজে রেখে দেন।

পিবিআই কর্মকর্তা মোজাম্মেল জানান, বয়সের তুলনায় শিশুটির ‘বুদ্ধি কম’। এতদিন পর সে তার মা ও ভাই বোনদের চিনতে পেরেছে। তবে তিন বছর আগের ঘটনার বিষয়ে ‘শুধু চকলেট খেতে ট্রেনে করে যাওয়ার বিষয়টি’ জানাতে পেরেছে। আর কোনো তথ্য দিতে পারেনি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক