Published : 29 Oct 2022, 08:08 PM
গ্যাবায় সংবাদ সম্মেলন শুরুর আগে কক্ষের একপাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন ক্রেইগ আরভিন। বিভিন্ন দেশের সংবাদকর্মীরা, আইসিসির মিডিয়ার কর্মকর্তাদের অনেকে তাকে অভিনন্দন জানালেন। পরে যখন তিনি সতীর্থদের সঙ্গে মাঠে নামলেন অনুশীলনের জন্য, তার পিঠ চাপড়ে দিলেন আইসিসি ডিজিটালের কাজের জন্য মাঠে আসা ধারাভাষ্যকার ইয়ান বিশপ। শুধু এখানেই নয়, বিশ্বকাপের ভেন্যু থেকে ভেন্যু, বিশ্ব ক্রিকেটের নানা প্রান্তে চলছে তাদের নিয়ে আলোচনা ও প্রশংসার জোয়ার।
পাকিস্তানের বিপক্ষে বৃহস্পতিবার পার্থে স্মরণীয় জয়ের পর জিম্বাবুয়ে এখন পাদপ্রদীপের আলোয়। এমন আলোয় তারা অভ্যস্ত নন খুব একটা। তবে তাতে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে না তাদের। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কণ্ঠে অধিনায়ক আরভিন শোনালেন, সেমি-ফাইনাল স্বপ্নের ছবি আঁকছেন তারা।
আরভিনের এই স্বপ্নকে এখন মোটেও অবাস্তব কিছু মনে হচ্ছে না। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচ থেকে ১টি পয়েন্ট পেয়ে গেছে তারা বৃষ্টির সৌজন্যে। উজ্জীবিত ক্রিকেট খেলে হারিয়েছে পাকিস্তানকে। সামনে এখন বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস। আরভিনরা সব সমীকরণ মাথায় নিয়েই সামনে তাকাচ্ছেন আশায় বুক বেঁধে।
“সেমি-ফাইনালে খেলার প্রবল সম্ভাবনা আছে আমাদের। এজন্য বাংলাদেশের বিপক্ষে জিততে হবে, এরপর হারাতে হবে নেদারল্যান্ডসকে। শেষ ম্যাচ ভারতের সঙ্গে… অন্য ম্যাচের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে হয়েও যেতে পারে।”
স্রেফ একবারই নয়, সেমি-ফাইনাল খেলার আশার কথা আরও দুই দফায় থাকল সংবাদ সম্মেলনে তার কথায়। এসব যে স্রেফ বলার জন্য বলা নয়, তাও পরিষ্কার তার কথা বলার ধরনে, প্রতিজ্ঞা তার চোখে-মুখে। এক বছর আগের বিশ্বকাপের সঙ্গে কতটা পরিবর্তন!
গত বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিশ্বকাপে তারা খেলতেই পারেনি। প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কারণে আইসিসির নিষেধাজ্ঞা থাকায় বাছাইয়ে তারা ছিল নিষিদ্ধ। এর আগে ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পেরোতে পারেনি তারা বাছাইপর্ব। ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপে ১০ দলের আসরে তাদের জায়গা হয়নি।
দ্বিপাক্ষিক সিরিজে তো বড় দলগুলির সঙ্গে তাদের দেখা হয় কদাচিৎ। সেখানে মাঝেমধ্যে অঘটন কিছু ঘটিয়ে দিলেও বিশ্ব ক্রিকেটের তা নজরে পড়ে সামান্যই। কিংবা নজরে পড়লেও থেমে যায় সামান্য কিছু চর্চার পরই। এবার বিশ্বমঞ্চকে নাড়া দেওয়ার পর বিশ্ব ক্রিকেটের যে মনোযোগ তারা পাচ্ছে, এটা অন্য কিছুতে নিশ্চিতভাবেই সম্ভব হতো না।
দলের এই সাফল্য অধিনায়ক হিসেবেও আরভিনের জন্য বড় পাওয়া। এই অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়ার পথ সুগম করে তোলায় কৃতজ্ঞতা জানালেন তিনি দলের সিনিয়র ক্রিকেটারদের।
“আমার কাছে এটা গোটা বিশ্বকে পাওয়ার মতো। সবসময়ই নিজের মনে প্রশ্ন জাগে, বিভিন্ন ম্যাচে কাজটা ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা। যে ফলাফল আমরা পেয়েছি… এবং শন উইলিয়ামস, সিকান্দার রাজা, রেজিস চাকাভাদের মাঠে পাওয়া এবং চাপের মুহূর্তে তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারাটাও দারুণ। কারণ, স্রেফ নিজে থেকে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক কঠিন।”
উইলিয়ামস-রাজাদের জন্যও এই সাফল্য ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে অনেক বড় প্রাপ্তি। সেই ২০০৬ সাল থেকে খেলছেন উইলিয়ামস, ২০০৮ থেকে চাকাভা। আরভিনের নিজের অভিষেক ২০১০ সালে, রাজা খেলছেন ২০১৩ থেকে। দীর্ঘ এই পথচলায় জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের সঙ্গী তারা। সত্যি বলতে, জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের পতনই বেশি ছিল এই সময়ে। এই বিশ্বকাপ সেখানে তাদের উপহার দিচ্ছে আকাশ ছোঁয়ার আনন্দ।
ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে এমন প্রাপ্তিতে উচ্ছ্বসিত আরভিন।
“খুবই তৃপ্তিদায়ক। ক্যারিয়ারজুড়ে আমাদের লক্ষ্য ছিল বিশ্বকাপে খেলা ও ভালো খেলা। কয়েকটি বিশ্বকাপ আমরা খেলেছি। তবে স্রেফ খেলাই তো যথেষ্ট নয়, এই পথচলায় স্মৃতির ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করাও জরুরি। পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়টি আমাদের স্মৃতিতে রয়ে যাবে অনেক, অনেক দিন।”
এই সুযোগটিকে তাই স্রেফ একটি জয়ে সীমাবদ্ধ করে রাখতে চান না আরভিনরা। তাদের লক্ষ্য যে এই বিশ্বকাপ ছাপিয়ে আরও বড় কিছুতে।
“দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের কথা বললে অবশ্যই চেষ্টা থাকবে বড় দলগুলির সঙ্গে খেলার। এমন একটি বিশ্বকাপে এসে, এরকম পারফরম্যান্স দেখানোর চেয়ে বড় কিছু আর নেই। বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তানের মতো দলগুলির বিপক্ষে। আমাদের জন্য এটা বিশাল এক জয়, শুধু এই টুর্নামেন্টে নয়, দল ও দেশ হিসেবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথেও।”
“আশা করি, স্রেফ হুট করে পাওয়া একটি জয় নয় এটি। আমরা চেষ্টা করব এই ধরনের জয়ের পুনরাবৃত্তি করতে এবং এমন কিছু করতে যেন ইংল্যান্ডে সফর করতে পারি বা তারা আমাদের দেশে আসতে পারে কিংবা অস্ট্রেলিয়া-ভারতে যেতে পারি। অবশ্যই এটা সুযোগের দুয়ার খুলে দিচ্ছে। তবে আমাদের আরও ধারাবাহিকভাবে করতে হবে।”
সেই ধারাবাহিকতার পথেই এবার সামনে বাংলাদেশ। এই ম্যাচে জিততে পারলেই স্বপ্ন পূরণের পথে আরেকধাপ এগিয়ে যাবেন আরভিনরা।