২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

বিশ্বকাপ, ভারত ও বাংলাদেশের বিষাদ

মেলবোর্ন থেকে বেঙ্গালুরু, কার্ডিফ হয়ে অ্যাডিলেইড, বিশ্বকাপের ভারতের বিপক্ষে কেবল হতাশাই সঙ্গী বাংলাদেশের।

আরিফুল ইসলাম রনি আরিফুল ইসলাম রনি

অ্যাডিলেইড থেকে

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Nov 2022, 10:26 AM

Updated : 03 Nov 2022, 05:04 PM

“২০১৬ বিশ্বকাপের মতোই আমরা খুব কাছে গিয়েছিলাম, কিন্তু তা যথেষ্ট হয়নি”… অ্যাডিলেইড ওভালের সংবাদ সম্মেলনে যখন বলছিলেন সাকিব আল হাসান, তার মুখে তখন হাসি। তবে সেই হাসির আড়ালে আসলে লুকিয়ে আক্ষেপ। হতাশা। আরও একবার খুব কাছে গিয়েও না পাওয়ার বেদনা।

ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ। বিশ্বকাপের মঞ্চ। শেষ বলে হার। সবকিছু মিলিয়ে ২০১৬ বিশ্বকাপের বেঙ্গালুরুর সেই ম্যাচের প্রসঙ্গ অবধারিতভাবেই উঠে আসার কথা ছিল। সেই ম্যাচের সঙ্গে মিলিয়ে প্রশ্ন হলোও বটে। তবে সব প্রশ্নের আগে সাকিব নিজে থেকেই ফিরে গেলেন সাড়ে ৬ বছর আগের সেই ম্যাচে। তাতে আরও বেশি করে ফুটে উঠল, বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ মানেই এখন যেন বাংলাদেশের বিষাদ। কাছে গিয়েও না পাওয়ার যন্ত্রণা।

বেঙ্গালুরুর সেই ম্যাচ নিয়ে নতুন করে বলার আছে সামান্যই। মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহকে ক্রিজে নিয়েও ৩ বলে ২ রান করতে না পারার সেই ভুতুড়ে স্মৃতি বাংলাদেশকে তাড়িয়ে বেড়াবে বহু বছর। ভারতীয় সমর্থকে ঠাসা বেঙ্গালুরুর গ্যালারি ওই ৩ বলের আগে ছিল প্রায় নিশ্চুপ। গুটিকয় বাংলাদেশি সমর্থক তখন স্মরণীয় জয়ের আগাম উচ্ছ্বাসে গলা ফাটাচ্ছেন শুধু।

কিন্তু পরের অংশটুকু জায়গা পেয়ে গেছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের চিরস্থায়ী দুঃখগাঁথায়। ভুলে যাওয়ার মতো এক স্মৃতি। কিন্তু ভুলে যাওয়ার জো নেই। না সমর্থকদের, ক্রিকেটারদের, না ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট কারও। বুধবারের ম্যাচ শেষে সাকিবের কথায়ই সেটির আরেকটুকু প্রমাণ।

বেঙ্গালুরুর ওই ম্যাচের আগে ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালেও ভারতের বিপক্ষে দুঃসহ স্মৃতি আছে বাংলাদেশের। যদিও স্কোরকার্ড বলবে, পরাজয়ের ব্যবধান ১০৯ রানে। কোনো লড়াইয়ের ছাপ সেখানে নেই। তবে ম্যাচের বিভিন্ন মোড়ের ছোট ছোট নানা ঘটনা, বিতর্ক আর ম্যাচের পর বিস্ফোরক পরিস্থিতি মিলিয়ে সেই ম্যাচও আলাদা জায়গা নিয়ে আছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে। এখনও নানা আলোচনায় ঘুরে-ফিরে আসে তা।

২০১৯ বিশ্বকাপেও কার্ডিফে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি বাংলাদেশকে উপহার দেয় স্বপ্ন ভাঙার যন্ত্রণা। যথারীতি সেই ম্যাচের আগেও উত্তেজনা ছিল তু্ঙ্গে। শেষ পর্যন্ত মাঠের ক্রিকেটে পেরে ওঠেনি বাংলাদেশ। ভারতের ৩১৪ রানের জবাবে থামতে হয় ২৮৬ রানে।

যদিও স্রেফ ৯ রানে রোহিত শর্মার সহজ ক্যাচটি যদি নিতে পারতেন তামিম ইকবাল, তাহলে কী হতো কে জানে! সেই রোহিতের ৯২ বলে ১০৪ রানের ইনিংস ভারতকে গড়ে দেয় বড় রানের ভিত।

মেলবোর্ন, বেঙ্গালুরু আর কার্ডিফ হয়ে সেই ছোট ছোট ভুল, আক্ষেপ আর বড় হতাশা আবার ফিরে এলো অ্যাডিলেইডে। এবারও দারুণভাবে বাগে পাওয়া গিয়েছিল ভারতকে। মাঝবিরতিতে যদিও ১৮৫ রানের লক্ষ্যকে যদিও মনে হচ্ছিল অনেক বেশি। কিন্তু এবারের আসরে প্রথমবার ওপেন করতে নেমে লিটন কুমার দাস সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন, নিজের জাত ক্রিকেট বিশ্বকে আরেকবার দেখানোর। তাতেই বাংলাদেশের মিইয়ে থাকা আশাগুলো প্রাণ পায় নতুন করে।

স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের স্মৃতি বিজড়িত মাঠে টি-টোয়েন্টির ঝকমারি মঞ্চেও বিশুদ্ধ সব শটে লিটনের ছুটে চলা, ভারতীয় বোলারদের অসহায় বানিয়ে ফেলা, ভারতীয় অধিনায়কের মাঠ সাজানোকে বুড়ো আঙুল দেখানো, সবকিছু মিলিয় যে দাপট, তাতে বাংলাদেশের স্বপ্নের পালে লাগে নতুন হাওয়া। কিন্তু এরপর প্রকৃতির চোখ রাঙানি আর আবারও পুরনো ভুতের তাড়া!

বৃষ্টির পর সমীকরণ যদিও সহজ হয়ে ওঠে আরও, কিন্তু বাংলাদেশ বেছে নেয় আবারও সেই চেনা আঁধারে ডুবে যাওয়াকে। অ্যাডিলেইড ওভালের রোশনাইয়ের মধ্যেও সাকিবদের আশার আছে নিভতে থাকে একটু একটু করে। শেষ দিকে নুরুল হাসান সোহান ও তাসকিন আহমেদের সৌজন্যে আবার একটু জ্বলে ওঠে তা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিভে যায় দপ করে। বেদনা আরও বাড়িয়ে।

কে না জানে, কাছে গিয়ে না পাওয়ার যন্ত্রণা অনেক বেশি!

ম্যাচ শেষে সাকিবের কণ্ঠে সেই হতাশার ছোঁয়া।

“আফসোস আমি বলতে চাই না… তবে ভারতের সঙ্গে আমরা যখনই খেলছি, বিশেষ করে বিশ্বকাপের ম্যাচগুলিতে, খুব ক্লোজ হচ্ছে ইন্টারেস্টিংলি। বেশ একটা ভালো ম্যাচ হয়, দুই দলই চেষ্টা করে জিততে। আমরা খুব কাছাকাছি যাচ্ছি, কিন্তু…।”

অ্যাডিলেইড ওভালে এ দিন ৩০ হাজারের মধ্যে দর্শক ছিলেন। হয়তো ২৭-২৮ হাজারই ভারতীয়। বৃষ্টি বিরতির সময় তাদের বড় অংশ মাঠ ছেড়ে চলে যান। হয়তো দলের আশা নেই ভেবেই। যারা মাঠে রয়ে যান, তারা স্বাক্ষী হন দলের দারুণ জয়ের।

ম্যাচ শেষে স্টেডিয়ামের লাউড স্পিকারে যখন এ আর রহমানের সঙ্গে ‘মা তুঝে সালাম… বন্দে মাতরম’ গানে চারপাশ প্রকম্পিত করছেন ওই ভারতীয় সমর্থকেরা, হৃদয় উজাড় করে সমর্থন দিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের সমর্থকদের মনে সেই সুর শেল হয়েই বিঁধে যাওয়ার কথা।

বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ মানেই যেন এখন এই নরক যন্ত্রণা। ২০০৭ বিশ্বকাপের ভারতকে হারানোর সেই ম্যাচ এখন যেন কয়েকশ বছর আগের স্মৃতি!

অ্যাডিলেইড ওভাল মানেই এতদিন বাংলাদেশের জন্য ছিল উষ্ণতার প্রতিশব্দ। ২০১৫ বিশ্বকাপে এই মাঠেই ইংল্যান্ডকে বিদায় করে মাশরাফি বিন মুর্হজার দল পা রেখেছি কোয়ার্টার ফাইনালে। এবার সেখানে যোগ হলো বিরহের শীতলতাও।

পেশাদার ক্রিকেটারদের তবু সামনে তাকাতে হয়। নতুন আশায় পথ চলতে হয়। কিংবা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আশার রসদ রেখে যেতে হয়। সাকিবও সেই পথের পথিক।

“আশা করি আমরা এই ফলাফলের দিকটা বদলাতে পারব ভবিষ্যতে। আমার কাছে মনে হয়, এই দল যদি একসঙ্গে খেলতে পারে এবং আরও যারা আছে, তাদের ওই বিশ্বাস হয়তো আস্তে আস্তে তৈরি হবে যে, আমরা এত কাছাকাছি যেতে পারলে আরেকটু কেন পারব না।”