দ্বিতীয় সারির শ্রীলঙ্কার কাছে বিধ্বস্ত হয়ে ব্রোঞ্জও জুটল না লিটনদের
এশিয়ান গেমস ক্রিকেটের ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে প্রথম চার ওভারে শ্রীলঙ্কার চার উইকেট নেওয়ার পরও বাজেভাবে হেরে গেল বাংলাদেশ।
প্রথম চার ওভারেই নেই শ্রীলঙ্কার চার উইকেট। ১৩ ওভার শেষেও রান রেট পাঁচের নিচে। সবকিছুই তখন বাংলাদেশের মুঠোয়। কিন্তু মুস্তাফিজুর রহমানের এক ওভারেই বদলে গেল চিত্র। নো-ওয়াইডের সমাহারে তার ১১ বলের ওভার থেকে রান এলো ২৫! সেই ঝড় চলল শেষ ওভার পর্যন্ত। ধুঁকতে থাকা লঙ্কানরা পৌঁছে গেল ভালো স্কোরে। রান তাড়ায় মুখ থুবড়ে পড়ল বাংলাদেশের ব্যাটিং, মিলিয়ে গেল পদকের আশা।
সোনার পদকের আশায় সেরা দল নিয়ে এশিয়ান গেমসে গিয়ে ব্রোঞ্জও পেল না বাংলাদেশ। দ্বিতীয় সারির দল নিয়ে খেলেও শ্রীলঙ্কা জিতে গেল ৬৩ রানে।
জাপানের আইচির নিশিনে এশিয়ান গেমস ক্রিকেটের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটিতে শ্রীলঙ্কা ২০ ওভারে তোলে ১৬৫ রান।
চার ওভার শেষে তাদের রান ছিল চার উইকেটে ২১। ১৩ ওভার শেষে ৫ উইকেটে ৬৩। সেই দল শেষ সাত ওভারে তুলে ফেলে ১০২ রান। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে যার ব্যাটিং গড় ছিল ১৬.৮৫, সেই থারিন্ডু রাত্নায়াকে সাত নম্বরে নেমে খেলেন ৩২ বলে ৬৫ রানের ইনিংস।
রান তাড়ায় বাংলাদেশের প্রথম তিন ব্যাটসম্যানই ফেরেন শূন্য রানে। পরের ব্যাটসম্যানরাও পারেননি দলকে উদ্ধার করতে। গুটিয়ে যায় তারা ১০২ রানে।
ব্যাটিংয়ে পর বোলিংয়েও দুটি উইকেট নেন দুই হাতে বল করতে পারা স্পিনার রাত্নায়াকে।
করোগি স্পোর্টস পার্কের স্পিন সহায়ক উইকেটে বাংলাদেশ একাদশ সাজায় চার বিশেষজ্ঞ স্পিনার হয়ে। অনেক আলোচনার পর অবশেষে অভিষেক হয় আলিস আল ইসলামের। এই রহস্য স্পিনার ও শেখ মেহেদি হাসান মিলে নতুন বলে দারুণ বোলিংয়ে দলকে এনে দেন ভালো শুরু।
টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা শ্রীলঙ্কা প্রথম দুই ওভারে সাত রান তোলার পর তৃতীয় ওভারে হারায় দুই উইকেট। সিনেথ জায়াওয়ার্দেনে ও লাসিথ ক্রুসপুলেকে ফেরান শেখ মেহেদি।
পরের ওভারে নুয়ানিদু ফার্নান্দোকে ফিরিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক উইকেটের স্বাদ পান আলিস। তবে তাকে সৌভাগ্যবানই বলতে হবে। তার লেগ ব্রেক ডেলিভারিতে ব্যাটসম্যান পরাস্ত হলেও ব্যাট ছিল না বলের ধারেকাছেও। তবু বিস্ময়করভাবে কটবিহাইন্ডের আবেদনে আঙুল তুলে দেন আম্পায়ার।
ওই ওভারেই রান আউট হন সোহান ডি লিভেরা।
চরম বিপদে দলকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন সাহান আরাচ্চিগে ও আশেন বান্দারা। সতর্ক ব্যাটিংয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন দুজন। যদিও তাতে লাভ হয়নি বেশি। বান্দারাকে (২৪ বলে ১৮) ফিরিয়ে জুটি ভাঙেন রিশাদ হোসেন।
পঞ্চম উইকেটে ৩৩ রানের এই জুটি আসে ৪২ বলে।
রাত্নায়াকে ক্রিজে যাওয়ার পরপরই রিভার্স সুইপে ছক্কা মারেন সাইফকে। তার পরও নিয়ন্ত্রণ ছিল বাংলাদেশেরই। ত্রয়োদশ ওভারে আলিসের স্পিনে স্রেফ এক রান নিতে পারেন আরাচ্চিগে ও রাত্নায়েকে মিলে।
এরপরই মুস্তাফিজের সেই দুঃস্বপ্নের ওভার। প্রথম বলে চার মারেন রাত্নায়াকে। পরের বলে চার মারেন তিনি 'নো' বলে। এরপর ওয়াইড বলে 'বাই' বাউন্ডারিসহ পাঁচ রান! যেটির মানে, একটি বৈধ ডেলিভারি থেকেই ১৪ রান!
ওই ওভারে পরে 'নো' বল হয় একটি, ওয়াইড আরও দুটি। একটি ছক্কাও মারেন রাত্নায়াকে।
সেই শুরু। রিশাদের করা পরের ওভার থেকে আসে ১৬ রান। প্রথম তিন ওভারে স্রেফ সাত রান দেওয়া আলিস শেষ ওভারে দেন ১১। মুস্তাফিজের দ্বিতীয় ওভার থেকেও ওঠে ১১ রান।
এরপর ঝড় বয়ে যায় রিশাদের ওপর দিয়েও। দুটি করে চার ও ছক্কায় তার ওভারে আসে ২১ রান।
১৪ থেকে ১৮, এই পাঁচ ওভারে আসে ৮৩ রান!
শেষের আগের ওভারে আবার বোলিংয়ে এসে রাত্নায়েকের তাণ্ডব থামান মুস্তাফিজ। সাতটি চার ও পাঁচ ছক্কায় ক্যারিয়ার সেরা ৬৫ করে আউট হন রাত্নায়েকে।
৪৬ বলে ৯৩ রানের জুটিতে আরাচ্চিগের অবদান ছিল স্রেফ ১৪ বলে ১৫ রান।
৩৭ বলে ৩৩ করে অধিনায়ক আরাচ্চিগে আউট হন শেষ ওভারে। শ্রীলঙ্কা ততক্ষণে দারুণ সংগ্রহ পেয়ে গেছে।
এই উইকেটে ১৬৬ রান তাড়া করা কাজটি এমনিতেই ছিল কঠিন। প্রয়োজন ছিল উড়ন্ত শুরু। কিন্তু হয় উল্টো। যেটিকে বলা যায় স্রেফ বিভীষিকা।
প্রথম ওভারে পাঁচ বলে রান না পেয়ে শেষ বলে আউট হন সাইফ হাসান। পরের ওভারে আউট হন আরেক ওপেনার তানজিদ হাসানও। ব্যাটিংয়ে ভোগানোর পর বোলিংয়েও প্রথম ওভারে উইকেট নেন রাত্নায়াকে।
সেই বিপদ থেকে দলকে টেনে তুলবেন কী, লিটন দাস ফেরেন বিপদ বাড়িয়ে। নুয়ান থুসারার ইয়র্কারের কোনো জবাব পাননি বাংলাদেশ অধিনায়ক।
প্রথম তিন ব্যাটসম্যানই আউট শূন্য রানে!
দুটি বাউন্ডারি মেরে তাওহিদ হৃদয়ের শুরুটা ছিল ইতিবাচক। কিন্তু আগের ম্যাচে দারুণ ইনিংস খেলা ব্যাটসম্যানকে এবার অল্পতেই (৬ বলে ১১) থামান স্বপ্নের দিন কাটানো রাত্নায়েকে।
চার ওভারে চার উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের আশা মোটামুটি শেষ। পারভেজ হোসেন ইমন কিছুক্ষণ উইকেটে কাটিয়ে বড় করতে পারেননি ইনিংস (২৬ বলে ২০)। মোসাদ্দেক হোসেনের বদলে একাদশে ফিরে ইয়াসির আলি চৌধুরি চেষ্টা করছিলেন পাল্টা আক্রমণের। তার ইনিংস থামে ১৬ বলে ২১ রান করে।
৭২ রানে ৮ উইকেট হারানো দলের জন্য একশ রানও ছিল দূরের পথ। ৯ নম্বরে নেমে ২৬ রান করে দলকে কোনোরকমে একশ পার করার নাসুম আহমেদ। তবে সেটির জন্য তো কোনো পুরস্কার নেই!
ব্রোঞ্জ জিতে 'ভিক্টরি ল্যাপ' দেয় লঙ্কানরা। ক্রিকেট থেকে দুটি পদক পেল তারা। মেয়েদের ক্রিকেটে জিতেছে তারা রূপা। বাংলাদেশ ব্রোঞ্জ হারাল ছেলে-মেয়ে দুই বিভাগেই।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
শ্রীলঙ্কা: ২০ ওভারে ১৬৫/৯ (সিনেথ ৩, ক্রুসপুলে ২, সোহান ৬, নুয়ানিদু ১, আরাচ্চিগে ৩৩, বান্দারা ১৮, রাত্নায়েকে ৬৫, হেমান্থা ২, সাহান ৫*, ভিয়াসকান্থ ৬, থুসারা ২; শেখ মেহেদি ৪-০-১৯-২, আলিস ৪-০-১৮-১, নাসুম ২-০-৮-০, রিশাদ ৪-০-৪৬-১, সাইফ ৩-০-২৮-২, মুস্তাফিজ ৩-০-৪৩-২)।
বাংলাদেশ: ১৭.৩ ওভারে ১০২ (সাইফ ০, তানজিদ ০, লিটন ০, পারভেজ ২০, হৃদয় ১১, ইয়াসির ২১, শেখ মেহেদি ০, রিশাদ ১০, নাসুম ২৬, আলিস ৪, মুস্তাফিজ ৩*; থুসারা ৪-১-১৮-২, রাত্নায়েকে ৩-০-১৮-২, ভিয়াসকান্থ ৩-০-২৬-২, আরাচ্চিগে ১.৩-০-৯-১, সাহান ৪-০-১৭-২, হেমান্থা ২-০-১১-১)।
