ক্রিকেট ইতিহাসের আনন্দ ঘর!

নিউ জিল্যান্ডের সব মাঠের মতো বেসিন রিজার্ভও সবুজ মখমল। সীমানা ঘিরে কাঠের সাদা বেষ্টনি। পাশেই গ্যালারিতে ওঠার পথ। সেখানে পা দিতেই চোখে পড়ল লোহার একটা চাকতি। ম্যানহোলের ঢাকনার মতো। ভালো করে খেয়াল করতেই চমকে উঠতে হলো। ওই চাকতি আসলে একটি স্মারক!

আরিফুল ইসলাম রনিওয়েলিংটন থেকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 12 Jan 2017, 01:20 PM
Updated : 12 Jan 2017, 02:07 PM
ইতিহাসের প্রথম ক্রিকেটারহিসেবে অভিষেক থেকে টানা ১০০ টেস্ট খেলার কীর্তি ব্রেন্ডন ম্যাককালাম গড়েছিলেন এই মাঠেই।ওই চাকতিতে লেখা আছে রেকর্ডের বিস্তারিত। চাকতির ঠিক পাশ দিয়েই লাল ইটের সিঁড়ি ওপরেউঠে গেছে গ্যালারির বুক চিড়ে। সিঁড়িটি নিয়ে যাবে একটি ঘরের দুয়ারে। ঘরের বাইরের দেয়ালেঝুলছে বড় একটা ঘড়ি, নীচে বড় অক্ষরে লেখা, ‘নিউ জিল্যান্ড ক্রিকেট জাদুঘর’।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই স্বাগতজানাল বইয়ের সারি। গাদা গাদা বই। বলার অপেক্ষা রাখে না, সবই ক্রিকেটের। ইতিহাস, পরিসংখ্যান,আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা…। তবে বইয়ের স্তুপে বেশিক্ষণ ডুবে থাকার জো নেই। পাশ থেকেই হাতছানিদিচ্ছে আরও অনেক আকর্ষণ। কাঁচঘেরা একেকটি শোকেস থেকে উঁকি দিচ্ছে ক্রিকেটের ইতিহাস!
বাঁধাই করে রাখা আছে অ্যাডিংটনব্যাট। সেই ১৭৪৩ সালের, গোটা বিশ্বেই সংরক্ষণে থাকা ক্রিকেটের সবচেয়ে পুরোনো ব্যাটগুলোরএকটি। আরও কত কত পুরোনো ব্যাট-বল-গ্লাভস-স্টাম্পস-জার্সি! যুগে যুগে ক্রিকেট সরঞ্জামেরবিবর্তন ফুটে উঠবে চোখের সামনে।
১৯৩০ সালে প্রথম টেস্ট খেলেছিলনিউ জিল্যান্ড। ক্রাইস্টচার্চে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুই কিউই ওপেনার স্টিউয়ি ডেম্পস্টারও হেনরি ফলির ব্যাটিংয়ে নামার বড় ছবি যেন আহবান জানাচ্ছে স্মৃতির ডানায় ইতিহাসে ঘুরেআসার। সেই টেস্টের একাদশের ছবি ও স্মারক চকিতে ফিরিয়ে নিয়ে যায় যেন ৮৫ বছর আগে। এইবেসিন রিজার্ভে হয়েছিল দ্বিতীয় টেস্ট। সেটিরও নানা স্মারক জানান দিচ্ছে নিজেদের গর্বেরউপস্থিতি।
একটু এগিয়ে যেতেই চোখে পড়বেক্রিকেটের অমর বুড়োকে। ব্যাট বগলদাবা করে চেনা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন ডব্লিউ জি গ্রেস।ক্রিকেটের জনকের প্রতিকৃতির পাশেই সাজিয়ে রাখা নিউ জিল্যান্ডের ইতিহাসের সবচেয়ে বড়নায়ক রিচার্ড হ্যাডলির ক্যারিয়ার।
উল্টো দিকের শো কেসেই হ্যাডলিরবোলিং বুট। পায়ের বিশাল সাইজের জন্য স্কুলের বন্ধুরা ডাকত ‘প্যাডল’ বলে। প্রায় দেড়যুগের গৌরবময় ক্যারিয়ারের অনেক উইকেট ধরা দিয়েছে এই বুট পায়ে বোলিং করে। পুরোনো, রঙচটাকিন্তু অর্জনে উজ্জ্বল!
পাশেই আরেক জোড়া বুট। যে বুটপায়ে ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট খেলেছিলেন ক্রিস মার্টিন। জাদুঘরের পরিচালক জেমি বল জানালেন,হ্যাডলি ও মার্টিন নিউ জিল্যান্ডের ইতিহাসের সফলতম দুই পেসার বলেই তাদের বুট পাশাপাশি।ন্যাড়া মাথার মার্টিনের ‘ট্রেডমার্ক’ হেড ব্যান্ড তো না থেকে পারেই না! সংরক্ষিত আছেতার অটোগ্রাফসহ।
নিউ জিল্যান্ডের সর্বকালেরসেরা ব্যাটসম্যানদের একজন বার্ট সাটক্লিফের গ্লাভস আছে। ছেড়া, ফাটা গ্লাভস জানান দেবেপঞ্চাশ-ষাটের দশকে ফাস্ট বোলিং সামলাতে কত ধকল পোহাতে হয়েছে তাদের! ১৮৬৫ সালে এক ম্যাচেডব্লিউ জি গ্রেসের ১৩ উইকেট নেওয়া বল আছে কালের সাক্ষী হয়ে।
অ্যাডিংটন ব্যাটের পাশাপাশিসবচেয়ে চমকপ্রদ সংগ্রহগুলোর আরেকটি ১৯৩২-৩৩ মৌসুমে বিখ্যাত (কিংবা কুখ্যাত) বডিলাইনসিরিজের ক্ল্যারি গ্রিমেটের ব্লেজার! তিনি অস্ট্রেলিয়ার, ক্রিকেটসহ সবক্ষেত্রেই যাদেরপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন নিউ জিল্যান্ডাররা। তবে ব্লেজারের পাশেই লেখা ‘আওয়ার বয় ক্ল্যারি’।বুঝে উঠতে না পারলে জেনে নিন, কিংবদন্তি অস্ট্রেলিয়ান লেগ স্পিনারের জন্ম নিউ জিল্যান্ডেরইডানেডিনে।
এমন একটি জাদুঘর করার ভাবনাটাএসেছিল সাবেক আম্পায়ার স্ট্যান কাউম্যানের মাথায়। ১৯৮৬ সালে অস্ট্রেলিয়া-নিউ জিল্যান্ডটেস্টে ছোট্ট প্রদর্শনী দিয়ে যাত্রা শুরু। আনুষ্ঠানিকভাবে জাদুঘরের যাত্রা শুরু ১৯৮৭সালে। সময়ের সঙ্গে বেড়েছে আকার, সমৃদ্ধ হয়েছে দারুণ সব সংগ্রহে। প্রতিটি শো কেসে ছোটমনিটরে চলছে স্মরণীয় সব ম্যাচ, ঘটনা ও ডকুমেন্টারির কিপ্লিংস।

বাংলাদেশেরও কিছু স্মারক সংগ্রহেরচেষ্টা চলছে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলতে ১৯৯৭ সালে নিউ জিল্যান্ডে এসেছিলবাংলাদেশ দল। সেই সফরেই বাংলাদেশের হয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম সেঞ্চুরি করেছিলেন আলশাহরিয়ার রোকন। জাদুঘরের পরিচালক জানালেন, চেষ্টা চলছে সেই সময়ের কিছু স্মারকসংগ্রহের।

জাদুঘরে এখন আছে হাজার হাজারস্মারক। নিউ জিল্যান্ড ক্রিকেট ইতিহাসের সব নায়কেরই জায়গা হয়েছে এখানে। জাদুঘর ঘুরেদেখলে ঘোরা হয়ে যায় ক্রিকেট ইতিহাসের নানা অলিগলি।

এমনিতে বেসিন রিজার্ভের প্রতিটিকোণায়ই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ইতিহাস। শুধু ম্যাককালামের কীর্তি গাঁথা ওই স্মারকই নয়, এরকমঅনেক চাকতিতে লেখা আছে মাঠের নানা কীর্তির গল্প। স্কোরকার্ডের নামকরণ করা হয়েছে সাবেকক্রিকেটার, ক্রিকেট ঐতিহাসিক ও প্রশাসক ডন নিলির নামে। মাঠের মূল স্থাপনার নাম ওয়েলিংটনেরইসাবেক ক্রিকেটার রবার্ট ভ্যান্সের নামে।

তবে সবচেয়ে বেশি আবেদন এইজাদুঘরের। দেখা শেষ হলেও থেকে যায় রেশ। মনে লেগে থাকে ভালো লাগার অনুভূতি। জাগে একটাহাহাকারও। বাংলাদেশে এমন কিছু হবে কবে!

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক