Published : 14 Aug 2026, 04:52 PM
দিনের শেষ ডেলিভারিতে একটি সুযোগ দিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। কিন্তু গালিতে ক্যাচটি পড়ে গেল ক্যামেরন গ্রিনের হাত থেকে। ধারাভাষ্যে ব্রেন্ডন জুলিয়ান বললেন, “আবারও হতাশা অস্ট্রেলিয়ার…।” ক্যাচটি নিতে পারলে দিনের শেষটি অন্তত ভালো হতে পারত তাদের। কিন্তু হলো উল্টো। তানজিদ হাসানের সেঞ্চুরি ও নাজমুল হাসান শান্তর দারুণ ইনিংসের পর, চোয়ালবদ্ধ লড়াইয়ে মাথা উঁচু করে মাঠ ছাড়লেন মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদ।
প্রথম দিনের মতো পুরোপুরি স্বপ্নময় দিন নয়, তার পরও দিনটি বাংলাদেশের। লিড ১৫৩ রানের, উইকেট বাকি ৪টি।
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম টেস্ট খেলতে গিয়ে প্রথম দুই দিনের ছয়টি সেশনেই জয়ী দলের নাম বাংলাদেশ। এমন দুটি দিনের পর জয়ের স্বপ্ন তো উঁকি দিতেই পারে মনের কোণে!
ডারউইন টেস্টে প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে দ্বিতীয় দিন শেষে বাংলাদেশের রান ৬ উইকেটে ৩৫১।
বাংলাদেশের এই লিডের ভিত রচনা করেন তানজিদ। দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নামা ওপেনার নাম লেখান ইতিহাসে। অস্ট্রেলিয়াতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান তিনি।
দ্বিতীয় সেঞ্চুরিয়ান হতে পারতেন শান্ত। কিন্তু দ্বিতীয় নতুন বলে তার ইনিংস থামে ৮৪ রানে।
ড্রেসিং রুমে ফেরার পথে তানজিদ-শান্ত দুজনকেই দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানিয়েছে গোটা মাঠ। এই সম্মানও বাংলাদেশের দারুণ প্রাপ্তি।
দ্বিতীয় নতুন বলে ১১ রানের মধ্যে ৩ উইকেট নিয়ে ম্যাচে ফেরার আভাস দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু সপ্তম উইকেটে মিরাজ ও হাসানের দারুণ ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের লিড পেরিয়ে যায় দেড়শ।
অস্ট্রেলিয়ার কোনো বোলার তিন উইকেট নিতে না পারলেও তিনটি ক্যাচ নিয়েছেন স্টিভেন স্মিথ। টেস্টে ফিল্ডার হিসেবে সবচেয়ে বেশি ক্যাচের বিশ্বরেকর্ডে স্পর্শ করেছেন জো রুটকে (২১৮)।
মারারা স্টেডিয়ামে আগের দিনের দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যান তানজিদ ও মুমিনুল হক নতুন দিনের শুরুটাও করেন ভালো। প্রথম ঘণ্টা নির্বিঘ্নে কাটিয়ে দেন দুজন।
পানি পানের বিরতির পর ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে বাউ ওয়েবস্টারকে গ্যালারিতে আছড়ে ফেলেন তানজিদ। পরের ওভারেই ভাঙে ১০২ রানের জুটি। হেইজেলউডের বেশ বাইরের বলে ড্রাইভ করার লোভ সামলাতে পারেননি মুমিনুল হক। অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান ১ রানের জন্য পাননি অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম ফিফটি।
বাংলাদেশ বড় ধাক্কা খেতে পারত একটু পর। ন্যাথান লায়নের বলে স্লিপে তানজিদের কঠিন ক্যাচ নিতে পারেননি স্মিথ।
৬২ রানে জীবন পাওয়ার পর আর খুব একটা ভুল করেননি তানজিদ। শান্ত শুরুতে একটু সময় নেন, গুছিয়ে নিয়ে ক্যামেরন গ্রিনকে টানা দুটি চার মারার পর ছুটতে থাকেন দারুণ গতিতে।
লাঞ্চের একটু পর লিড পেয়ে যায় বাংলাদেশ। দুজনের ব্যাটের দাপট চলতে থাকে। তানজিদের রান যখন ৯৯, শান্তর তখন ৪৯।
আগে মাইলফলকে পা রাখেন অধিনায়ক। ৭৪ বলে আসে তার ফিফটি। তিন বল পরই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। লায়নের বল মিড অফে ঠেলে শতরানের উচ্ছ্বাসে লাফিয়ে ওঠেন তানজিদ।
সেঞ্চুরি ছুঁয়ে নির্ভার হয়েই হয়তো মনোযোগ হারিয়ে ফেললেন তানজিদ। লায়নকে উড়িয়ে মারার চেষ্টা করলেন শটে তেমন কোনো জোর না দিয়েই। লং অফে অনেকটা ছুটে এসে ক্যাচ নিলেন স্টার্ক।
বাংলাদেশ তাতে নড়ে যায়নি। ৯৩ রানের জুটি থামার পর আরেকটি ভালো জুটি গড়ে তোলেন শান্ত ও মুশফিক। টেস্ট অভিষেকের ২৫ বছর পর, অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম খেলতে নেমে মুশফিক শুরু করেন দারুণ সাবলীল ব্যাটিংয়ে। জুটি জমে ওঠে দ্রুতই। সেঞ্চুরির হাতছানিতে এগিয়ে যান শান্ত।
চা বিরতির দুই ওভার পর নতুন বল পায় অস্ট্রেলিয়া। ম্যাচের দুই দিনে অস্ট্রেলিয়ার সেরা সময়টুকু আসে এরপরই।
রাউন্ড দা উইকেটে করা হেইজেলউডের ডেলিভারি শান্তর ব্যাটে ছোবল দিয়ে আশ্রয় নেয় স্লিপে স্মিথের হাতে। জুটি থামে ৬৬ রানে।
স্মিথ আরও দুটি ক্যাচ পেয়ে যান দ্রুতই। স্টার্কের অনেক বাইরের বল তাড়া করে আউট হন লিটন দাস। ১২ বল খেলে রান করতে পারেননি চোট কাটিয়ে দুই মাস পর খেলতে নামা ব্যাটসম্যান।
তার মতোই বলটি ছেড়ে দিতে পারতেন মুশফিক। কিন্তু কামিন্সের বলে ব্যাট পেতে দিয়ে আউট হন তিনি ৩৬ রানে।
প্রথম দুই সেশনে স্রেফ দুটি উইকেট হারানো দল চার ওভারের মধ্যে হারিয়ে ফেলে তিন উইকেট।
বাংলাদেশের লোয়ার অর্ডারের ব্যাটিংয়ের যা চিত্র, তাতে ইনিংস দ্রুত শেষের শঙ্কাও জেগে উঠেছিল। কিন্তু তাসকিন আহমেদ ও তাইজুল ইসলামের আগে ব্যাটিংয়ের সুযোগ পাওয়া হাসান চমকে দেন ব্যাট হাতে। আগের দিন ছয় উইকেট শিকারি পেসার এবার হয়ে ওঠেন পুরোদস্তুর ব্যাটার।
প্রস্তুতি ম্যাচে শতরানের আত্মবিশ্বাসে দারুণ ব্যাট করেন মিরাজও। তাকে সঙ্গ দিয়ে ডেলিভারির পর ডেলিভারি ছেড়ে যান হাসান, মাথা নিচু করে ডিফেন্স করেছেন একের পর এক। অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত বোলিং আক্রমণ চিড় ধরাতে পারেনি তার রক্ষণে।
দিনশেষে দুজনের জুটি অবিচ্ছিন্ন ১৪৭ বলে ৪৩ রানের। ৭৬ বল খেলে ফেলেছেন হাসান, অনায়াসেই যা তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ।
তৃতীয় দিনে লিড আরও বাড়ানো অনেকটাই নির্ভর করবে অবশ্য মিরাজের ওপর।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস: ১৯৮
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ১১০ ওভারে ৩৫১/৬ (আগের দিন ৯৬/১) (তানজিদ ১০১, মুমিনুল ৪৯, শান্ত ৮৪, মুশফিক ৩৬, লিটন ০, মিরাজ ৩২*, হাসান ১৩*; স্টার্ক ২১-২-৬৮-২, হেইজলেউড ২০-৩-৬৮-২, গ্রিন ৮-২-২৬-০, কামিন্স ২০-৩-৫০-১, লায়ান ২৫-১-৯২-১, ওয়েবস্টার ১০-১-২৮-০, হেড ২-০-৩-০, লাবুশেন ৪-১-৪-০)