সাম্যর উরুতে একটি আঘাত, ‘রক্তনালী কেটে রক্তক্ষরণে যায় প্রাণ'
তার ওপর হামলাকারীরা ছিল ১০-১২ জনের একটি দল, প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে বলছে পুলিশ।
রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে খুন হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা এস এম শাহরিয়ার আলম সাম্য’র ডান উরুর পেছন দিকে দেড় ইঞ্চি লম্বা ও আধ ইঞ্চি গভীর একটি মাত্র জখম পেয়েছে পুলিশ।
চিকিৎসকরা বলছেন, একটি আঘাতেই শরীরের গুরুত্বপূর্ণ একটি রক্তনালী কেটে যায় তার। এ কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে তাদের ধারণা।
উদ্যানের মধ্যে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে সাম্য’র খুন হওয়ার ঘটনার প্রাথমিক খোঁজখবরের ভিত্তিতে পুলিশ বলছে, তার ওপর হামলাকারীরা ছিল ১০-১২ জনের একটি দল, তারা সেখানে ’মাদক সেবনে’ গিয়েছিল। এদের মধ্যে শেরেবাংলা নগর থানা এলাকার একটি হাসপাতাল থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সাম্য’র মৃত্যুর পর নিয়ম অনুযায়ী লাশের বাহ্যিক অবস্থা দেখে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার জন্য একটি সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন শাহবাগ থানার এসআই আবুল কালাম।
তিনি বলেন, নিহতের পিঠের মাঝে হালকা লালচে ভাব আছে। তার ডান পায়ের উরুর পেছনের অংশে ধারালো অস্ত্রের গভীর রক্তাক্ত কাটা জখম। এটি লম্বায় অনুমান দেড় ইঞ্চি ও গভীরতা আধ ইঞ্চি।
সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়, ধারালো অস্ত্র দিয়ে ডান পায়ের উরুর পেছনের অংশে আঘাত করলে ‘ভিকটিম’ (সাম্য) ঘটনাস্থলেই মারাত্মক জখমে রক্তাক্ত হয়। বন্ধুরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনাস্থল থেকে ঢাকা মেডিকেলের দূরত্ব পাঁচ থেকে ১০ মিনিটের বেশি নয়। এত অল্প সময়ে রক্তক্ষরণেই প্রাণ হারান এ তরুণ ছাত্রনেতা। এ নিয়ে কথা হয় কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের একজন চিকিৎসক বলেন, “উরুর পেছনে একটা অন্যতম রক্তনালী থাকে, যাকে বলা হয় ফেমোরাল আর্টারি। এটাকে বলতে পারেন দেহের প্রধান রক্তনালীর একটি শাখা রক্তনালী, কিন্তু এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
স্বল্প দূরত্বের এতটুকু সময়ের মধ্যে একটি জখম নিয়ে একজন তরতাজা তরুণ এভাবে রক্তক্ষরণে প্রাণ হারাতে পারেন কী না জানতে চাইলে ওই চিকিৎসক বলেন, “এরকম একজন তরুণের তো এই আঘাতে সারভাইভ করার কথা। যদি শারীরিকভাবে দুর্বল বা বয়স্ক ব্যক্তি হত তাহলে আলাদা কথা ছিল।”
সাম্য মারা যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি ঘটনাটি যতটুকু শুনেছি, তাকে ঢাকা মেডিকেলে মৃত অবস্থায় আনা হয়। ডাক্তাররা তার চিকিৎসার কোনো সুযোগ পাননি, কেবল একটি ইসিজি করে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। এমনও হতে পারে পথে বিলম্ব হয়েছে বা ঘটনাস্থলে তিনি পড়ে ছিলেন।”
পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্য ছুরিকাঘাতের শিকার হন রাত সাড়ে ১১টার দিকে। তাকে ঢাকা মেডিকেলে মৃত ঘোষণার সময় হচ্ছে রাত সোয়া ১২টা। অর্থাৎ মৃত ঘোষণার কিছুক্ষণ আগে তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসা হয়েছিল।
ঢাকা মেডিকেল মর্গের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, ময়নাতদন্তেও তারা ওই একটি আঘাত ছাড়া আর কোনো আঘাত পাননি। সেখান থেকে রক্তক্ষরণেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসকের মত।
সাম্যকে ছুরিকাঘাতের ঘটনার বিবরণ দিয়ে তার বন্ধু রাফি ও আরেক বন্ধু আবাবিল আহমেদ বিশাল বলেন, রাতে মোটরসাইকেল চালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মুক্ত মঞ্চের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন সাম্য। এসময় অন্য একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে তার মোটরসাইকেলের ধাক্কা লাগলে উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটি এবং ধস্তাধস্তি হয়। এক পর্যায়ে সাম্যকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ডান পায়ের উরুতে আঘাত করে পালিয়ে যায় ওই মোটরসাইকেলের আরোহী। পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে এলে তার মৃত্যু হয়।
হামলায় ছিল ’১০-১২ জন, মাদক সেবনে গিয়েছিলেন তারা’
প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের দাবি, ছাত্রদল নেতা সাম্য’র ওপর হামলায় ১০-১২ জনের একটি দল ছিল, যারা সেখানে মাদক সেবন করতে গিয়েছিল। সেখানে দুই মোটরসাইকেলের মধ্যে সংঘর্ষের পর তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। হামলাকারীদের মধ্যেও দুজন আহত হন।
রাতে ঘটনার বিবরণ দিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও দুই মোটরসাইকেলে মধ্যে ধাক্কার ঘটনার কথা বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়, মঙ্গলবার রাতে সাম্য তার বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বন্ধুকে নিয়ে মোটরসাইকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরছিলেন। রমনা কালী মন্দিরের উত্তর পাশে বটগাছের কাছে পুরাতন ফোয়ারার পাশে পৌঁছালে অজ্ঞাতনামা ১০-১২ জন ‘দুষ্কৃতকারী’ তাদের মোটরসাইকেল দিয়ে সাম্য’র মোটরসাইকেলকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়।
ঘটনার পরের বর্ণনা দিয়ে পুলিশ বলছে, তর্ক বির্তকের এক পর্যায়ে সাম্য ও তার বন্ধুদের ইট দিয়ে আঘাত করে আহত করে ও একজন সাম্যকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ডান পায়ের উরুর পেছন দিকে আঘাত করে গুরুতর জখম করে। এতে সে রক্তাক্ত জখম অবস্থায় মাটিতে পড়ে গেলে ‘দুষ্কৃতকারীরা’ তাকে ও তার বন্ধুদের বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়।
এ ঘটনায় পুলিশ তামিম হাওলাদার (৩০), সম্রাট মল্লিক (২৮) ও পলাশ সরদার (৩০) নামে যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে তারা সবাই ফার্মগেট এলাকায় ফুটপাতে কিছুদিন আগে গেঞ্জির ব্যবসা শুরু করেন বলে জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই তৌফিক।
তিনি বলেন, “প্রায় ২০দিন আগে ওরা মাদারীপুর থেকে ঢাকায় আসে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে। তারা মাদক সেবনের জন্য সে জায়গায় গিয়েছিল।
"ঘটনার সময় দুইজন আহত হয়ে শেরে বাংলা নগর থানা এলাকার একটি প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিল। পরে সেখান থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।”
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসনের অধীনে প্রক্টোরিয়াল টিমে একটি ‘কুইক রেসপন্স টিম’ গঠনসহ হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করে ছয় দফা দাবি জানিয়েছে 'ঢাকা ইউনিভার্সিটি হিউম্যান রাইটস অ্যাসোসিয়েশন' নামের এক সংগঠন।
বুধবার সন্ধ্যায় সংগঠনের বিবৃতিতে বলা হয়, এর আগে ফজলুল হক হলে তোফাজ্জল হত্যাসহ সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে মানবিক মর্যাদা ও জীবনের অধিকার ক্ষুন্ন হওয়ার জলন্ত প্রমাণ।
