২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

সোনার দাম বাড়ে-কমে কেন, কীভাবে হয় দাম নির্ধারণ

“যতক্ষণ দেশের অভ্যন্তরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বৈশ্বিক দরে সোনা কেনা যাবে না, ততক্ষণ জুয়েলারি ব্যবসায়ীরাও সেই দামে দিতে পারবেন না,” বলেন বাজুসের শাহীন।

আবদুর রহিম হারমাছি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 26 Oct 2026, 02:00 AM

Updated : 26 Oct 2026, 02:24 AM

সোনার ভরি এখন সোয়া দুই লাখ টাকা; এক রতির দাম আড়াই হাজার টাকার মতো। এ খবরে যে কারও চোখ কপালে ওঠাটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু একটু পেছনে গেলে ‘পিলে চমকে যাওয়ার’ মতো অবস্থা হবে। নয় মাস আগে মূল্যবান এই ধাতুর ভরি প্রায় তিন লাখ টাকা ছুঁয়েছিল; রতি উঠেছিল তিন হাজার টাকায়।

দেশের বাজারে সোনার দামের এ ওঠানামা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি, রাজনীতি এবং বাজারের দীর্ঘ ইতিহাস।

স্বাধীনতার পর যে সোনার ভরি ছিল ১৫০ টাকা, সেটিই গত জানুয়ারিতে কিনতে গুনতে হয়েছে ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।

পঞ্চান্ন বছরে সোনা দামি থেকে অতি দামি হয়ে উঠলেও বাংলাদেশে ধাতুটির দর নির্ধারণের প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়। এ জন্য দেশে বৈধভাবে সোনা আমদানি না হওয়াকে বড় কারণ মনে করছেন জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা।

দুবাইয়ের স্বর্ণ ও গহনা শিল্পের সবচেয়ে বড় সরকারি-বেসরকারি বাণিজ্য সংস্থা—দুবাই জুয়েলারি গ্রুপের ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ২২ ক্যারেট মানের সোনার ভরির দাম ছিল ৫ হাজার ২০২ দিরহাম, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার ৩১২ টাকা (১ দিরহাম = ৩৩.৭০ টাকা ধরে)।

অন্যদিকে পাশের দেশ ভারতের বুলিয়ন অ্যান্ড জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া দর বলছে, দেশটিতে শুক্রবার সোনার গয়নার প্রতি ভরির দাম ছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ২৩১ রুপি। অর্থাৎ ২ লাখ ৯ হাজার ৬০১ টাকা (১ রুপি = ১.৩০ টাকা ধরে)।

এদিকে বাংলাদেশের বাজারেও কমেছে সোনার দাম। দুই দিনের ব্যবধানে ৩ হাজার ৩২৪ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেট সোনার দাম প্রতিভরি ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)।

রোববার সকাল ১০টা থেকে সারা দেশে এ দরে সোনা বিক্রি হচ্ছে। একই সঙ্গে কমানো হয়েছে অন্যান্য মানের সোনার দাম।

তাতে দেখা যায়, দুবাইয়ের তুলনায় দেশে এক ভরি সোনার দাম ৪৫ হাজার ৫৪৬ টাকা বেশি; আর ভারতের তুলনায় দাম বেশি ১১ হাজার ২৫৭ টাকা।

দেশে সোনার ওজন মাপার প্রচলিত একক হলো ভরি, আনা ও রতি। সাধারণত সোনার দাম ভরি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। সেই ভরিকে ১৬টি সমান ভাগ করলে প্রতিটি ভাগকে এক আনা বলা হয়। আর এক ভরিকে ৯৬টি সমান ভাগ করলে প্রতিটি ভাগকে রতি বলা হয়।
তার মানে, ১ ভরি = ১৬ আনা = ৯৬ রতি

বেশ কিছুদিন ধরেই দেশের বাজারে সোনার দর ওঠানামা করছে। গত ৯ অক্টোবর ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ২ হাজার ২১৬ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। এরপর ১৬ দিনের ব্যবধানে চার দফায় এই মানের সোনার দাম ভরিতে ১০ হাজার ৪৩৯ টাকা কমানো হয়েছে।

দেশের বাজারে এখন ২১ ক্যারেটের এক ভরি কিনতে লাগছে ২ লাখ ১০ হাজার ৯৪৩ টাকা। এছাড়া ১৮ ক্যারেটের ১ লাখ ৮১ হাজার ২০০ টাকায় এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনা ১ লাখ ৪৮ হাজার ১৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ক্যারেট হলো সোনার বিশুদ্ধতা মাপার একক। বিশুদ্ধ সোনাকে ২৪ ভাগ ধরে এর সঙ্গে কত ভাগ সোনা আছে, তা দিয়ে ক্যারেট নির্ধারণ করা হয়।
২৪ ক্যারেট হলো সবচেয়ে বিশুদ্ধ সোনা। এতে প্রায় ৯৯.৯৯ শতাংশ পর্যন্ত খাঁটি সোনা থাকতে পারে। তবে ২৪ ক্যারেটের সোনা তুলনামূলক নরম। ফলে সহজে বাঁকা বা আঁচড় পড়তে পারে।
এ কারণে গয়না তৈরিতে সোনার সঙ্গে তামা, রূপা বা অন্য ধাতু মিশিয়ে ২২, ২১ বা ১৮ ক্যারেটের সোনা ব্যবহার করা হয়। গয়না কীভাবে তৈরি করা হয়েছে, তার ওপরও এর স্থায়িত্ব নির্ভর করে।
·        ২৪ ক্যারেট: ২৪ ভাগের ২৪ ভাগই সোনা—প্রায় ১০০% বিশুদ্ধ।
·        ২২ ক্যারেট: ২৪ ভাগের ২২ ভাগ সোনা—৯১.৬৭%।
·        ২১ ক্যারেট: ২৪ ভাগের ২১ ভাগ সোনা—৮৭.৫%।
·        ১৮ ক্যারেট: ২৪ ভাগের ১৮ ভাগ সোনা—৭৫%।

বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে সোনা আমদানি হয় না বললেই চলে। সোনা আসে বিদেশফেরত যাত্রীদের হাত ধরে। ‘যাত্রী (অপর্যটক) ব্যাগেজ (আমদানি) বিধিমালা, ২০১৬’ অনুযায়ী, একজন যাত্রী বিদেশ থেকে আসার সময় ভরিপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা শুল্ক দিয়ে ১০ ভরির মতো (১১৭ গ্রাম) সোনা আনতে পারেন।

ভরিপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা শুল্ক আমলে নেওয়ার পরও দেখা যায়, বাংলাদেশে সোনার দাম বেশি। যদিও দেশে অবৈধ পথেই বেশির ভাগ সোনা আসে বলে সন্দেহ করা হয়। এ ছাড়া চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ হয় পুরনো সোনা দিয়ে।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে সোনার দাম নির্ধারণ করে আসছে বাজুস। বৈশ্বিক বাজারে দাম বাড়লে বা কমলে সমিতির নেতারা তার ভিত্তিতে দর সমন্বয় করেন। তবে দাম বাড়ানো-কমানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনা বা পিউর গোল্ডের দাম বেড়েছে-কমেছে। এ কারণে সমিতির সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যরা দাম বাড়ানো-কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

যেমন রোববার দাম কমানোর ব্যাখ্যায় বাজুসের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিউর গোল্ড) মূল্য হ্রাস পেয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।

কীভাবে দাম নির্ধারণ হয়

জুয়েলার্স সমিতির নেতারা সোনার দাম নির্ধারণ করলেও এ ক্ষেত্রে ভিত্তি ধরা হয় পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারকেন্দ্রিক পাইকারি বাজারের সোনার দাম। এ দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ পোদ্দার সমিতি; এ দরে মূলত ব্যবসায়ী পর্যায়ে কেনাবেচা হয়ে থাকে।

একাধিক জুয়েলারি ব্যবসায়ী জানান, পোদ্দার সমিতি প্রতিদিন সোনার (পিউর গোল্ড) দাম নির্ধারণ করে। এ ক্ষেত্রে বাজারে ব্যাগেজ রুলসে আসা সোনা এবং সারাদেশ থেকে আসা পুরনো অলংকারের সোনার সরবরাহের পরিমাণ বিবেচনায় নেওয়া হয়। একই সঙ্গে কলকাতায় সোনার দাম কত, সেটিও জেনে নেয়। তারপরই সোনার দাম হ্রাস-বৃদ্ধি করা হয়।

সোনার দাম সমন্বয় করার জন্য জুয়েলার্স সমিতির একটি কমিটি রয়েছে, যার নাম—বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং। সোনার দাম সমন্বয়ে এ কমিটি প্রথমেই পোদ্দার সমিতির নির্ধারিত পাইকারি সোনার দর বিবেচনায় নেয়।

যেমন—রোববার সকালে জুয়েলার্স সমিতি সোনার যে দাম নির্ধারণ করেছে, তাতে আগের দিনের (শনিবার) পুরান ঢাকার পাইকারি বাজারে প্রতি ভরি সোনার দাম যা ছিল তার সঙ্গে জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের জন্য আড়াই হাজার টাকা মুনাফা যুক্ত করে দাম চূড়ান্ত করা হয়।

আগে জুয়েলার্স সমিতির কমিটি পাইকারি বাজারের সোনার (পিউর গোল্ড) দামের ১ দশমিক ২৫ গুণ করে সোনার দর নির্ধারণ করত। সোনার দাম বেশি ওঠানামার কারণে সেই ব্যবস্থা থেকে সরে এসেছে সমিতি।

কীভাবে দেশে সোনার দাম বাড়ানো-কমানো হয়, জানতে চাইলে বাংলাদেশ পোদ্দার সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা আন্তর্জাতিক বাজারদর, তাঁতীবাজারে সোনার সরবরাহ, চাহিদা-জোগান ও পার্শ্ববর্তী দেশের দাম বিবেচনায় নিয়ে প্রতিদিন দাম নির্ধারণ করে থাকি।

“বাজুসের দামের সঙ্গে আমাদের দামের পার্থক্য দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার মতো হয়ে থাকে।”

আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে দাম বেশি কেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিদেশ থেকে ব্যাগেজ রুলসে যারা সোনা নিয়ে আসেন, তারা মুনাফা করেন। পাইকারি ব্যবসায়ীদেরও মুনাফার বিষয় আছে। এরপর আবার জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের মুনাফা।

“এভাবে কয়েক ধাপে দাম কিছুটা বেড়ে যায়।”

বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিংয়ের চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের জুয়েলার্স সমিতির একটি কমিটি রয়েছে, যার নাম—বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং। এই কমিটি প্রতি মুহূর্তে গোল্ডের আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণ করে এবং তার সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের বাজারে দাম নির্ধারণ করে দেয়।

“দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই কমিটি প্রথমেই পোদ্দার সমিতির নির্ধারিত পাইকারি সোনার দর বিবেচনায় নেয়। যেমন—২৫ অক্টোবর সকাল ৯টায় আমরা কমিটির বৈঠক করে সোনার দাম কমিয়েছি। এই দর নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমরা ২৪ অক্টোবর বিকেলের পোদ্দার সমিতির দর এবং আন্তর্জাতিক দাম বিবেচনায় নিয়েছি।

“তবে আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে। সোনার বাজার ডলারের বাজারের উপরও অনেকটা নির্ভর করে। ডলারের দাম বাড়লে, সোনার দাম বাড়ে—এটা সব সময়ই হয়ে আসছে।”

দেশে সোনার ব্যবসায় স্বচ্ছতা আনতে ২০১৮ সালে স্বর্ণ নীতিমালা করেছিল সরকার। তারপর বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৯ সালের নভেম্বরে একটি ব্যাংকসহ ১৮টি প্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিকভাবে সোনা আমদানির লাইসেন্স দেয়। পরে আরও একটি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স পায়।

শুরুতে একাধিক প্রতিষ্ঠান কয়েকটি চালানে সোনা আমদানি করেছিল। পরে বিদেশি মুদ্রার (ডলার) সংকট, অনুমতি পেতে সময়ক্ষেপণ ও বেশি ভ্যাটের কারণে আমদানিতে আগ্রহ হারান ব্যবসায়ীরা।

আমদানি হচ্ছে না কেন

সোনা আমদানি হচ্ছে না কেন, এ প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সভাপতি এনামুল হক খান দোলন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিদ্যমান নীতিমালার আলোকে একজন ব্যবসায়ী চাইলে যে কোনো পরিমাণ সোনা বিদেশ থেকে বৈধ পথে আমদানি করতে পারেন। তবে এর জন্য প্রয়োজন পূর্বানুমোদন, অনাপত্তিপত্রসহ (এনওসি) বেশ কিছু কাগজপত্র। এ প্রক্রিয়া জটিল ও সময় সাপেক্ষ। সে কারণে এখন দেশে বৈধ পথে সোনা আমদানি হয় না বললেই চলে।

তিনি বলেন, “সোনা আমদানি খুবই জটিল একটি প্রক্রিয়া। একটি আমদানি সম্পন্ন হতে দেড় থেকে পৌনে দুই মাস সময় লাগে। অথচ ভারতে সাত দিনেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে যায়।

“এই দীর্ঘ সময় মোটা অংকের টাকা আটকে থাকে। সে কারণে যারা আমদানি করতে যান, তাদের অনেক ক্ষতি হয়। এছাড়া শুল্কের হারও বেশি; প্রতি ভরিতে দুই হাজার টাকা দিতে হয়।”

বাজুস সভাপতি দোলন বলেন, “সব মিলিয়ে আমদানি করা সোনার যে দাম দাঁড়ায়, তা বাজারের দামের চেয়ে অনেক বেশি পড়ে। সে কারণেই এখন আর কেউ আমদানি করে না।

“আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করতে আমরা সরকারকে বলেছি। বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছি। তারা ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। দেখা যাক কী হয়।”

দাম নির্ধারণ কতটা যৌক্তিক

সোনা বেচাকেনায় বিভিন্ন দেশে ‘কমোডিটি এক্সচেঞ্জ’ চালু থাকলেও বাংলাদেশে নেই। কমোডিটি এক্সচেঞ্জ এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে শেয়ারের মতো পণ্য কেনাবেচা হয়। পণ্য সরাসরি নয়, কাগুজে বা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে কেনাবেচা হয়। আর মূল পণ্য থাকে কোনো গুদামে বা মাঠে। সেখান থেকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর এটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি বা হস্তান্তর হয়।

জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময় বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় সোনা কেনাবেচার ব্যবস্থা করলে তারা বৈশ্বিক দরের কাছাকাছি দরে সোনা কিনতে পারবেন। তখন ক্রেতারাও সেই সুবিধা পাবেন।

সোনার দরে ওঠানামার বিষয়ে জানতে চাইলে বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিংয়ের চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন বলেন, “দেশের সোনার বাজার আসলে পুরোপুরিই বিশ্ববাজারের উপর নির্ভর করে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে, তার সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা দাম ঠিক করি। আবার কমলে, কমাই।”

তিনি বলেন, “বিশ্ববাজার এখন অদ্ভুত আচরণ করছে। অতীতে দেখা গেছে, বিশ্ব পরিস্থিতি অস্থির হলে, যুদ্ধ লাগলে—আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যেত। কাছাকাছি সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের ধাক্কায় গোল্ডের দাম বেড়েছে। এর আগে ইরাক, লিবিয়া যুদ্ধের সময়ে বেড়েছে। চীন ও আমেরিকার বাণিজ্য যুদ্ধের কারণেও বেড়েছে।

“এমনকি করোনাভাইরাস মহামারীর সময়ে বিশ্ব অর্থনীতি যখন ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল, তখনও সোনার দাম বেড়েছিল। অথচ এখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে, চরম অস্থিরতা বিশ্বজুড়ে; এর মধ্যে গোল্ডের দাম কমছে। অবাক লাগছে; বুঝতে পারছি না কেন—এমনটা হচ্ছে।”

দেশের বাজারে যে পদ্ধতিতে সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়, তা কতটা যৌক্তিক—এ প্রশ্নের উত্তরে দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন বলেন, “বর্তমান বাস্তবতায় যে পদ্ধতিতে সোনার দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেটিকে যৌক্তিক বলতে হবে। কারণ যতক্ষণ দেশের অভ্যন্তরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বৈশ্বিক দরে সোনা কেনা যাবে না, ততক্ষণ জুয়েলারি ব্যবসায়ীরাও সেই দামে দিতে পারবেন না। তা ছাড়া আপাতদৃষ্টে সোনার দাম বেশি মনে হলেও ক্রেতারাও কিন্তু যে দামে কিনছেন, সেই দামেই আবার বিক্রি করতে পারছেন।

“যে কেউ পুরাতন সোনার গয়না বা অলংকার পরিবর্তন করে নতুন কিনতে চাইলে ১২ শতাংশ চার্জ দিয়ে কিনতে পারেন। আবার কেউ বিক্রি করতে চাইলে মোট যে দাম আসবে, তা থেকে ১৮ শতাংশ বাদ দিয়ে বিক্রি করতে পারছেন।”

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশে বার্ষিক সোনার চাহিদা ২০ থেকে ৪০ টন। এর মধ্যে ১০ শতাংশ পুরোনো অলংকার থেকে পূরণ হয়। বাকিটা ব্যাগেজ রুলের আওতায় বিদেশ থেকে আসে।

অবৈধভাবেও প্রচুর সোনা দেশে আসে; তার প্রমাণ মেলে মাঝে-মধ্যেই ছোট-বড় অনেক চালান আটকের খবরে। যেগুলো আটক বা ধরা হয়—সেগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা হয়। পরে তা নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়।

অভিযোগ আছে, আটকের বাইরেও প্রচুর সোনা অবৈধভাবেও দেশে আসে। আর এ গুলোই আসলে দেশের চাহিদার সিংহভাগ জোগান দিচ্ছে।

বাজুস কবে থেকে দেশে সোনার দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছে—তার কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। স্বাধীনতার পর অনেক দিন ব্যবসায়ীরাই তাদের নিজেদের মতো করে দাম ঠিক করে বিক্রি করে বেচাকেনা করত। সেক্ষেত্রে এলাকাভিত্তিক অর্থাৎ রাজধানী-বিভাগ-জেলা-থানা পর্যায়ে দাম হেরফের হত।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, স্বাধীনতার আগে-পরে প্রতি ভরি সোনার (গিনি সোনা বা প্রচলিত মান) দাম ছিল আনুমানিক ১৫০ টাকা থেকে ১৭০ টাকা। ১৯৭৪ সালে বেড়ে হয় ১ হাজার ২০০ টাকা। ১৯৯২ সালে ভরি ছিল ৪ হাজার ৮৫০ টাকা। ২০০০ সালে এক ভরি সোনা কিনতে ৭ হাজার টাকারও কম খরচ হত।

নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২০২৬ সালে ২৯ জানুয়ারি অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সেই সোনার ভরি ২ লাখ ৮৬ হাজার ১ টাকায় উঠেছিল।

এরপর গত নয় মাস ওঠানামার মধ্য দিয়ে চলছে লেনদেন। কখনও বাড়ছে, কখনও কমছে। আগে রাতে সোনার দাম বাড়ানো-কমানো হত; পরের দিন থেকে কার্যকর হত সেই দর।

বেশ কিছুদিন ধরে সকাল ১০টায় দাম বাড়ানো-কমানোর ঘোষণা দিচ্ছে বাজুস এবং সঙ্গে সঙ্গেই তা কার্যকর হচ্ছে। কখনও কখনও বিকেলেও সোনার দাম বাড়ানো-কমানো হয়।

রেকর্ড ভাঙা দিনগুলো

বাজুসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম মাস জানুয়ারি ছিল দেশের সোনার বাজারের জন্য অস্থির মাস। ওই মাসে সোনার দর যে গতিতে চড়েছিল, আবার ঠিক প্রায় একই গতিতে নেমেছিল। জানুয়ারিতে মোট ২০ বার সোনার দাম সমন্বয় করে বাজুস। এর মধ্যে ১৪ বার বাড়ে; কমে ছয় বার।

লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে ২৯ জানুয়ারি ২২ ক্যারেট মানের সোনার ভরি ২ লাখ ৮৬ হাজার ১ টাকায় উঠেছিল, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।

চলতি বছরের দ্বিতীয় মাস ফেব্রুয়ারি শুরু হয় দফায় দফায় কমানোর মধ্য দিয়ে। এরপর ওঠানামার মধ্য দিয়ে চলে লেনদেন। কিন্তু শেষের দিকে টানা বাড়ে, মাসের ২৮ দিনে ১৫ বার সোনার দাম সমন্বয় করে বাজুস। এর মধ্যে আট বার বাড়ে, কমে সাত বার।

মার্চ মাসে ১০ দফা সোনার দাম সমন্বয় করে বাজুস। এর মধ্যে সাত বার বেড়েছে; কমে তিন দফা।

এর পর গত সাত মাস বাড়া-কমার মধ্য দিয়েই চলছে লেনদেন। তবে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের মতো উত্থান-পতন লক্ষ্য করা যায়নি।

২০২৫ সালে মোট ৯১ বার সোনার দাম সমন্বয় করে বাজুস। এর মধ্যে ৬৪ বার বেড়েছে, আর কমেছে ২৭ বার। ২০২৪ সালে দাম সমন্বয় হয়েছিল ৬২ বার।

বাংলাদেশে প্রথমবার ২২ ক্যারেট মানের সোনার ভরি ১ লাখ টাকা ছাড়ায় ২০২৩ সালের জুলাই মাসে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছাড়ায় দেড় লাখ টাকা; ২২ এপ্রিল প্রথমবারের মতো দুই লাখ টাকা অতিক্রম করে।

বিশ্ববাজারেও উত্থান-পতন

রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে চলতি বছরের জানুয়ারির শেষের দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স (৩১.১০৩৪৭৬৮ গ্রাম) সোনার দাম ৫ হাজার ৫০০ ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছিল; ঠেকেছিল ৫ হাজার ৬০২ ডলারে।

ওই সময়েই বাংলাদেশের বাজারে ২২ ক্যারেট মানের সোনার ভরি প্রায় ৩ লাখ টাকা ছুঁয়েছিল।

এর পর ওঠানামার মধ্য দিয়ে চলে লেনদেন। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের কারণে ফের চড়েছিল। পরে আবার নিম্নমুখী হয়।

সবশেষ রোববার বিশ্ববাজারে সোনার দামে বড় পতন হয়েছে। এদিন বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টায় বিশ্ববাজারের স্পটমার্কেটে প্রতিআউন্স সোনার দাম ছিল ৩ হাজার ৯৯৫ ডলার ৮৮ সেন্ট, যা আগের দিনের চেয়ে ৪৮ ডলার ৮৪ সেন্ট কম। শতাংশ হিসাবে কমেছে ১ দশমিক ২১ শতাংশ।

আর ছয় মাসের নিরিখে ৬৫১ ডলার, যা শতাংশের হিসাবে ১৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ।