২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

‘এভিয়েশন হাব’ কি কেবলই রাজনৈতিক বুলি?

একজন বিশেষজ্ঞ বললেন, “যে বিয়ে বসবে তাকে আগে ঠিক করেন। তারপর না হয় গাড়ি সাজাবেন। বর-কনের ঠিক নাই গাড়ি সাজানোর আয়োজন চলছে বিরাট।”

‘এভিয়েশন হাব’ কি কেবলই রাজনৈতিক বুলি?

ক্যারিকেচার: জেমিনাই

গোলাম মর্তুজা অন্তু গোলাম মর্তুজা অন্তু

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 28 Sep 2026, 01:28 AM

Updated : 28 Sep 2026, 01:28 AM

ঠিক কবে থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিরা বক্তৃতা-ভাষণে ‘এভিয়েশন হাব’ শব্দটা উচ্চারণ করে আসছেন তার বৃত্তান্ত সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারলেন না এই খাতের অংশীদাররা।

তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী-এমপিদের মুখে জোরেশোরেই শোনা যেত ‘এভিয়েশন হাব’ এর কথা।

বর্তমান বিএনপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারেও ‘এভিয়েশন হাব’ এর অঙ্গীকার ঠাঁই পেয়েছে। এভিয়েশন খাতের ব্যবসা পেতে বিদেশি রাষ্ট্রদূত কিংবা কোম্পানির প্রতিনিধিরা যখনই মন্ত্রী বা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ করেন, প্রতিবারই সরকারি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বেশ জোর দিয়ে ‘এভিয়েশন হাব’ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়।

কিন্তু এই খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভিয়েশন হাব করে মূলত এয়ারলাইন্স। যেভাবে এমিরেটস, কাতার বা সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের মত ক্যারিয়ারগুলোকে কেন্দ্র করে দুবাই, কাতার বা সিঙ্গাপুরে হাব গড়ে উঠেছে।

তারা ঢাকার যাত্রীকে সিঙ্গাপুর বা কাতারে নিয়ে সেখান থেকে ইউরোপ, আমেরিকা বা তৃতীয় কোনো দেশের কানেক্টিভিটি দিচ্ছে- এটাই আসলে হাব।

সেখাবে বাংলাদেশের বাস্তবতা হল, গত ৫৫ বছরে আন্তর্জাতিক রুটগুলোতে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো বলতে গেলে দাঁড়াতেই পারেনি। দেশের বিপুল সংখ্যাক মানুষ বিদেশে থাকার পরেও এখনো আন্তর্জাতিক যাত্রীদের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই টানছে বিদেশি ক্যারিয়ারগুলো।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের এয়ারলাইন্স অন্য কোনো দেশ থেকে যাত্রী এনে তৃতীয় আরেকটি দেশে নিয়ে যাবে–এমন আশা করতে পারছেন না খাত সংশ্লিষ্টরা। দেশে এভিয়েশন হাব তৈরি হওয়ার দূরগত কোনো প্রস্তুতি বা লক্ষণও তারা দেখছেন না।

বিষয়টিকে কেউ কেউ শুধুই রাজনৈতিক বুলি হিসেবে দেখতে চান। তবে কারো কারো মতে, বাংলাদেশে ‘এভিয়েশন হাব’ তৈরির ভৌগোলিক বাস্তবতা ও বাজার সম্ভাবনা সত্যিই রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূতেরা সম্প্রতি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এ বিষয়ে পাঠানো সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে যথারীতি ‘এভিয়েশন হাব’ এর অঙ্গীকারের বিষয়টি এসেছে।

জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্স বিমানের জন্য নতুন উড়োজাহাজ কেনা, থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার জন্য কোম্পানি নিয়োগের বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা চলছে। রাষ্ট্রদূতরা তাদের দেশীয় কোম্পানির জন্য ব্যবসা পেতে সরকারি দপ্তরে দৌড়ঝাঁপ করছেন।

বিদেশি দূতরাও সাক্ষাতের আনুষ্ঠানিক ভাষ্যে ‘এভিয়েশন হাব’ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলে আসছেন।

দেশের এভিয়েশন খাতে প্রায় তিন দশক ধরে কাজ করে আসা উইং কমান্ডার (অব.) এটিএম নজরুল ইসলাম বলছেন, বাংলাদেশকে ‘এভিয়েশন হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলে সরকার শুধু অবকাঠামোটা করে দিতে পারে। মূল কাজটি করতে হবে এয়ারলাইন্সকে।

“আমাদের রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইন্স বিমান বা ইউএস বাংলা কী বলেছে যে তারা হাব করবে? তারা কী এ ধরনের কোনো প্রস্তুতি নিয়েছে? সেরকম দৃশ্যমান কিছু আছে? হাব করার জন্য যে মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি লাগে, তারা তো সেটাই নেয়নি। তারা এখন ডেস্টিনেশন টু ডেস্টিনেশন যাত্রী বহন করছে।”

বাংলাদেশের চারটি দেশীয় এয়ারলাইন্সের মধ্যে কেবল বিমান ও ইউএস বাংলা এখন আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী বহন করছে। নভো এয়ার ও এয়ার আস্ট্রা কেবল অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট চালাচ্ছে।

Image

বিমান বহরের কয়েকটি বোয়িং। ছবি: নাছিমুল গনি/ প্লেন স্পটার্স বাংলাদেশ

বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশীয় এয়ারলাইন্স জিএমজি ও ইউনাইটেডে এক যুগের বেশি সময় কাজ করা এটিএম নজরুল বলছেন, “আমাদের দেশে যে নীতি নেওয়া হয়েছে, তাতে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো তো টিকতেই পারছে না। একের পর এক দেশীয় এয়ারলাইন্স মরে গেছে। আমাদের এখানে এয়ারপোর্টের চার্জ খুবই বেশি, প্রাইভেট এয়ারলাইন্সগুলো টিকতেই পারেনি।

“এইখানে কে হাব করবে? হাব করার আগে সিভিল এভিয়েশনের রেগুলেশনগুলো কোথায় আটকাচ্ছে সেটা তো দেখতে হবে।”

তিনি বলেন, “হাব যারা করবে তাদেরই তো খবর নেই। বিষয়টা এমন, যার বিয়ে তার খবর নেই। যে বিয়ে বসবে তাকে আগে ঠিক করেন। তারপর না হয় গাড়ি সাজাবেন। বর-কনের ঠিক নাই গাড়ি সাজানোর আয়োজন চলছে বিরাট।”

নজরুল ইসলাম বলেন, “হাবের বেসিক আইডিয়াটা হচ্ছে, বিভিন্ন ডেস্টিনেশন থেকে যাত্রী জড়ো করে নিজের হোম এয়ারপোর্ট বা হাব এয়ারপোর্টে এনে তারপর বিভিন্ন দূরের গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া। এই উড়োজাহাজ বদল বা ট্রানজিটের সময়টা যেন যাত্রীরা ভালোভাবে পার করতে পারে সেজন্য হাব এয়ারপোর্টগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থা থাকতে হয়।

“তিনি যেন ভালো খাবার পান, ট্রানজিট ছয় বা আট ঘণ্টার বেশি হলে যেন তারা এয়ারপোর্টে ঘুমাতে বা ঠিকমত বিশ্রাম নিতে পারেন–সেরকম ব্যবস্থা থাকতে হয়। যাত্রীরা যেন এক টার্মিনাল থেকে আরেক টার্মিনালে সহজে যেতে পারেন, বোর্ডিং পয়েন্টগুলো যেন সহজে খুঁজে পান, এসব ব্যবস্থাপনা উন্নত হতে হয়। কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন যাত্রীবান্ধব হতে হয়।”

‘হাব’ এর ভাষণ অবিবেচনাপ্রসূত?

দেশের এভিয়েশন খাতের বিশেষজ্ঞ, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাবেক পরিচালক কাজী ওয়াহেদুল আলম বলেন, যখন থেকে থার্ড টার্মিনালের কথা শুরু হয়েছে, তখন থেকেই ‘এভিয়েশন হাব’ নিয়ে কথা শোনা যাচ্ছে।

“হাবের সঙ্গে টার্মিনাল একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। কিন্তু একটা সুদৃশ্য টার্মিনাল থাকলেই হাব হবে এমন না। এভিয়েশন হাব হতে হলে দেশীয় এয়ারলাইন্স শক্তিশালী হতে হবে। আমাদের এই রুগ্ন বিমান আর ইউএস বাংলা দিয়ে এই হাব হবে না।”

তিনি বলেন, “আপনি সিঙ্গাপুর দেখেন। দুবাই দেখেন। সেখানকার দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর মার্কেট শেয়ার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। হংকং, লন্ডন–আপনি যেখানেই যান, দেশীয় এয়ারলাইন্স ছাড়া হাব হবে না। সেখানে বিমান ও ইউএস বাংলা মিলিয়ে আমাদের মার্কেট শেয়ার ২৭-২৮ শতাংশ হতে পারে। এরকম রুগ্ন দেশীয় এয়ারলাইন্স নিয়ে এভিয়েশন হাব কখনোই সম্ভব না।”

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “একজন যাত্রী টোকিও থেকে ঢাকায় আসবে, ঢাকা থেকে দুবাই যাবে। সেই বিষয়টি সহজ করতে হবে। ভিসা সহজ করতে হবে। বাংলাদেশের ভিসা পাওয়া অন্যতম জটিল কাজ। অনলাইনে ভিসা পাওয়া যায় না। অথচ অনেক জায়গায় অনলাইনে সাবমিট করলে এক ঘণ্টার মধ্যে হয়ে যায়। এগুলো না হলে হাবের কল্পনা করাও উচিত না।”

ঢাকায় উড়োজাহাজের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চার্জও যে অনেক বেশি, সে কথাও বলেন কাজী ওয়াহেদুল।

তিনি বলেন, “আমাদের এখানে একটা প্লেন নামলে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চার্জ দিতে হয়। মালয়েশিয়ায় এটা এক লাখের মধ্যে। এই পরিস্থিতিতে এখানে কে হাব করতে যাবে?”

হাব কী তাহলে কেবলই রাজনৈতিক বুলি? কাজী ওয়াহেদুল বলেন, “এটাকে আমি কেবল পলিটিক্যাল বাজ ওয়ার্ড বলতে রাজি না। আমি বলব এটা অবিবেচনাপ্রসূত কথা। হয়ত পুরো বিষয়টি না জেনেই তারা বলছেন। আমরা যেটা ‘হাব হাব’ করছি, এটার কোনো সারমর্ম নেই। এটা একটা অলীক কল্পনার মত।

“হাব করতে হলে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোকে আরও অনেক বেশি শক্তিশালী করতে হবে। তারা আঞ্চলিক যাত্রীদের ঢাকায় আনবে। সেখান থেকে দূরের গন্তব্যগুলোতে নিয়ে যাবে। কিন্তু এটা এত সহজ ব্যাপার নয়। ৫৫ বছর পর বিমানের মার্কেট শেয়ার ৩০ শতাংশের বেশি নয়। কাজেই মার্কেট শেয়ার বাড়াতে তো আরও ৩০ বছর লেগে যেতে পারে।”

উড়োজাহাজ সংখ্যায় দেশের সবচেয়ে বড় এয়ারলাইন্স ইউএস বাংলার এমডি আব্দুল্লাহ আল মামুনও বলছেন, বাংলাদেশকে ‘এভিয়েশন হাব’ করতে হলে মূল ভূমিকা পালন করবে দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোকে।

“এটা খুবই সরল বিষয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য হল, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি এয়ারলাইনস হিসেবে আমাদের সঙ্গে এভিয়েশন হাব নিয়ে কোনো পর্যায়ে যথাযথভাবে আলোচনাও করা হয়নি।”

গত ১২ সেপ্টেম্বর বণিক বার্তা আয়োজিত এভিয়েশন খাত বিষয়ক এক আলোচনা সভায় এ বিষয়ে কথা বলেন ইউএস বাংলার এমডি।

তিনি বলেন, “এভিয়েশন হাব মানে শুধু বড় একটি টার্মিনাল বানানো নয়। একজন যাত্রীকে যদি দুই থেকে ছয় ঘণ্টা বিমানবন্দরে কাটাতে হয়, সেই সময় কাটানোর মত পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা সেখানে থাকতে হবে। পাঁচ কিলোমিটার হাঁটতে হলে হাঁটার মত একটি ভালো অভিজ্ঞতাও যাত্রীকে দিতে হবে।

“কিন্তু বাংলাদেশে ম্যাকডোনাল্ডস নেই, ডানকিন ডোনাটস নেই, বড় কোনো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড নেই। তাহলে এত বড় বিমানবন্দর তৈরি করে যাত্রীকে আমরা কী দেব? শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই এভিয়েশন হাব হওয়া যাবে না। হাবের জন্য প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক ও যাত্রীসেবার ইকোসিস্টেমও গড়ে তুলতে হবে।”

হাব ‘সম্ভব’, তবে…

বাংলাদেশে প্রায় দুই দশক ধরে এভিয়েশন খাতে সাংবাদিকতা করে আসা তানজীম আনোয়ার মনে করছেন, ‘এভিয়েশন হাব’ শুধুই একটি রাজনৈতিক বুলি নয়। বাংলাদেশে ভৌগোলিক অবস্থান ও দেশীয় বিপুল সংখ্যক যাত্রীই এ হাব কার্যকরের প্রধান উপাদান হতে পারত।

কিন্তু আমাদের এখনো সেই অবকাঠামো এবং একটি পুরোপুরি বাণিজ্যিক জাতীয় এয়ারলাইন্স গড়ে ওঠেনি। এভিয়েশন হাব গঠনের জন্য এ দুটো ‘অবধারিত অনুষঙ্গ’ বলে তার ভাষ্য।

সাংবাদিকদের এভিয়েশন বিটভিত্তিক সংগঠন এটিজেএফবি’র সভাপতি তানজীম বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপর যখন তারা ঢাকার উপকণ্ঠে আড়িয়ল বিলে একটি বিমানবন্দর করার উদ্যোগ নেয়, তখন থেকেই ‘এভিয়েশন হাব’ শব্দগুচ্ছ শোনা যেতে থাকে রাজনীতিকদের মুখে।

“আড়িয়ল বিলে দুই রানওয়ের একটা এয়ারপোর্ট করার কথা ছিল। সেই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত না হলেও পরবর্তীতে ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর ঘিরেই ‘এভিয়েশন হাব’ করার কথা বলা শুরু করে তখনকার রাজনীতিকরা। কিন্তু শাহজালালের সিঙ্গেল রানওয়ে নিয়ে এভিয়েশন হাব করার যৌক্তিকতা নিয়ে তখনো প্রশ্ন উঠেছিল।”

তবে বাংলাদেশে এভিয়েশন হাব করার মতো ভৌগোলিক অবস্থান ও বাজার রয়েছে বলেই মনে করেন তানজীম।

তিনি বলেন, “আমাদের দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো এখন শুধুমাত্র পয়েন্ট টু পয়েন্ট ট্রাফিক ক্যারি করছে। অর্থাৎ তারা শুধুমাত্র ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে আরেকটা গন্তব্যে নামিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন জায়গায়, যেখানে অন্য দেশ থেকে যাত্রী নিয়ে এসে তৃতীয় আরেকটি দেশে ক্যারি করার সুযোগ রয়েছে।”

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তানজীম বলেন, “আপনি দেখেন, ঢাকা থেকে দুই ঘণ্টার ফ্লাইট দূরত্বে মোটামুটি পুরো দক্ষিণ এশিয়া কভার করা যাায়। চার ঘণ্টার মধ্যে পুরো দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া এবং ছয় ঘণ্টার দূরত্বে জাপান, মধ্যপ্রাচ্য ও চীনের পুরোটা কভার করা যায়। ঢাকা থেকে আট ঘণ্টার দূরত্বে ইউরোপ, আফ্রিকা এমনকি অস্ট্রেলিয়া কাভার করা যায়।

“তারপরে যদি যাত্রী সংখ্যা হিসেব করেন, এখন দেড়কোটির মত বাংলাদেশি বিদেশে থাকেন। অনিয়মিত প্রবাসীদের ধরলে এই সংখ্যা আরো বেশি। বছরে আমাদের প্রায় এক কোটি নিজস্ব যাত্রী থাকেই। এটা একেবারে ফিক্সড ট্রাফিক, যার বেশিরভাগটাই টেনে নিয়ে যাচ্ছে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো।”

তার মতে, “এখন যদি শুধু একটা ভালো ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও ভালো এয়ারলাইন থাকে, তাহলে এই যাত্রীদের পাশাপাশি হাব হিসেবে অন্য দেশের যাত্রী ধরাও সম্ভব। আর ভালো এয়ারপোর্ট ও ভালো এয়ারলাইন্স–দুটোই গড়ে তোলা সম্ভব।”

হাবের স্বপ্ন: আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপি

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ পাঁচ বছরে বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার সরকারের মন্ত্রীরা ‘এভিয়েশন হাব’ করার স্বপ্নের কথা বারবার বলেছেন।

২০২৩ সালের ২২ মার্চ দুটো ইউরোপীয় দেশের সহায়তায় আয়োজিত এভিয়েশন সামিটের উদ্বোধনী অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন, “আমাদের ভৌগোলিক ও কৌশলগত সুবিধাকে পুঁজি করে কীভাবে আমরা আমাদের দেশকে একটি এভিয়েশন হাবে পরিণত করতে পারি, সেজন্য আমাদের একটি রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।”

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে আরো বলেন, “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে আইসিএও’র সদস্যপদ পাওয়া মাত্রই আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিয়ে পূর্ব ও পশ্চিমকে সংযুক্ত করতে বাংলাদেশকে একটি ‘এভিয়েশন হাব’ এ পরিণত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যার পরপরই এই পদক্ষেপ স্থগিত করা হয়েছিল।”

সেই এভিয়েশন হাবের আলোচনা চলেছে হাসিনা পরবর্তী আমলেও। দেশে এখন এভিয়েশন সংশ্লিষ্ট কোনো অনুষ্ঠানে ‘এভিয়েশন হাব’ বিষয়ক দীর্ঘ সরকারি বক্তব্য অবধারিত।

গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি যে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে, সেখানেও এভিয়েশন হাবের অঙ্গীকার করা হয়েছে।

বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, “২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান এভিয়েশন হাবে রূপান্তর করার লক্ষ্যে দেশব্যাপী জাতীয় এয়ার কানেকটিভিটি গ্রিড তৈরি করা হবে। এর আওতায় প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহর এবং পর্যায়ক্রমে জেলা শহরগুলোকে সংযুক্ত করতে ছোট বিমানবন্দর ও এয়ারস্ট্রিপ নির্মাণ করা হবে।”

নিজেদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বগুড়া, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, পাবনার ঈশ্বরদী, মৌলভীবাজারের শমশেরনগর, বাগেরহাটের খানজাহান আলী, কুমিল্লা ও পটুয়াখালীর স্টলপোর্টকে অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানায়।

বিশেষ করে বগুড়া বিমানবন্দরকে ঘিরে এখন ব্যাপক তোড়জোড় চলছে। তবে এভিয়েশন সংশ্লিষ্টরা এসব বিমানবন্দরের কোনো বাণিজ্যিক উপযোগিতা দেখছেন না।