Published : 07 Aug 2026, 01:06 AM
বাংলাদেশের পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রপ্তানি কমেছে।
জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৪০০ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এই অংক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ কম।
তবে এ ধাক্কার পরও বাজারটিতে দ্বিতীয় শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।
২০২৫ সালের একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাজারে ৪২৫ কোটি ২৪ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিলেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা।
একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বাংলাদেশের পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। মোট রপ্তানি আয়ের ২০ শতাংশের মত আসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির এই দেশ থেকে।
অথচ এই ছয় মাসে দেশটিতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। কম্বোডিয়ার বেড়েছে সবচেয়ে বেশি ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ার বেড়েছে ৩ দশমিক ৪০ শতাংশ।
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের অধীন ‘অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল’ (অটেক্সা) এর হালনাগাদ পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।
অটেক্সার তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা গত জানুয়ারি-জুন সময়ে মোট ৩ হাজার ৫০৮ কোটি ৭২ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছেন। এই আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ কম।
আগের বছরের প্রথম ছয় মাসে ৩ হাজার ৮১৫ কোটি ৪৫ লাখ ডলারের পোশাক আমদানি করেছিলেন দেশটির ব্যবসায়ীরা।
মার্কিন ব্যবসায়ীরা চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৫ হাজার ৯৩২ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছেন। এই আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৪৭ শতাংশ কম।
২০২২ সালে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩৬ শতাংশ বেড়ে ৯৭৩ কোটি ডলারে উঠেছিল। কিন্তু পরের বছর প্রবৃদ্ধি দূরের কথা, উল্টো ২৫ শতাংশ কমেছিল। ওই বছরে রপ্তানি হয়েছিল ৭২৯ কোটি ডলার।
২০২৪ সালে সামান্য বেড়ে ৭৩৪ কোটি ডলার হয়; শতাংশ হিসাবে বেড়েছিল দশমিক ৭৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে বেড়েছিল ১২ শতাংশের মত; রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮২০ কোটি ডলার।
সবচেয়ে বড় বাজারে দেশের পোশাক রপ্তানি কেন কমছে- এ প্রশ্নের জবাবে পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “সামগ্রিক হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা কিন্তু কম পোশাক আমদানি করেছে। তার প্রভাব আমাদের উপরও পড়েছে।
“এ কথা ঠিক যে, আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। কিন্তু আমাদের প্রবৃদ্ধি যেটা কমেছে, সেটা কিন্তু চীন ও ভারতের তুলনায় অনেক কম।”
প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কের কারণে সব দেশই আমেরিকার বাজারে সমস্যার সম্মুখীন বলে মনে করেন মহিউদ্দিন রুবেল।
তিনি বলেন, “একেক সময় একের হারে শুল্ক আরোপ করে সব হিসাবনিকাশ পাল্টে দিয়েছে।”
অটেক্সার তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পোশাক সরবরাহকারী দেশ ছিল ভিয়েতনাম। দেশটি থেকে আমদানি ১ দশমিক শূন্য আট শতাংশ বেড়ে ৭৭৬ কোটি ৯৫ লাখ ডলার থেকে ৭৮৫ কোটি ৩১ লাখ ডলারে পৌঁছেছে।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা চীনের রপ্তানি ৩৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ কমে ৫৭২ কোটি ৯৭ লাখ ডলার থেকে ৩৫৭ কোটি ২ লাখ ডলারে নেমে এসেছে।
অপরদিকে ইন্দোনেশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ২৩৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। কম্বোডিয়ার রপ্তানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ।
তবে ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমেছে ২৫ দশমিক ২৭ শতাংশ। এ ছাড়া মেক্সিকোতে ১০ দশমিক ৭৭ শতাংশ, পাকিস্তানে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং হন্ডুরাসে ৯ দশমিক ১৪ শতাংশ কমেছে।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “যদিও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার হার বৈশ্বিক আমদানি হ্রাসের তুলনায় কম। তবে প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি আমাদের জন্য প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।”
বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী দেশের অবস্থান ধরে রাখতে নতুন কৌশল, মূল্য প্রতিযোগিতা ও ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এ ব্যবসায়ী নেতা।
গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়। পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগমুহূর্তে সে বছরের ৩১ জুলাই বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের জন্য শুল্ক কমানোর ঘোষণা দেন তিনি। তাতে বাংলাদেশের শুল্ক ৩৫ শতাংশ থেকে কমে হয় ২০ শতাংশ। তখন চীন ও ভারতের পণ্যে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
প্রতিযোগী দেশের তুলনায় পাল্টা শুল্ক কাছাকাছি হওয়ায় ‘দুশ্চিন্তামুক্ত হন’ বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা। তাদের প্রত্যাশা ছিল এর সুফল মিলবে। সেই লক্ষণও দেখা দিয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে যেসব কোম্পানি তৈরি পোশাক রপ্তানি করছে, সেসব কোম্পানির অনেকেই বাড়তি ক্রয়াদেশ পেতে শুরু করেছিল। কিন্তু হিসাবে দেখা যায় উল্টো, রপ্তানি না বেড়ে বরং কমতে থাকে।
এরইমধ্যে ট্রাম্পের শুল্ক নিয়ে নতুন জটিলতা দেখা দেয়। গত ২০ ফেব্রুয়ারি তার আরোপ করা বৈশ্বিক শুল্ক দেশটির সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নতুন আইনে সব দেশের পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। পরদিনই অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারি তা বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেন।
এ অবস্থার মধ্যে গত ২৫ জুলাই জোরপূর্বক শ্রমে পণ্য উৎপাদন যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার অভিযোগে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের ওপর ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে ১৭টি দেশের জন্য ১০ শতাংশ এবং বাকি দেশগুলোর জন্য সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়।
বাংলাদেশের জন্য এই শুল্ক ১০ শতাংশ হওয়ায় ‘খুব একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না’ বলে মনে করছে সরকার।
শুল্ক ঘোষণার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পোশাক রপ্তানিকারক দেশ চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক স্তরে রাখা হয়েছে। ফলে এসব দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা আরও বাড়বে বলে সরকার মনে করছে।