০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

খেলাপি ঋণ কমাতে পরিকল্পনার কথা জানাল বাংলাদেশ ব্যাংক

এক বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য স্বল্পমেয়াদি, দুই থেকে তিন বছরের জন্য মধ্যমেয়াদি এবং চার থেকে পাঁচ বছরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা সংসদীয় কমিটির কাছে তুলে ধরেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 05 Oct 2026, 01:05 AM

Updated : 05 Oct 2026, 01:05 AM

একটি প্রতিষ্ঠানকে এক হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থায়নের প্রয়োজন হলে ব্যাংকঋণের বদলে বন্ডের মাধ্যমে সেই অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা করার তাগিদ দিতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ কমাতে যেসব ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেগুলোর ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রতি তিন মাসে আলোচনাও করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

খেলাপি ঋণ কমাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এসব উদ্যোগের কথা সংসদীয় কমিটির কাছে তুলে ধরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

রোববার জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির চতুর্থ বৈঠকে উপস্থাপন করা বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যপত্রে এসব পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।

কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে সংসদ ভবনে এ বৈঠক হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট ঋণ ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণ ছিল ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৮১ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩১ দশমিক ৪১ শতাংশ।

মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ১৩২ কোটি টাকা।

এ পরিস্থিতিতে খেলাপি ঋণ কমাতে এক বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য স্বল্পমেয়াদি, দুই থেকে তিন বছরের জন্য মধ্যমেয়াদি এবং চার থেকে পাঁচ বছরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সাজিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

১০ শতাংশের বেশি খেলাপি হলে ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা

স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেসব ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেসব ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা দলের সঙ্গে প্রতি তিন মাসে আলোচনা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ আদায়ে কী কী বাধা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে ব্যাংকগুলোকে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ঋণ আদায়ের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

প্রতিটি ব্যাংকার্স সভায় ব্যাংকগুলোর শীর্ষ ২০ খেলাপি বা শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

উচ্চ খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য ‘এনপিএল রেজল্যুশন স্ট্র্যাটেজি’ সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রণয়নের কথাও জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

একই সঙ্গে বিদ্যমান ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন হালনাগাদ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আসছে নতুন প্রভিশন ব্যবস্থা

মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী ‘এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস’ বা সম্ভাব্য ঋণ ক্ষতির ভিত্তিতে ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশন ব্যবস্থা চালু করা।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, বর্তমানে ঋণের মান খারাপ হওয়ার পর তার বিপরীতে প্রভিশন রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় ঋণ থেকে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাবও প্রভিশন নির্ধারণে বিবেচনায় আসবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে বলে কার্যপত্রে তুলে ধরা হয়েছে।

রিট করে ঋণ আদায় আটকে দেওয়ার পথ বন্ধের পরিকল্পনা

খেলাপি ঋণ আদায়ে আদালতের কার্যক্রম দীর্ঘায়িত হওয়ার বিষয়টির সুরাহার কথাও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

খেলাপি ঋণগ্রহীতারা যাতে রিট আবেদন করে ঋণ আদায় কার্যক্রম স্থবির করে রাখতে না পারেন, সে বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাতও অর্থঋণ আদালতের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানান।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অর্থঋণ আদালতে ৭৪ হাজার ৬৭৯টি মামলা রয়েছে। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে আলাদা বেঞ্চ গঠনের প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানান তিনি।

হাজার কোটি টাকার বেশি হলে বন্ড

বড় ঋণের চাপ ব্যাংকের ওপর থেকে কমানোর পরিকল্পনাও রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগে। এক হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থায়নের প্রয়োজন হলে ব্যাংকঋণের পরিবর্তে বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এছাড়া খেলাপি ও দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য বেসরকারি খাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরিতে আইন করার পরিকল্পনা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ বা ঋণ কিনে নিয়ে সেগুলো ব্যবস্থাপনা ও আদায়ের কাজ করতে পারে।

এ লক্ষ্যে ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট, ২০২৬’ প্রণয়নের কাজ চলছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যপত্রে বলা হয়েছে।

অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের উদ্যোগও রয়েছে। ঋণ আদায় প্রক্রিয়া আধুনিক করা এবং দ্রুত নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরিই এই সংশোধনের লক্ষ্য বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।