Published : 11 May 2026, 09:10 PM
পাঁচ বেসরকারি ব্যাংক একীভূত হওয়ার পর পুরনো শেয়ারধারকদের ফেরার সুযোগ রেখে আইনে যে সংশোধন আনা হয়েছে, তাতে ব্যাংক খাত নিয়ে নতুন ‘শঙ্কা’ দেখছে ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)।
সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে বিএবি নেতারা ব্যাংক খাত নিয়ে বিভিন্ন শঙ্কার কথা তুলে ধরেন।
বিকেলে সভা শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিএবি চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার বলেন, “ব্যাংকিং রেজুলেশনে একটা ঝামেলা আছে, ওইটায় একটু ভয় পেয়ে গেছি। আমরা মানে, ব্যাংকিং রেজল্যুশন আইন ফ্রেমওয়ার্কটাতে একটু ভয় পাচ্ছি। কারণ আগের লোকজন এলে উল্টাপাল্টা শুরু হয়ে যাবে। এগুলো আসলে তো দেশের জন্য খুব ভালো হবে না। বাংলাদেশের সাধারণ লোকও জানে যে কারা কারা ব্যাংকের ক্ষতি করছে।”
আর্থিক অনিয়মে ‘জেরবার’ এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক (এফএসআইবিএল), গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল) একীভূত করে গত ডিসেম্বরে গঠন করা হয় ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’।
গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠন করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে আসেন মোস্তাকুর রহমান। এরপর গত এপ্রিলে জাতীয় সংসদে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশকে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’ এ রূপান্তর করার সময় এতে ১৮(ক) ধারা যুক্ত হয়; সেখানে ব্যাংকের সাবেক শেয়ারধারকদের পুনরায় শেয়ার কেনার সুযোগ রাখা হয় কয়েকটি শর্তে।
এ সিদ্ধান্তে পুরনো শেয়ারধারকদের ফের ব্যাংকের মালিকায় আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, এ সিদ্ধান্তের ফলে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গ্রুপের ‘নিয়ন্ত্রণে’ চলে যেতে পারে ব্যাংকিং খাত।
ব্যাংক থেকে ‘লুট’ হওয়া অর্থ পাচার হয়ে গেছে মন্তব্য করে বিএবি চেয়ারম্যান বলেন, “এই ব্যাপারটা সরকারের দেখা উচিত। এটা এমন একটা জিনিস, যারা টাকা পয়সা নিয়ে গেছে ব্যাংক থেকে, তারা তো লুটপাট করে নিয়ে গেছে। এখন তাদের যদি আনা হয়, তাহলে বিরাট সমস্যার সৃষ্টি করবে। সেক্টর সিরিয়াসলি অ্যাফেক্টেড হয়ে যাবে। এটা কালচারালি পাবলিসিটি হয়ে গেছে, সাধারণ মানুষও ব্যাংক লুটপাটের বিষয় জানে। এগুলো দেশের জন্য খুব ভালো হবে না।’’
বিএবির এমন ভয়ের কথার বিপরীতে গভর্নরের প্রতিক্রিয়া কী–সেই প্রশ্নে আব্দুল হাই সরকার বলেন, “তিনি আমাদের কথা মনোযোগ গিয়ে শুনেছেন। উনি বলেছেন, ব্যবস্থা নিচ্ছেন।’’
গভর্নরের সঙ্গে সভায় বিএবি ভাইস-চেয়ারম্যান ও বেসরকারি ইউসিবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান শরীফ জহিরও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, “যে শর্তগুলো (ব্যাংক রেজল্যুশন আইন) দেওয়া হয়েছে উনার (গভর্নর) ধারণা, এটা ফুলফিল করার মত সামর্থ্য থাকবে না। সেটা ফুলফিল করে আসাটা সম্ভব হবে না।’’
বিএবি নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে মন্তব্য করে সংগঠনটির চেয়ারম্যান বলেন, “আইন তো সরকার করবে, কিন্তু আমরা বলতে চাই যে, এগুলো করতে গেলে খুব ভেবে চিন্তা করতে হবে; যাতে যারা এরইমধ্যে এই খাতে আছি, তারা যেন কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।’’

ব্যাংক রেজল্যুশনের সময়ে পুরনোদের ফেরার সুযোগ ছিল না। আইনে পরিণত হওয়ার সময়ে ১৮(ক) ধারা যুক্ত হয়েছে। সে বিষয়ে আব্দুল হাই সরকার বলেন, “এখানে অনেক স্টেক হোল্ডার আছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করলে বাস্তবায়ন সহজ হয়। আমরা খালি অভিযোগ করতে পারি, অন্য কোনো ক্ষমতা নাই আমাদের।
“আমরা বলেছি, এটা তো একীভূত হয়ে আছে। এখানে যদি আবার পরিবর্তন হয় তখন ঝামেলা। এই সমস্ত পলিসি করার সময় সাধারণত স্টেক হোল্ডার যারা, তাদের সঙ্গে আলোচনা করলে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ভালো হয়।”
বন্ধ শিল্প চালু করতে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করতে যাচ্ছে। এত বড় অঙ্কের টাকা ব্যাংক খাত থেকে দেওয়া সম্ভব কি না প্রশ্ন কলে তিনি বলেন, “একেকটা কারখানা একেক কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। কারো ক্রেতা নাই, কারো গ্যাস নাই। এখন শুধু টাকার কারণে বন্ধ হয়ে আছে, তাদের টাকা দিলে খুলতে পারে।”
বিএবি চেয়ারম্যান বলেন, চলতি মূলধন সংকটে থাকা শিল্পগুলো ঋণ সহযোগিতা পাবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন গভর্নর।
এদিকে গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকের পর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিএবি বলেছে, ব্যাংক খাতে বিদ্যমান সংকট মোকাবিলা, কর্মীদের প্রণোদনা কাঠামো বহাল রাখা, প্রস্তাবিত নতুন আইন ও সংস্কার বিষয়ে আলোচনা করতে বিএবি নেতারা গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে ১৫ দফা সুপারিশ তুলে ধরে স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়।
সেখানে বলা হয়, উচ্চ খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন পর্যাপ্ততার চাপ, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীর গতি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার কারণে ব্যাংক খাত বর্তমানে ‘কঠিন সময়’ পার করছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল রাখতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সরকার ও ব্যাংকগুলোর মধ্যে সমন্বিত নীতিগত সহযোগিতা প্রয়োজন।
বৈঠকে ব্যাংক কর্মীদের প্রণোদনা ভাতা অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়ে বিএবি নেতারা বলেন, চাপের মধ্যে থাকা ব্যাংকগুলোতে দক্ষ জনবল ধরে রাখা, কর্মীদের মনোবল বজায় রাখা এবং পুনরুদ্ধার কার্যক্রম গতিশীল করতে প্রণোদনা গুরুত্বপূর্ণ।
পাশাপাশি বন্ধ বা রুগ্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান চালু করতে নতুন করে ঋণ সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারকে গ্যারান্টর (জামিনদার) হওয়ার অনুরোধ করেছে বিএবি।
সংগঠনটি মনে করে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন নীতিগত গ্যারান্টি থাকলে ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি এড়াতে পারবে। তাহলে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো তুলনামূলক দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে এবং বাজারে আস্থা ফিরবে।
এছাড়া প্রস্তাবিত ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন, ব্যাংক রেজল্যুশন কাঠামো, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি, উদ্যোক্তা শেয়ার কাঠামো এবং মূলধন সংগ্রহের সক্ষমতার মত বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে ব্যাংক খাতের সঙ্গে আরও বিস্তৃত আলোচনার দাবি করা হয়।
স্মারকলিপিতে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় পৃথক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন, পুনঃতফসিল করা ঋণে নিয়ন্ত্রক ছাড়, মূলধন সংরক্ষণে কর সুবিধা এবং এসএমই ও কৃষিখাতে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা সম্প্রসারণের প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়েছে।