০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল: আয় বাড়লেও লোকসান প্রায় ৪৭৭ কোটি টাকা, সংসদীয় কমিটিতে হিসাব

চিনিকলগুলোকে ‘বায়ো প্রডাক্ট’ তৈরি করে কীভাবে লাভজনক করা যায়, সে বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল: আয় বাড়লেও লোকসান প্রায় ৪৭৭ কোটি টাকা, সংসদীয় কমিটিতে হিসাব

ফাইল ছবি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 07 Oct 2026, 12:23 AM

Updated : 07 Oct 2026, 12:23 AM

রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর আয় বাড়লেও গত অর্থবছরে লোকসান থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি।

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) দুই অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলে আয় বেড়েছে ৩২৭ কোটি টাকার বেশি। ব্যয় কমেছে প্রায় ২০৯ কোটি টাকা।

এরপরও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে করোত্তর লোকসান হয়েছে প্রায় ৪৭৭ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এই লোকসান ছিল প্রায় ৫৫৫ কোটি টাকা।

সে হিসাবে এক বছরে লোকসান প্রায় ৭৮ কোটি টাকা কমেছে। তবে এই হিসাবে ব্যাংক ঋণের সুদ বাদ দিয়ে হিসাব করলে লোকসান কমেনি। বরং লোকসান প্রায় ২৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে সাড়ে ৪৩ কোটি টাকা হয়েছে।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এই হিসাব উপস্থাপন করা হয়।

জাতীয় সংসদ ভবনে শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি মো. আবুল কালাম।

বৈঠকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দপ্তর ও সংস্থার প্রতিটি কলকারখানার বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে আলোচনা হয়।

বিএসএফআইসির হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চিনিকল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে মোট আয় হয়েছে ১ হাজার ২২২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। মোট ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৫৭৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।

এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ছিল ৮৯৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা। ব্যয় ছিল ১ হাজার ৭৮৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা।

অর্থাৎ এক অর্থবছরের ব্যবধানে আয় প্রায় ৩২৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বেড়েছে। একই সময়ে ব্যয় প্রায় ২০৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা কমেছে।

তারপরও সামগ্রিক হিসাবে লোকসান থেকে বের হতে পারেনি বিএসএফআইসি।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে করপূর্ব লোকসান হয়েছে ৪২৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা। প্রদেয় আয়কর হিসাবের পর লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

আগের অর্থবছরে করপূর্ব লোকসান ছিল প্রায় ৫১৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। করোত্তর লোকসান ছিল প্রায় ৫৫৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা।

সে হিসাবে এক বছরে করপূর্ব লোকসান প্রায় ৯৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা এবং করোত্তর লোকসান প্রায় ৭৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা কমেছে।

দুই অর্থবছরের হিসাবে ব্যাংক ঋণের সুদের বড় অঙ্কও উঠে এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংক ঋণের সুদ ছিল প্রায় ৫৩০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। পরের অর্থবছরে তা কমে প্রায় ৪৩৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা হয়েছে।

অর্থাৎ এক বছরে সুদের অঙ্ক প্রায় ৯৬ কোটি ৯৬ লাখ কমেছে। তবে ব্যাংক ঋণের সুদ বাদ দিয়ে করা করোত্তর হিসাব অন্য চিত্র দেখাচ্ছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই হিসাবে লোকসান ছিল প্রায় ২৫ কোটি ৫ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ ঋণের সুদ বাদ দিলে এক বছরে লোকসান বেড়েছে প্রায় ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব এখনও চূড়ান্ত নিরীক্ষিত নয়। সংসদীয় কমিটির কার্যপত্রে ওই বছরের হিসাবকে ‘অডিট চলমান’ বলা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাবটি ‘অডিটেড’ বা নিরীক্ষিত।

নয় চিনিকলেই লোকসান সাড়ে ৩৪৬ কোটি

বিএসএফআইসির হিসাবে চিনিকলগুলোকে দুই ভাগে দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে নয়টি ‘চালু চিনিকল’। আরও ছয়টির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ‘মাড়াই শুরু হয়নি’।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে চালু নয়টি চিনিকলের মোট আয় ছিল প্রায় ১ হাজার ১৯৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। বিপরীতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪২১ কোটি ৭ লাখ টাকা।

মজুদ সমন্বয় ও প্রদেয় আয়কর হিসাবের পর এসব চিনিকলের করোত্তর লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪৬ কোটি ২৭ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। ব্যাংক ঋণের সুদ বাদ দিলে এই নয় চিনিকলের লোকসান প্রায় ৩৫ কোটি ১ লাখ টাকা।

চালু নয়টি চিনিকলের তালিকায় রয়েছে ঠাকুরগাঁও, রাজশাহী, নর্থ বেঙ্গল, নাটোর, জয়পুরহাট, কেরু অ্যান্ড কোম্পানি, মোবারকগঞ্জ, ফরিদপুর ও জিলবাংলা চিনিকল।

এর মধ্যে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির হিসাব অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির আয় ছিল প্রায় ৫৮০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা এবং ব্যয় প্রায় ৩৫৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। করোত্তর লাভ দেখানো হয়েছে প্রায় ১৬৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ব্যাংক ঋণের সুদ বাদ দিয়ে করা হিসাবে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির লাভ প্রায় ২০৪ কোটি ৪ লাখ টাকা।

মাড়াই শুরু না হওয়া ছয় চিনিকলেও ১২৯ কোটি লোকসান

পঞ্চগড়, সেতাবগঞ্জ, রংপুর, শ্যামপুর, পাবনা ও কুষ্টিয়া চিনিকলকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাবে ‘মাড়াই শুরু হয়নি’ এমন ছয় চিনিকল হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই ছয় চিনিকলের মোট আয় ছিল মাত্র প্রায় ১৬ কোটি ১ লাখ টাকা। অথচ ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৪৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। তাদের করোত্তর লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

এর মধ্যে পঞ্চগড় চিনিকলের আয় প্রায় ৪৬ লাখ টাকার বিপরীতে ব্যয় প্রায় ২৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। করোত্তর লোকসান হয়েছে প্রায় ২৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।

পাবনা চিনিকলের আয় ছিল মাত্র প্রায় ৫২ হাজার টাকা। ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। করোত্তর লোকসান হয়েছে প্রায় ২০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

কুষ্টিয়া চিনিকলের আয় ছিল প্রায় ৪৫ লাখ টাকা। ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। করোত্তর লোকসান প্রায় ২৭ কোটি ১০ লাখ টাকা।

সব মিলিয়ে ১৫টি চিনিকলের আয় ছিল প্রায় ১ হাজার ২১২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৬৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। করোত্তর লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

এর সঙ্গে বিএসএফআইসির অধীন রেনউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানির হিসাব যোগ করে করপোরেশনের সর্বমোট করোত্তর লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

লোকসান কাটাতে ‘বায়ো প্রডাক্টের’ পথ খুঁজতে বলল কমিটি

চিনিকলগুলোর এই আর্থিক পরিস্থিতির মধ্যেই লোকসান কমানোর বিকল্প পথ খুঁজতে বলেছে সংসদীয় কমিটি।

বৈঠকের পর সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, লোকসানে থাকা চিনিকলে উৎপাদিত চিনি ছাড়া অন্যান্য দ্রব্য দিয়ে ‘বায়ো প্রডাক্ট’ তৈরি করে কীভাবে চিনিকলগুলোকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যায়, সে বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়কে আগামী বৈঠকে ওই প্রতিবেদন উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে কমিটি।

প্রথম বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন অগ্রগতিও মঙ্গলবারের বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়। বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি, অর্থ ছাড় ও ব্যয়ের হার এবং বাস্তবায়নের সমস্যার তথ্য কমিটির সামনে তুলে ধরা হয়।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোও পর্যালোচনা করেছে কমিটি। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করা, বাস্তবায়নে গতি বাড়ানো এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের সুপারিশ করা হয়েছে।

বৈঠকে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের অধীন সার কারখানার উৎপাদন ও উৎপাদন সক্ষমতাও পর্যালোচনা করা হয়। নতুন প্রকল্প, বন্ধ সার কারখানা পুনরায় চালু করা, গ্যাস সরবরাহ, কারখানা পরিচালনার সমস্যা এবং সার উৎপাদনের ব্যয় নিয়েও আলোচনা হয়।

সার কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ এবং বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয় সংসদীয় কমিটি।

বৈঠকে অন্যদের মধ্যে ছিলেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, আব্দুস সালাম আজাদ, কাজী রফিকুল ইসলাম, বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া, মনজুর এলাহী, মো. এনামুল হক ও মাসুদ সাঈদী।