২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

ময়দা-চিনির চাপে বাড়ছে রুটির দাম, বিপাকে কম আয়ের মানুষ

ময়দা, চিনিসহ সব উপকরণের দাম বাড়ায় মূল্য সমন্বয়ের কথা বলেছেন ব্যবসায়ীরা।

ময়দা-চিনির চাপে বাড়ছে রুটির দাম, বিপাকে কম আয়ের মানুষ
কাঁচামালের পাশাপাশি বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি, গ্যাস সংকটে খরচ বাড়ার কথা বলে বেকারি পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন ব্যবসায়ীরা, যা শনিবার থেকে কার্যকর হচ্ছে।

বিডিনিউজ২৪

আয়েন উদ্দীন

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 12 Sep 2026, 01:14 AM

Updated : 19 Sep 2026, 02:24 PM

রিকশা ও রিকশাভ্যান চালক, দিনমজুরদের সকাল, দুপুর কিংবা বিকালের ক্ষুধা মেটাতে চায়ের সঙ্গে বনরুটি বা স্লাইস কেকের মতো বেকারি পণ্যই ভরসা, যার দাম বাড়ার ঘোষণা আসছে এবার।

মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদের পূর্ব পাশের কোণায় ফুটপাতের চা দোকানের মালিক ষাটোর্ধ্ব রহমতউল্লাহ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চা দিয়া একটা রুটি চুবাইয়া খায় মানুষজন। সেটাও দাম বাড়বো। সাপ্লাইয়ার বলে গেল শনিবার থেকে বাড়তি দেওয়া লাগবো।”

তিনি বলেন, “প্রতিটা মিনিমাম পাঁচ টাকার নিচে বাড়াইবো না। বাড়লে ঝামেলা দেখা দিবে। খাওয়ার পর বেশি দাম শুনে কথা কাটাকাটি হইবো। আমাদের কাস্টমার কমে যাইবো।”

চকবাজার এলাকা থেকে বেকারি পণ্য কিনে রায়েরবাজারের পাড়া-মহল্লায় ভ্যানে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন রিপন শেখ। বেকারি পণ্যের দাম বাড়বে শুনে তিনিও চিন্তিত।

রায়েরবাজারের বিপরীত পাশে বাগানবাড়ি গলিতে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে কথা হয় তার সঙ্গে। 

রিপন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের সীমিত লাভ। দোকানের চাইতে আমরা একটু কম দামে বিক্রি করি। এখন যে দামে বিক্রি করি, মোটামুটি কিছু থাকে। 

“বেকারিতে দাম বাড়ালে আমাদেরও দামটা বাড়াতে হবে। তখন জনগণ আমাদের কাছ থেকে খাইতে চাইবে না। যার কারণে আমরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হব।”

ভ্রাম্যমাণ এ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, ২০০ টাকা কেজি বা তার কাছাকাছি দরে ড্রাই কেক, বিস্কুটসহ অন্য বেকারি পণ্য বিক্রি করেন তিনি।

“কেজিতে ২০ টাকাও যদি বাড়ায়, কমসে কম আড়াইশ’ টাকা কেজি বিক্রি করতে হবে আমাদের। আমাদের তো ২০/৩০ টাকা লাভ রাখতে হবে। এটাও যদি না থাকে, সারাদিন ঘাম ঝরাইয়া, এই গাড়ি (ভ্যান) নিয়া হাইটা আমাদের কিছুই থাকবে না।”

বেকারি পণ্য তৈরির কাঁচামালের দাম যেন নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়, সরকারের প্রতি সেই আহ্বান রেখে রিপন বলেন, “এই যে আটা, চিনি-এগুলোর দাম বাড়ায়, বেকারির তো কোনো দোষ নাই। সরকার যদি না চাইতো এগুলোর দাম বাড়তো না।” 

বান, পাউরুটি, বিস্কুট ও কনফেকশনারি পণ্যের প্রধান কাঁচামালের মধ্যে রয়েছে ময়দা, ভোজ্যতেল, ডালডা ও চিনি। এসব কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় বেকারি পণ্যের দাম সমন্বয়ের কথা বলছেন এ খাতের ছোট ব্যবসায়ীরা।

রাজধানীর বছিলা এলাকার একটি বেকারির স্বত্বাধিকারী  মনির খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “খরচ অনেক বাড়ছে। সবকিছু আগের চেয়ে ডবল হয়ে গেছে। ময়দার বস্তা কিনতে হয় ৩২০০ টাকা দরে। দুই মাস আগে কিনেছি ২৪০০ টাকায়।”

দাম বাড়ার পাশাপাশি বিক্রি কমার কথা বলেছেন তিনি।

“মানুষ কি করবে। সব কিছুর দাম বাড়ার কারণে বেকারি পণ্যের বেচাকেনাও কমে গেছে। ভাত খাওয়ার পরেই মানুষ অন্য কিছু খাওয়ার চিন্তা করে।”

মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে ৫০ কেজির এক বস্তা ময়দা বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ১০০ টাকায়। যা এক বছর আগে ছিল ২ হাজার ৩০০ টাকা।

এক বছরের ব্যবধানে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) চিনির দাম ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দাম বেড়ে হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। 

বাজারে প্রতি ১৮৫ কেজির সয়াবিন তেলের ড্রামের দাম এক বছরের ব্যবধানে ৫ হাজার টাকা বেড়ে ৩৪ হাজার ৫০০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। 

১৬ কেজির এক কার্টন ডালডার দাম ৮০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা।

এছাড়া ইস্টসহ বেকারি পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত অন্য উপকরণের দামও বেড়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট। একদিকে কাঁচামালের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে উৎপাদনে প্রয়োজনীয় জ্বালানিরও সংকট তৈরি হয়েছে। 

পাইপলাইনের গ্যাসের বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হচ্ছে অনেক বেকারিকে। তাতে বাড়ছে উৎপাদন খরচ।

এ পরিস্থিতিতে পণ্যের দাম সমন্বয়ের ঘোষণা দিয়েছে বেকারি পণ্যের ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি। 

শনিবার থেকে নতুন দামে বনরুটি ও বিস্কুট বিক্রি শুরু হবে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

তবে সব পণ্যে একইভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে না। কম দামের কিছু পণ্যের ওজন কমানো হবে, আর তুলনামূলক বেশি দামের পণ্যের দাম বাড়ানো হবে।

২০২২ সালের জুনে রুটি, বিস্কুট, কেকসহ নিত্যদিনের বেকারি পণ্যের দাম ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। সেটিকে বেকারি পণ্যের দামের ‘ইতিহাসে সর্বোচ্চ’ বৃদ্ধি বলা হয়েছিল।

এবার কত শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানো হচ্ছে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন, বড় কোনো মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা কোথাও বলিনি ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াবো। ব্যবসায়িক বাস্তবতায় সব মালিকরা একত্রিত হয়ে একটু সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

রাজধানী ঢাকার নারিন্দা এলাকায় কয়েক পুরুষ ধরে বেকারি পণ্যের ব্যবসায় যুক্ত জালাল ‍উদ্দিনের পরিবার।

তিনি বলেন, ৪০ বা ৫০ টাকা দামের পণ্যের দাম বাড়বে। এগুলোতে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বাড়বে। ১২ টাকার কেক হবে ১৫ টাকা।

“আমরা শুধু একটা আইটেমে (বনরুটি) ওজন কমাচ্ছি। এগুলো খেটে খাওয়া মানুষ খায়—তাই দাম ১০ টাকাই রাখছি। 

“দাম ঠিক থাকলেও আগে যেখানে ৪০০ গ্রাম ওজনের যে পাউরুটি মিলত, তা কমে ৩২০ থেকে ৩৫০ গ্রামে নেমে আসবে।” 

কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে দাম সমন্বয় না করে উপায় নেই দাবি করে জালাল উদ্দিন বলেন, “গত ছয় মাসের ভেতরে ময়দা ২৫শ’ টাকা থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা হয়ে গেছে। আজকেও তিনশ’ টাকা বস্তায় বেড়েছে। চিনির দাম বেড়েছে। তেলের দাম সরকার ঘোষণা দিয়েই বাড়িয়েছে।” 

সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ক্ষুদ্র বেকারি রয়েছে প্রায় ৭ হাজার। এর মধ্যে রাজধানীতে সাত শতাধিক। এসব বেকারির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষ জড়িত বলে দাবি সংগঠনটির।

সংগঠনের দীর্ঘদিনের এই সভাপতি বলেন, কাঁচামালের দাম আরেক দফা বাড়লে আর পণ্যের দাম বাড়ানো সম্ভব হবে না।

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

“পাইপলাইনে গ্যাস না থাকায় এলপিজি ব্যবহার করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে ঠিকমতো উৎপাদন করা যাচ্ছে না। শ্রমিকদের বসে থাকতে হচ্ছে। ফলে খরচও বাড়ছে।”

বেকারি মালিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, বেকারি ভেদে ১০ টাকা দামের গোল বনরুটির ওজন এখন ৪০ গ্রাম, ৫ গ্রাম কমানো হবে। এখন ৪০০ গ্রামের ওজনের পাউরুটির দাম ৫০ থেকে ৬০ টাকা। দাম ঠিক থাকলে ৪০০ গ্রাম ওজন কমে ৩২০ থেকে ৩৫০ গ্রামে নেমে আসবে। যদি দাম বাড়ানো হয় তাহলে ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়বে।

শিয়া মসজিদ এলাকার চা দোকানের রহমতউল্লাহর সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, সেখানে ছিলেন রিকশাচালক আমিন।

তিনি বলছিলেন, কয়েক ট্রিপ রিকশা চালানোর পর কিছু খেতে হয়। চায়ের সঙ্গে বনরুটি বা দুই/এক পিস কেক খেয়ে থাকেন।

একবার খেতে যে খরচ হয়, তা তুলে ধরে আমিন বলেন, “এখনই আসে একবারে ৩০/৪০ টাকা। দাম বাড়ালেই সেটা পড়বে ৫০ টাকা। সবকিছুর দাম বাড়াইলে আমরা যামু কৈ? প্যাডে কিছু না দিলে রিকশাই বা চালামু কেমনে?”

মহাখালী এলাকার একটি চায়ের দোকানের স্বত্বাধিকারী মো. মানিক বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোকে অযৌক্তিক বলে মনে করছেন।

বনরুটি ও কেক তৈরির জন্য দরকারি উপকরণের দামের হিসাব দিয়ে তিনি দাবি করেন, ১০ টাকার একটি গোল বনরুটির ওজন ৫০ গ্রাম। বানাতে খরচ পড়ছে আড়াই টাকা, বেকারি ব্যবসায়ীরা বিক্রি করছেন ৫ টাকা। তাদের ৫০ শতাংশ লাভ থাকছে। 

মানিক বলেন, “তাহলে দাম বাড়াতে হবে কেন?”

তবে বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোকে পুরোপুরি অস্বাভাবিক মনে করছেন না কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। এতে যে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়বে সে কথাও বলেছেন তিনি।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাবেক এই মহাপরিচালকের ভাষ্য, বেকারি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রায় প্রতিটি উপকরণের দাম বেড়েছে। ফলে ব্যবসা চালিয়ে রাখতে হলে হয় দাম বাড়াতে হবে, নয়তো উৎপাদন বন্ধ করতে হবে।

“এখন দেখার বিষয় তারা অযৌক্তিকভাবে বাড়াচ্ছে কিনা।”

সফিকুজ্জামানের অভিযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেই। দাম নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে যে যার মতো দাম বাড়াবে, আর তাতে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। আগস্টে তা কমে হয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।

তবে বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে এই পরিসংখ্যানের মিল নেই বলে মনে করেন সাবেক এই আমলা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “পণ্যের দাম বাড়ার কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পণ্যের দাম বাড়াতে হচ্ছে। বাজারে সবকিছুর দাম বাড়তি। চুরি বন্ধ না করে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সবার ওপরে বিলের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। 

কিন্তু বিবিএস তথ্য দিয়েছে মূল্যস্ফীতি কমেছে। বাজারে তার কোনো প্রতিফলন নেই।”

সাবেক সচিব সফিকুজ্জামান বলেন, “আমি যখন সরকারে ছিলাম, আমি নিজেও বিবিএসের ডেটায় আস্থা রাখতাম না।”