০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

ফার্নেস অয়েলে তিক্ত অভিজ্ঞতা: বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানিতে যে ঝুঁকি দেখছে বিপিসি

বিশ্লেষকরা বলছেন, বেসরকারি কোম্পানি মুনাফাকেই গুরুত্ব দেবে। ব্যবসায় লাভ কমে গেলে তারা আমদানি বা সরবরাহের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে। ফলে সংকটের সময় শেষ পর্যন্ত সরকারকেই দায় নিতে হবে।

জেসমিন মলি জেসমিন মলি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 12 Aug 2026, 01:39 AM

Updated : 19 Sep 2026, 02:24 PM

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে নিজেদের ব্যবস্থাপনায় ফার্নেস অয়েল আমদানি করা কিছু বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র তেল আনা বন্ধ রাখে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে তখন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছ থেকে তারা তেল নেয়, তাতে তৈরি হয় বাড়তি চাপ। 

এখন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের বাজার যদি বেসরকারি খাতের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, তাতে একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিপিসি। 

রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থার আশঙ্কা, স্বাভাবিক সময়ে ব্যবসা লাভজনক থাকলে বেসরকারি কোম্পানি তেল আনবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেলে কিংবা ডলারের সংকট হলে তারা আমদানি কমিয়ে দিতে পারে। 

অথচ দেশের পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানির চাহিদা তখনও থাকবে। ওই ঘাটতি পূরণের দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই পড়বে।

সরকার অবশ্য বলছে, বিপিসিকে সরিয়ে দিয়ে বেসরকারি কোম্পানির হাতে পুরো জ্বালানি তেলের বাজার তুলে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানিকে পাশাপাশি রেখে প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য।

বিপিসিবিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, নতুন ব্যবস্থাতেও সরকার তেল আমদানি করবে, পাশাপাশি বেসরকারি খাতও আমদানির সুযোগ পাবে। তবে এ বিষয়ে নীতিমালা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের নীতিমালা তৈরির উদ্যোগের মধ্যে এর সম্ভাব্য সুবিধা ও ঝুঁকি বুঝতে বিপিসির সঙ্গে যোগাযোগ করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

লিখিত জবাবে সম্ভাব্য কিছু সুবিধার কথা স্বীকার করলেও বড় কিছু ঝুঁকির কথাও বলেছে। 

সংস্থাটির মতে, বেসরকারি কোম্পানিকে সরাসরি পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি ও বিপণনের সুযোগ দিলে আপাতদৃষ্টিতে সরবরাহের উৎস বাড়বে এবং সরকারের আমদানি ব্যয় বা অর্থায়নের চাপ কমবে। তবে এর পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা ও জ্বালানি ব্যয় বাড়ার ঝুঁকিও থাকবে।

ফার্নেস অয়েলের অভিজ্ঞতা 

বাংলাদেশে বেসরকারি কোম্পানির জন্য জ্বালানি আমদানির সুযোগ একেবারে নতুন নয়। বিপিসি ও জ্বালানি বিভাগের অনাপত্তি নিয়ে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিজেদের ব্যবহারের জন্য ফার্নেস অয়েল আমদানি করতে পারে।

বিপিসির ভাষ্য, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে এসব কোম্পানির কোনো কোনোটি ফার্নেস অয়েল আমদানি থেকে বিরত থাকে। তখন তারা বিপিসির কাছ থেকে তেল নিতে চাপ তৈরি করে।

এরকম পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সরকার ও বিপিসিকে ভর্তুকি দিয়ে এসব কেন্দ্রে ফার্নেস অয়েল সরবরাহ করতে হয়েছে।

তবে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র কখন নিজেদের ব্যবস্থায় তেল আমদানি করবে আর কখন বিপিসির কাছ থেকে নেবে, সেই সিদ্ধান্ত শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওপর নির্ভর করে না। ব্যবসার শর্ত বদলালেও তাদের সিদ্ধান্ত বদলানোর নজির রয়েছে। 

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিজস্ব ব্যবস্থায় ফার্নেস অয়েল আমদানির সার্ভিস চার্জ ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করে পিডিবি। এরপর বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন-বিপ্পার তৎকালীন সভাপতি কে এম রেজাউল হাসনাত বলেছিলেন, এই হার থাকলে তারা নিজেরা তেল আমদানি না করে বিপিসির কাছ থেকে নেবেন।

বিদ্যুৎ বিভাগও তখন বলেছিল, বেসরকারি কেন্দ্রগুলো নিজেরা আমদানি না করলে বিপিসি তাদের জ্বালানি সরবরাহ করবে।

এরপর ২০২৫ সালের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ফার্নেস অয়েলের চাহিদা ১২ লাখ ৩৯ হাজার ২৩১ টন থেকে বাড়িয়ে ৩৫ লাখ ৫১ হাজার ৪৮ টন করা হয়। 

বিপিসিকে মাসে প্রায় ৫ লাখ টন পর্যন্ত ফার্নেস অয়েল আমদানির প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে হিসাব মেলেনি। ওই বছরের মার্চে পিডিবি বিপিসির কাছ থেকে নেয় মাত্র ৭০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল। 

অথচ এপ্রিলের মাঝামাঝি বিপিসির মজুদাগার প্রায় পূর্ণ হয়ে যায়। এর মধ্যে নতুন তেলের জাহাজও আসছিল। ফলে সময়মত জাহাজ থেকে তেল নামানো না গেলে ডেমারেজ বা জাহাজ আটকে থাকার জরিমানার ঝুঁকি তৈরি হয়।

পিডিবি সংশ্লিষ্টরা তখন বলেছিলেন, সার্ভিস চার্জ কমানোর পর কিছু বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বিপিসির কাছ থেকে তেল নেওয়ার কথা বলেছিল। পরে তাদের অনেকে আবার নিজেদের ব্যবস্থায় আমদানি শুরু করে। ফলে যে চাহিদা ধরে বিপিসি তেল আমদানির প্রস্তুতি নিয়েছিল, বাস্তবে সেই পরিমাণ তেল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নেয়নি। 

এই ঘটনা সরাসরি বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার কারণে আমদানি বন্ধের উদাহরণ নয়। তবে বেসরকারি কোম্পানির বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত বদলালে বিপিসির জাতীয় আমদানি ও মজুদ পরিকল্পনায় কী ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে, এ ঘটনা তা দেখিয়েছে। 

ওই সময় বেসরকারি কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র বিপিসির তেলের মান এবং কেনার শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, নিজেরা আমদানি করলে এলসির মাধ্যমে চার থেকে পাঁচ মাস পরে অর্থ পরিশোধের সুযোগ পাওয়া যায়। বিপিসির কাছ থেকে তেল কিনলে তাৎক্ষণিক অর্থ দিতে হয়।

ওই অভিজ্ঞতাই নতুন নীতিমালার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনছে। আর তা হল, পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির সুযোগ বেসরকারি খাতের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলে ব্যবসার প্রতিকূল সময়েও তাদের আমদানি ও সরবরাহ অব্যাহত রাখার বাধ্যবাধকতা থাকবে কি না।

বিপিসি আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার পাশাপাশি ডলার সংকটকেও ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। এর আগেও এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। 

২০২২ সালে বিদেশি মুদ্রার সংকটের মধ্যে বেসরকারি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর তেল আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। পিডিবির কাছে বিল বকেয়া থাকায় কয়েকটি কোম্পানির ব্যাংকঋণ পরিশোধ এবং নতুন এলসি খুলতে সমস্যা হচ্ছিল। 

কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রয়োজন অনুযায়ী ফার্নেস অয়েল আনতে না পারায় তাদের মজুদ কমে গিয়েছিল। বিপ্পাও তখন ফার্নেস অয়েলের মজুদ কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছিল।

বিপিসির আশঙ্কা, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে বা দেশে ডলারের সরবরাহে সংকট হলে বেসরকারি আমদানিকারকের একই ধরনের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত পুরো জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে বেসরকারি কোম্পানি তেল আমদানি করলেই যে খরচ বেশি হবে, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তেমনও নয়। 

২০২৫ সালের অক্টোবরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিজেদের ব্যবস্থায় আনা ফার্নেস অয়েলের ব্যয় ছিল গড়ে প্রায় ৭০ টাকা লিটার। একই সময়ে বিপিসির কাছ থেকে পিডিবিকে ফার্নেস অয়েল নিতে হচ্ছিল ৮৬ টাকা লিটার দরে।

মন্ত্রী বলছেন, সরকারও থাকবে

জ্বালানিমন্ত্রী টুকু এ উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় বাজার বেসরকারি খাতের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা হিসেবে দেখতে রাজি নন। 

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সরকার এমন একটি ব্যবস্থা করার কথা ভাবছে যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি কোম্পানিও তেল আমদানি ও বিক্রি করবে। সরকার নিজে তেল আনা বন্ধ করবে না।

ইস্টার্ন রিফাইনারি

ইস্টার্ন রিফাইনারি

ভারতের উদাহরণ দিয়ে টুকু বলেন, সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত ইন্ডিয়ান অয়েলের পাশাপাশি বেসরকারি রিলায়েন্সও জ্বালানি ব্যবসায় রয়েছে। 

ফার্নেস অয়েলের অভিজ্ঞতার কথা তুললে মন্ত্রী বলেন, নতুন ব্যবস্থায় সরকার বেসরকারি কোম্পানিকে এমনিতেই তেল দিয়ে দেবে, বিষয়টি সে রকম হবে না। সেই ব্যবস্থা কী হবে, তা ঠিক করা হবে নীতিমালায়।

নীতিমালা চূড়ান্ত হয়েছে কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, “ফাইনাল হয় নাই।” 

কবে নাগাদ তা কার্যকর হতে পারে, সেই প্রশ্নে তিনি বলেন, “কাজ চলছে।”

প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরবরাহ নিয়েও শঙ্কা

বিপিসির উদ্বেগ শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানি কমে যাওয়ার আশঙ্কার মধ্যে সীমিত নয়।

তাদের আশঙ্কা, বেসরকারি কোম্পানি বেশি লাভের বাজারকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। ঢাকা, চট্টগ্রাম বা বড় শিল্পাঞ্চলে তুলনামূলক কম খরচে বেশি তেল বিক্রি করা সম্ভব। কিন্তু প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় জ্বালানি পৌঁছাতে খরচ হয় বেশি।

বিপিসি মনে করছে, বেসরকারি কোম্পানি কম লাভের এলাকায় সরবরাহ কমিয়ে দিতে পারে। বর্তমান ব্যবস্থায় বিপিসি এবং এর অধীন তেল বিপণন কোম্পানিগুলোকে সারাদেশে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা ধরে রাখতে হয়। বেসরকারি আমদানিকারকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বাধ্যবাধকতা থাকবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

বিপিসি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ ও মজুদের ঝুঁকিও দেখছে। তাদের আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার আভাস পেলে বেশি মুনাফার জন্য তেল ধরে রাখার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। 

সরকারের সঙ্গে নীতিগত বিরোধ তৈরি হলেও কোনো কোম্পানি সরবরাহ কমিয়ে বাজারে চাপ তৈরি করতে পারে।

বিপিসির সক্ষমতা কমে গেলে কী হবে

বাজারের বড় অংশ বেসরকারি কোম্পানির কাছে গেলে বিপিসির নিজস্ব সক্ষমতার ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। দেশের বার্ষিক জ্বালানি চাহিদা ধরে বিপিসি আমদানি পরিকল্পনা করে। সেই হিসাবে মজুদাগার, জনবল এবং পরিবহন ব্যবস্থা ধরে রাখে। 

বেসরকারি কোম্পানি বাজারের বড় অংশ নিলে বিপিসির ব্যবসা কমবে। তার সঙ্গে সরকারি অবকাঠামো ও জনবলের প্রয়োজনও কমে যেতে পারে। 

কিন্তু বড় কোনো আন্তর্জাতিক সংকটে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আমদানি কমিয়ে দিলে ঘাটতি পূরণের দায়িত্ব আবার বিপিসির ওপর আসতে পারে।

বিপিসির আশঙ্কা, এর আগেই সরকারি সক্ষমতা কমিয়ে ফেললে তখন স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় তেল এনে সরবরাহ করা কঠিন হবে।

সংস্থাটি পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েলের ব্যবসার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে।

জনস্বার্থের সুরক্ষা কীভাবে হবে?

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার আগে বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো থাকা জরুরি। 

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো যথেষ্ট কার্যকর না হলে বেসরকারি কোম্পানিগুলো সংকটের সময় সরবরাহ কমিয়ে মুনাফা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। বিপিসি ফার্নেস অয়েল আমদানির ক্ষেত্রে যে অভিজ্ঞতার কথা বলেছে, সেটিকেও এই ঝুঁকির একটি উদাহরণ হিসেবে দেখাচ্ছেন তিনি।

তার মতে, বাজারে কয়েকটি বড় কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ তৈরি হলে ‘অলিগোপলি’ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তখন সংকট বা সরবরাহ ঘাটতির সুযোগ নিয়ে তারা মুনাফা বাড়াতে পারে এবং বাজারে সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

শামসুল আলম বলেন, “জ্বালানির মত কৌশলগত পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। তাই সরকারি ব্যবস্থার দুর্বলতা থাকলে সেটি শক্তিশালী করার বদলে বাজারের বড় অংশ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া সমাধান নয়।”

বেসরকারি কোম্পানিকে বাজারে আনার আগে সরকারের নিয়ন্ত্রণ, মূল্য তদারকি এবং সংকটের সময় বাধ্যতামূলক সরবরাহ নিশ্চিত করার সক্ষমতা শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি। 

প্রস্তাবিত নীতিমালার আইনি দিক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ক্যাবের এই জ্বালানি উপদেষ্টা। সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের ভূমিকার যে ধারণা রয়েছে, তার সঙ্গে জ্বালানি খাতের এ ধরনের বেসরকারিকরণ সাংঘর্ষিক কি না, সেই বিতর্কের নিষ্পত্তি হওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু মনে করেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দিলে প্রথম দিকে সরবরাহের উৎস বাড়ার সুবিধা দেখা যেতে পারে। তবে কয়েকটি বড় কোম্পানি বাজারের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণে নিলে পরে সরকারের ওপর চাপ তৈরির ঝুঁকি থাকবে।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চিনি ও এলপিজির বাজারে বেসরকারি কোম্পানির ভূমিকার অভিজ্ঞতা থেকে এই ঝুঁকি দেখা যায়। কয়েকটি কোম্পানি বাজারের বড় অংশ দখলে নিলে তারা একসঙ্গে দাম বাড়ানোর অবস্থানে যেতে পারে।”

জ্বালানিমন্ত্রী কয়েকটি কোম্পানিকে আমদানির সুযোগ দিয়ে প্রতিযোগিতা তৈরির যে কথা বলেছেন, তার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন ঋতু। 

তার মতে, শুধু একাধিক কোম্পানিকে লাইসেন্স দিলেই প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত হয় না। বাজারের বড় অংশ অল্প কয়েকটি কোম্পানির হাতে চলে গেলে মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্ষমতা কমতে পারে।

বিপিসির ফার্নেস অয়েল আমদানির অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বেসরকারি কোম্পানি মুনাফাকেই গুরুত্ব দেবে। ব্যবসায় লাভ কমে গেলে তারা আমদানি বা সরবরাহের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে। ফলে সংকটের সময় শেষ পর্যন্ত সরকারকেই সরবরাহ নিশ্চিত করতে হতে পারে।

রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি অবকাঠামোর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই অর্থনীতিবিদ। 

ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের পরিকল্পনার কথা তুলে তিনি বলেন, দেশে পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ চলার মধ্যে বড় পরিমাণ পরিশোধিত তেল সরাসরি বেসরকারি খাতে আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে রাষ্ট্রায়ত্ত পরিশোধন সক্ষমতার বাজার ও আর্থিক সম্ভাবনার ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।

বর্তমান আইনি কাঠামোর বিষয়ে ঋতুর মত হল, বেসরকারি কোম্পানিকে সরাসরি পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি ও বিপণনের যে সুযোগ দেওয়ার আলোচনা চলছে, সেটি বিদ্যমান ব্যবস্থায় স্পষ্টভাবে নেই বলেই নতুন নীতিমালা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, “রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের মূল দায়িত্ব জনস্বার্থ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এসব প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনে লোকসান নিয়েও সরবরাহ ধরে রাখতে পারে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই ধরনের দায় নিশ্চিত না করে বাজারের বড় অংশ তাদের হাতে দিলে তা জনস্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।”

বসুন্ধরার আবেদন দিয়ে আলোচনা সামনে

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি ও বিপণনের সুযোগ দেওয়ার আলোচনা নতুন করে সামনে আসে আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপের একটি আবেদনের পর।

বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড ২৪ মে সরকারের কাছে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও ফার্নেস অয়েল সরাসরি আমদানি এবং নিজেদের ব্যবস্থায় বাজারজাত করার অনুমতি চায়। 

ওই কোম্পানি বছরে ১৫ লাখ থেকে ২০ লাখ টন ডিজেল আমদানির প্রস্তাব দিয়েছে। এর সঙ্গে ২ লাখ টন অকটেন, দেড় লাখ টন পেট্রোল এবং ৮ লাখ থেকে ১০ লাখ টন ফার্নেস অয়েল আমদানির সুযোগ চেয়েছে। 

সর্বোচ্চ পরিমাণ ধরে হিসাব করলে বছরে ৩৩ লাখ ৫০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি ও বিপণনের অনুমতি চেয়েছে বসুন্ধরা।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৭৪ লাখ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি প্রায় ৪৬ লাখ ১০ হাজার টন পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করেছে। 

সেই হিসাবে বসুন্ধরার চাওয়া সর্বোচ্চ পরিমাণ বর্তমান বার্ষিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৪৫ শতাংশের সমান।

বসুন্ধরার আবেদনটি পরীক্ষা করতে ১৪ জুলাই ১১ সদস্যের একটি কমিটি করে বিপিসি। কমিটিকে আবেদনটির আইনি দিক ও আমদানির পরিমাণের পাশাপাশি সংরক্ষণ ও বিতরণ সক্ষমতা দেখতে বলা হয়।

পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার বাজার হিস্যা, রাজস্ব এবং ব্যবসার ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও ছিল তাদের পর্যালোচনার বিষয়। জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহের উৎসে বৈচিত্র্য এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার থাকবে কি না, সেটিও দেখতে বলা হয়েছিল।

গত ৬ অগাস্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বিপিসিকে ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়া করতে বলে। ১০ অগাস্টের মধ্যে তা জ্বালানি বিভাগে পাঠানোর নির্দেশ ছিল।

তবে সোমবার বিপিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে বলে তিনি শোনেননি। তার জানা মতে, খসড়াও তখন পর্যন্ত প্রস্তুত হয়নি।