সিকদার গ্রুপের ‘পাচার অর্থ’ উদ্ধারে ‘আগাম টাকা চায়’ রিকভারি এজেন্ট
প্রথম ধাপে ৫০ কোটি ডলার অর্থ দেশে ফেরাতে রিকভারি এজেন্টের রোডম্যাপ নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈঠক।
আলোচিত ব্যবসায়িক গোষ্ঠী সিকদার গ্রুপের কর্ণধারদের ‘পাচার করা’ অর্থ উদ্ধার ও ফেরত আনার বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে ১১ ব্যাংকের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।
ব্ঠৈকে এ ব্যবসায়িক পরিবারের সদস্যদের পাঠানো অর্থ উদ্ধারে কাজ শুরু করা ‘রিকভারি এজেন্ট‘আরওয়ান (আর১) কনসোর্টিয়ামের আগাম অর্থ চাওয়া নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা।
একই সঙ্গে অর্থ উদ্ধারের খরচ ব্যাংকগুলো কীভাবে বহন করবে সেই আনুপাতিক হার ঠিক করা নিয়েও ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যানদের সঙ্গে কথা বলেছেন গভর্নর। অপরদিকে অর্থ উদ্ধার হলে কারা কতটুকু পাবে সেটিও ছিল আলোচনার তালিকায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, এসব বিষয় ব্যাংকগুলোকে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সমাধান করতে বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়ার সঙ্গে ১১ ব্যাংকের সংশ্লিষ্টতা থাকায় তাদের নিয়ে বৈঠকটি করার কথা বলেন তিনি।
এ নিয়ে আরও বৈঠক করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘অর্থ ফেরত আনতেতো একটা খরচ বহন করতে হবে ব্যাংকগুলোকে। বিদেশি রিকভারি এজেন্ট এজন্য একটি রোডম্যাপ দিয়েছে। রোডম্যাপটি জানানো হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। অর্থ ফেরত আনার খরচ কোন ব্যাংক কতটুকু বহন করবে, কীভাবে করবে তা নির্ধারণ করতে আলোচনা করা হয়।
“রিকভারি এজেন্ট যে রোডম্যাপ দিয়েছে, তার সঙ্গে ব্যাংকগুলো একমত কি না, তা জানানো হয়। দ্রুত তাদের কাছ থেকে মতামত চাওয়া হয়েছে। চাইলে তার এর বাইরেও মতামত দিতে পারবে।’’
বৈঠকে জানানো হয়, এককভাবে সিকদার গ্রুপ ৮ হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে। আইএফআইসি ব্যাংক থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে গিয়েছে ৩০ কোটি ডলার।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের প্রভাবশালী সিকদার গ্রুপের মালিকরা এক বিলিয়ন ডলার পাচার করেছে বলে তথ্য রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। এর মধ্যে চার দেশে ৫০ কোটি ডলার শনাক্ত করতে পেরেছে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এ অর্থ গিয়েছে সরকারি-বেসরকারি ১১টি ব্যাংক থেকে।
এ চার দেশ হচ্ছে- কেম্যান আইল্যান্ড, থাইল্যান্ড, দুবাই ও যুক্তরাষ্ট্র।
এ গ্রুপের অর্থ উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক অ্যাসেট রিকোভারি প্রতিষ্ঠান আরওয়ান (আর১) কাজ করছে। এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একাধিক সভা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ব্যাংকের পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে কাজ শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা, ঋণ আদায় ও মামলাসহ যাবতীয় কার্যক্রম তদারকিতে প্রতিটি গ্রুপের জন্য একটি করে লিড ব্যাংক ঠিক করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থায়নকারী অন্যান্য ব্যাংক তাতে সহযোগী হিসেবে কাজ করছে।
এর মধ্যে আরওয়ান (আর১) কনসোর্টিয়াম কাজ করছে সিকদার গ্রুপের পাচার করা উদ্ধারে। এ অর্থ দেশে ফেরত আনতে লিড ব্যাংক হিসেবে কাজ করছে ন্যাশনাল ব্যাংক, যেটির পর্ষদের নেতৃত্বে এক সময় সিকদার পরিবারের সদস্যরাই ছিলেন।
রোববারের সভায় জানানো হয়, সিকদার গ্রুপের বেলায় রিকভারি প্রতিষ্ঠানটি আগাম অর্থ চেয়ে বেশ কিছু শর্ত দিয়েছে ব্যাংকগুলোকে। এসব শর্ত নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘আরওয়ান আন্তর্জাতিক সংস্থা। তারা অর্থ আনতে সহযোগিতা করবে। এখন প্রশ্নটি হলো, এই অর্থ শনাক্ত ও তা আইনি প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে তো প্রথম দিকে একটি খরচ হবে। সেই খরচটি আরওয়ান আগে চাচ্ছে। আমরা (বাংলাদেশ ব্যাংক) মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আরওয়ানের প্রস্তাব ব্যাংকগুলোকে জানিয়েছি। এখন দেখা যাক ব্যাংক কী বলে।’’
সভায় অংশ নেওয়া এক ব্যাংকের চেয়ারম্যান বলেন, রিকভারি এজেন্ট পাচার হওয়া এক বিলিয়ন ডলারের মত অর্থ শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে ৫০ কোটি ডলার উদ্ধার করে দিতে পারবে কয়েক মাসের মধ্যে। এখন তারা একটি রোডম্যাপ দিয়েছে চুক্তি করতে। এজন্য তারা কিছু আগাম অর্থ চেয়েছে।
রোডম্যাপে আরওয়ান বলেছে, তাদের সঙ্গে চুক্তি করার পাঁচ বছরের মধ্যে তারা ওই ৫০ কোটি উদ্ধার করে দিতে পারবে। এজন্য তাদের সাড়ে ১২ কোটি ডলার দিতে হবে।
অর্থ উদ্ধারের রোডম্যাপে একমত হলেও আগাম অর্থ ও একসঙ্গে সাড়ে ১২ কোটি ডলার নেওয়ার প্রস্তাবে একমত হয়নি কোনো ব্যাংক।
বৈঠকে গভর্নর এ বিষয়ে তাদের দ্রুত মত দিতে বলেছেন।
চলতি মাসের মধ্যেই রিকভারি এজেন্টের সঙ্গে চুক্তি করতে বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি মাসের মধ্যে চুক্তিতে একমত হলেও আগাম অর্থ ও একসঙ্গে সব কমিশন দিতে রাজি হয়নি রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক।
ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘উদ্যোগটি ভালো। আমি রোডম্যাপটি ভালো মনে করছি। তারা অর্থ উদ্ধার করে দিলে তারপর কমিশন কেটে নিতে পারবে। অর্থ উদ্ধার না করলেতো কোনো টাকা দিতে পারব না।’’
বেসরকারি আরেকটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান বলেন, ‘‘আমি বলেছি, যত টাকা উদ্ধার হবে ততোটুকু কমিশন পাবে রিকভারি এজেন্ট। এখন যদি ৫০ কোটি ডলারের মধ্যে আগাম সাড়ে ১২ কোটি ডলার কেটে নিয়ে পরের অর্থ উদ্ধার না হলে কীভাবে সংস্থাটিকে ধরবো।’’
এর আগে ঢাকার আদালতে সিকদার পরিবারের সম্পদ থাইল্যান্ডে পাওয়ার তথ্য উপস্থাপন করেছিল বিএফআইইউ ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পরে দুদকের আবেদনে সিকদার পরিবারের সন্তানদের নামে থাকা সাত কোম্পানির বিনিয়োগ অবরুদ্ধ করার আদেশ দেয় আদালত। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ সাব্বির ফয়েজ ওই আদেশ দেন।
ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত জয়নুল হক সিকদারের তিন সন্তান প্রয়াত রন হক সিকদার, রিক হক সিকদার ও সাবেক সংসদ সদস্য পারভীন হক সিকদারের এই সাত কোম্পানিতে থাকা বিনিয়োগের পরিমাণ হচ্ছে ৩৫ কোটি ৩০ লাখ থাই বাথ (প্রায় ১৩৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা)।
কোম্পানিগুলো হলো, কেওআই রেস্টুরেন্ট কোম্পানি লিমিটেড, সিকদার গ্রুপ লিমিটেডের রিসোর্ট, সিকদার হোল্ডিং লিমিটেড, আর অ্যান্ড আর রেস্টুরেন্ট, জিরানা কোম্পানি লিমিটেড, জেআর আর্কিটেক্ট ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি ও সিকদার অ্যান্ড গ্যারেট ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড।
জয়নুল হক সিকদার ছিলেন ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুবাইতে তার মৃত্যু হলে ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান হন তার স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার, যিনি চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে মারা যান।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ভেঙে দেওয়া হলে সিকদার পরিবার মুক্ত হয় ব্যাংকটি।
২০০৯ সাল থেকে ক্রমেই বড় হওয়া সিকদার গ্রুপের বিনিয়োগ রয়েছে ব্যাংক, বিমা, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, নির্মাণ, হোটেল, পর্যটন, এভিয়েশনসহ নানা খাতে। এক পর্যায়ে হঠাৎ করে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ শুরু করে গ্রুপটি। পরে তা গ্রুপটির সবচেয়ে বিনিয়োগে পরিণত হয়।
