০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

নৌপরিবহন মন্ত্রী ও ‘বিশ্বশ্রেষ্ঠ বিনয়ী’ উপাধি

এইচ এম মহসীন

Published : 04 Nov 2012, 12:03 PM

Updated : 24 Jun 2022, 12:00 AM

গত ২২ অক্টোবর আরটিভির স্টুডিওতে সরাসরি সম্প্রচারিত টক শো 'আওয়ার ডেমোক্রেসি' অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ও বিএনপির নেতা রফিকুল ইসলাম মিয়ার বাকযুদ্ধ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠানের সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিল। এ ঘটনা নিয়ে প্রথম আলো, বিডি নিউজ ২৪ সহ অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো তাৎক্ষনিক খবর প্রকাশ করেছিল এবং এটি একটি মুখরোচক আলোচনার বিষয়বস্তুও হয়ে উঠেছিল। আমি ভেবেছিলাম যে এই ব্লগের কেউ না কেউ এ বিষয়টি নিয়ে লিখবেন এবং আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের এহেন বিনয়ী (?) আচরনের পক্ষে বিপক্ষে আলোচনার ঝড় উঠে যাবে। ঘটনার কয়েকদিন পরেও যখন এবিষয়ে তেমন কোনো লেখা দেখলাম না, ভাবলাম যে, ক্ষমতাসীন একজন মন্ত্রীর সঙ্গে 'বেয়াদবি'র 'শাস্তি' হিসেবে মন্ত্রী মহোদয় একজন সাবেক মন্ত্রীর চোখ তুলে নিতে চাইবেন এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও কাঙ্খিত ঘটনা; অতএব আলোচনার আর কি দরকার!

আমরা সাধারন মানুষেরা রফিকুল ইসলাম মিয়াকে দেয়া 'উচিত শিক্ষাকে' স্বাভাবিক ভাবে নিয়ে চুপচাপ থাকলেও, নৌ পরিবহন মন্ত্রী নিজে কিন্তু এই ঘটনায় মোটেই সন্তুষ্ট নন। কারণ, মন্ত্রী হিসেবে তার 'বীরোচিত' কর্মের পরেও জনগণ তাকে বাহবা না দিয়ে চুপচাপ করে আছে কেন? (ধারণা করছি তার দলের মধ্য থেকে তিনি এরই মধ্যে অনেক প্রশংসা পেয়েছেন)। তিনি হয়তো ভাবছেন যে আমজনতা নিশ্চয়ই তার গালিগালাজ ও হুমকি দেয়াকে সমর্থন করেনি। তাই মিডিয়া ও জনসাধারণের কাছে রফিকুল ইসলাম মিয়াকে চোখ তুলে নিতে চাওয়ার হুমকি দেয়া ও হারামজাদা বলে গালিগালাজ করাকে 'জায়েজ' প্রমাণ করার জন্য তিনি বিভিন্ন সময়ে যুক্তি দিয়েছেন।

গত সপ্তাহে এক অনুষ্ঠানে নৌমন্ত্রী বলেছেন যে, বিতর্কের এক পর্যায়ে রফিকুল ইসলাম যখন 'স্টপ ইট' বলেছেন, তখন তিনি শুনেছেন, 'স্টুপিড'। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, একজন মন্ত্রীকে কেউ স্টুপিড বলবে এটি চুপ করে হজম করার মতো না। অতএব এই চরম বেয়াদবির জবাবে হারামজাদা বলা বা চোখ তুলে নিতে চাওয়া নিশ্চয়ই যথার্থ!

সর্বশেষ ঘটনায় তিনি রফিকুল ইসলাম মিয়াকে রাজাকার হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন এবং তার বক্তব্যের সপক্ষে অকাট্য(!) (কুমিল্লা থেকে পাঠানো একজনের চিঠি) প্রমাণও দিয়েছেন। এরপরে আর নিশ্চয়ই আর কোনো কথা থাকেনা! একজন রাজাকারকে নিশ্চয়ই যেভাবে ইচ্ছে হেনস্তা করা যাবে, কারণ সেতো মানুষ নয়, রাজাকার!

এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এক পুলিশের একটি মন্তব্য মনে পড়ে গেল। হাইওয়েতো দুর্ঘটনার কারণে আমার গাড়ি চলাচলের অযোগ্য হওয়ায়, পুলিশ অফিসার আমাকে নিকটস্থ গ্যাস স্টেশন পর্যন্ত রাইড দিলেন। গাড়ির পেছনের সিটে বসে যখন সিট বেল্ট লাগাতে গেলাম দেখি কাজ করে না। পুলিশ ভদ্রলোককে সিট বেল্টের কথা জানালে সে বলল, পেছনে সাধারণত অপরাধীরা বসে তো, তাই সিট বেল্টের ব্যাপারে অত খেয়াল করেনি। ভাবখানা এমন যে অপরাধীদের আবার জীবনের নিরাপত্তা কী!

তাইতো! রাজাকারের আবার মানবিধাকার কী! রফিকুল ইসলাম মিয়াকে নৌমন্ত্রী যখন রাজাকার প্রমাণ করেই ফেলেছেন, তার চোখ তুলে নেয়াতো আর দোষের কিছু নয়!

একজন প্রমাণিত (!) রাজাকারের চোখ তুলে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করা বা নাক পর্যন্ত ঘুষি নিয়ে যাওয়ার পুরস্কার হিসেবে সরকার শাজাহান খানকে কিভাবে সম্মানিত করবে কে জানে! কিন্তু সৈয়দ আবুল হোসেন যেভাবে 'দেশপ্রেমিক' উপাধি পেয়েছেন, সেভাবে শাজাহান খান 'বিশ্বশ্রেষ্ঠ বিনয়ী' খেতাবে ভূষিত হলে কারও বিস্মিত হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ আছে বলে বোধ করি না।