রাড্ডার স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাংচুর: খোয়া গেছে টিকার তথ্য, যন্ত্রপাতি হারিয়ে বিপাকে কর্মীরা
“মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে, দেখা যাক কতদিন লাগে,” বলেন কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার।
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে বেসরকারি মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় শিশুদের টিকা ও নারীদের স্বাস্থ্যসেবার তথ্য এবং যন্ত্রপাতি খোয়া যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সেখানকার কর্মীরা।
বুধবার পঞ্চম দিনের মতো দুটি কক্ষে সেবা কার্যক্রম চালিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে গুঁড়িয়ে দেওয়া দেয়াল নির্মাণ ও কক্ষ সংস্কারের কাজ চলছে।
এর আগে শনিবার ও রোববার সেন্টারের বাইরে সড়কের পাশে ত্রিপল টানিয়ে টিকাদান কার্যক্রম চালানো হয়েছিল। তবে সোমবার ও মঙ্গলবার কিছুটা সংস্কার করে দুটি কক্ষ সেবা দেওয়ার উপযোগী করা হয়েছে।
বুধবার সরেজমিনে কেন্দ্রটি ঘুরে দেখা যায়, রাড্ডার স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মূল ভবনের ২ নম্বর কক্ষে কয়েকজন কর্মী বসে বাচ্চাদের হামের বিশেষ ক্যাম্পেইনের পাশাপাশি রুটিন টিকা দিচ্ছেন।
পাশের কক্ষে দুজন চিকিৎসক এবং একজন স্বাস্থ্যকর্মী গর্ভবতী, প্রসূতি ও নারীদের পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিচ্ছেন।
এ দুটি কক্ষই পর্দা এবং ফ্যান লাগিয়ে বসার উপযোগী করা হয়েছে। বাকি কক্ষগুলোর মধ্যে পুলিশ এবং আনসাররা অবস্থান করছে।
বাইরে টিনের চাল ঠিক করছেন কয়েকজন, ভেতরে-বাইরের ভাঙ্গা দেয়ালগুলো নতুন করে নির্মাণের কাজ করছেন আরও কয়েকজন। এরই মধ্যে একাধিক কক্ষের জানালার গ্রিলও লাগানো হয়েছে।
বিএনপি এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা এসব কাজ দেখাশোনা করছেন।
তবে এখনো ওয়াশরুম মেরামত এবং পানির লাইন মেরামত কাজ শেষ হয়নি। নতুন একটি পানির ট্যাংক নিয়ে আসা হয়েছে।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর গভীররাতে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে সংস্থাটির কার্যালয়ের একটি টিনশেড ও তিনটি সেমিপাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। আর পাকা ভবনের আল্ট্রাসোনো কক্ষ, টিকা কক্ষ, ল্যাবরেটরিসহ পাঁচটি কক্ষের জানালা-দরজা ভেঙে ফেলা হয়।
ভবনটি থেকে সব ধরনের আসবাবপত্র, ওষুধসামগ্রী, আল্ট্রাসোনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্রিজ, এসি, আলমারি নিয়ে যায় হামলাকারীরা।
সব মিলিয়ে পুরো স্থাপনাটির কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
হামলাকারীরা ভাঙচুর ও লুটপাটের পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লি.’ এর সাইনবোর্ড লাগিয়ে চলে যান। এ ঘটনায় শাহ আলী থানায় করা মামলায় স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াসহ ২০০-২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
টিকার নথি হারিয়ে বিপাকে কর্মীরা
বুধবার দুপুর পর্যন্ত ৫০ জনের বেশি বাচ্চাকে হামের টিকা এবং ১০ জনের বেশি নারীকে স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার তথ্য দিয়েছেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির কর্মীরা। এছাড়া রুটিন টিকা নিতে কয়েকজন এসেছে।
কর্মীরা বলছেন, শুদের টিকার তথ্য এবং ট্যাব হারিয়ে যাওয়ায় কার্যক্রম পরিচালনায় কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।
কেন্দ্রটির ক্লিনিক ইনচার্জ ডা. শাহনাজ ইসলামী বলেন, “আমাদের কাছে টিকা নেওয়া বাচ্চাদের তথ্য ছিল। তাদের নাম, পরিবারের ঠিকানা ছিল, কিন্তু সবগুলো হারিয়ে গেছে। এখন কেউ আসলে আমরা আর চেক করতে পারছি না। অভিভাবকদের কথা শুনেই টিকা দিতে হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “রুটিন বিভিন্ন টিকার ক্ষেত্রে আমরা সময় অনুসারে কেউ না আসলে কল করতাম। সেখানে যোগাযোগ সম্ভব না হলে নথি ধরে তার বাসায় গিয়ে টিকার কথা বলা হয়। কিন্তু আমাদের দীর্ঘদিনের এসব তথ্য আর কিছুই নেই।”
কেন্দ্রের ইনচার্জ বলেন, “শুধু টিকা নয়, গর্ভবতী নারী, স্বাভাবিক নারীদের প্রজননের বিভিন্ন সময়ের পরামর্শ, জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন ধরনের ইঞ্জেকশনের মেয়াদ অনুসারে সেটা নিতে হয়। আমরা এগুলার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাদের কল করতাম, কিন্তু এখন সেসব কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না।”
তিনি বলেন, “নারীদের গর্ভবস্থার বিভিন্ন পরীক্ষা এখন করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ কোনো যন্ত্রপাতি নেই। আবার পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন সামগ্রী বিতরণ করা হতো, সেগুলো নাই। তাই প্রাথমিক সেবার বাইরে আমরা কিছু করতে পারছি না।”
আমিন বাজার থেকে এসেছেন রমজান আলী এবং তার স্ত্রী। মেয়ে আয়েশা আক্তারকে টিকা দিতে নিয়ে এসেছেন তারা। রমজান বলেন, “আজ আসার পর হুট করে কিছু বুঝতে ছিলাম না। এখানে প্রবেশ করেই দেখি সব ভাঙ্গা, অনেক লোক। কিন্তু পাশে আরেকজনকে দেখে ভেতরে আসলাম।
“মেয়েকে টিকা দিতে পেরেছি। তবে এমন অবস্থা দেখে ভালো লাগেনি।”
রাড্ডার এমসিএইচের মিরপুর-১ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, “আমাদের কেন্দ্রর অবস্থা এখনো খুব সচল হয়নি। এখানে অনেকে এসে সেবা না নিয়েই ফিরে যাচ্ছেন। কারণ পরীক্ষার যন্ত্রপাতি নেই।
“গর্ভবর্তী নারীদের শুধু ওজন আর প্রেসার (রক্তচাপ) মেপেই পরামর্শ দিতে হচ্ছে। কিন্তু তাদের শারীরিক অনেক পরীক্ষার প্রয়োজন পড়ে।”
তিনি বলেন, “টিকার ক্ষেত্রে সব শিশুদের ইউনিক আইডি ছিল, সেটার ট্যাব, খাতার লিখিত নথি হারিয়ে গেছে। এসব ছাড়া কাজ করতে এই প্রতিকূল অবস্থায় অনেক সমস্যা হচ্ছে। কারণ সবকিছু অভিভাবক নির্ভর হচ্ছে।”
মেরামতের কাজ চলছে
ভাংচুরের পর স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সহযোগিতায় রাড্ডার স্বাস্থকেন্দ্রটি সংস্কারের কাজ চলছে। সাত দিন পর সংস্কার শেষে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালযয়েল প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক কেন্দ্রটি উদ্বোধন করার কথা রয়েছে।
বর্তমানে মূল ভবনের পাশের আধাপাকা ছোট ভবন এবং ফাঁকা জায়গার ওপরের চালে টিন লাগানো হচ্ছে। অন্যদিকে ভাঙ্গা দেয়ালগুলো আবার তোলা হচ্ছে।
কাঠমিস্ত্রি তৈয়ব গাজী বলেন, “আমরা আট জন টিন লাগানোর কাজ করছি। একদিনের মধ্যেই উপরের চাল লাগানো শেষ হবে।”
রাজমিস্ত্রী রমজান আলী বলেন, “আমরা ১০ জনের মতো লোক কাজ করছি। আশা করি ১০ দিনের মধ্যে সব ভাঙ্গা অংশ ঠিক করা সম্ভব হবে।”
শাহ আলী থানার বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শামসুল কবির বলেন, “সারাদিন আমাদের বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠের নেতা-কর্মীরা কাজ দেখাশোনা এবং সাহায্য করছে। আশা করি, আগামী ৭ দিনের মধ্যে কেন্দ্রটি আগের মতো অবস্থায় হবে।
তিনি বলেন, “প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক কেন্দ্রটি উদ্বোধন করবেন। কারণ তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে কেন্দ্রের সব সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে।”
রাড্ডার এমসিএইচের মিরপুর-১ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, “মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে, দেখা যাক কতদিন লাগে। এখানের সব কিছু ঠিক হলেই পরিবার পরিকল্পনা থেকে বিভিন্ন সামগ্রী দেবে বলে জানানো হয়েছে।
“মূলত এখানে পরিবেশ, প্রাইভেসি এবং যন্ত্রপাতি আসলেই আমরা আগের মতো সেবা দিতে পারবো।”
