রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র: জরুরি পরিস্থিতির প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার তাগিদ
জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশিকা তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন বিজ্ঞান সচিব আনোয়ার হোসেন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি ও দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার ওপর জোর দিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন।
এ জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়, প্রশিক্ষিত জনবল এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশিকা তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার ঢাকার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) মিলনায়তনে এক কর্মশালায় এসব কথা বলেন বিজ্ঞান সচিব।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) আসন্ন জরুরি প্রস্তুতি পর্যালোচনা মিশন উপলক্ষে এ কর্মশালার আয়োজন করা হয় বলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
আগামী ৮ থেকে ১৮ নভেম্বর বাংলাদেশে আইএইএ-এর ‘ইমার্জেন্সি প্রিপেয়ার্ডনেস রিভিউ’ (ইপিআরইভি) মিশনের কার্যক্রম চলবে। এ মিশন বাংলাদেশের পারমাণবিক জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি পর্যালোচনা করবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়েছে গেল ১১ অক্টোবর।
এর মাধ্যমে এ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আরেক ধাপ অগ্রগতি হল। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের আগে আরও কয়েক ধাপে পরীক্ষা করা হবে।
কর্মশালায় বিজ্ঞান সচিব বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জরুরি পরিস্থিতির সম্ভাবনা অত্যন্ত কম হলেও সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় সর্বোচ্চ সতর্কতা ও প্রস্তুতি রাখতে হবে। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে ‘জেনারেশন থ্রি প্লাস’ প্রযুক্তির আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ‘ইন্টারলক’ ব্যবস্থা রয়েছে। তবে শুধু প্রযুক্তিগত নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে চলবে না।
জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষ জনবল, প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আনোয়ার হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জরুরি প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করতে হবে।
আইএইএ-এর আসন্ন মিশনকে কোনো পরীক্ষা বা উত্তীর্ণ-অনুত্তীর্ণ হওয়ার প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখার আহ্বান জানান তিনি।
তার মতে, এ মিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিদ্যমান প্রস্তুতি মূল্যায়ন, ঘাটতি চিহ্নিত এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সুযোগ তৈরি হবে। ইতোমধ্যে সম্পন্ন স্ব-মূল্যায়নও মিশনের প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।
জরুরি পরিস্থিতিতে কখন ও কীভাবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হবে, জাতীয় পর্যায়ে কীভাবে তথ্য ও নির্দেশনা পৌঁছাবে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরের উদ্ধার ও সাড়াদান কার্যক্রম কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশিকা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন বিজ্ঞান সচিব।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, যোগাযোগব্যবস্থা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় লিখিতভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে বায়েরা, সংশ্লিষ্ট কারিগরি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী, চিকিৎসা দল এবং পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসাসেবা, রোগী পরিবহন, প্রয়োজনীয় আইসোলেশন বা পৃথক রাখার ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব বণ্টনের কার্যকর পরিকল্পনা রাখার কথাও বলেন সচিব।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশে পরিবেশ ও বিকিরণের মাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
আনোয়ার হোসেন বলেন, পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রয়োজনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এসব তথ্য বিনিময় করতে হবে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর আগের পরিবেশ ও বিকিরণের মাত্রার সঙ্গে পরবর্তী সময়ের তথ্য তুলনা করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই করারও আহ্বান জানান তিনি।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিকিরণ সম্পর্কে জনগণকে সঠিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য জানানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিজ্ঞান সচিব বলেন, তথ্যের ঘাটতি বা ভুল ব্যাখ্যা থেকে মানুষের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহজ ভাষায় সঠিক তথ্য তুলে ধরতে এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত তথ্য বিনিময় করতে হবে।
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য তৈরি জরুরি প্রস্তুতি ও সাড়াদান ব্যবস্থা দেশের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্যও অনুসরণযোগ্য হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বায়েরা চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান।
তিনি বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে মাঠপর্যায়ের প্রথম সাড়াদানকারী থেকে জাতীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পর্যন্ত প্রত্যেকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
কর্মশালায় অন্যদের মধ্যে ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পারমাণবিক শক্তি) আবুল খায়ের মো. আক্কাস আলী।
এছাড়া বায়েরা, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, কারিগরি বিশেষজ্ঞ, পাবনা ও কুষ্টিয়া জেলার স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, চিকিৎসা দল এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কর্মশালায় অংশ নেন।
কর্মশালায় আইএইএ-এর আসন্ন মিশন উপলক্ষে একটি বুকলেটের মোড়কও উন্মোচন করা হয়।
