গোপীবাগের ৬ খুন: বিচার পাওয়ার আশাও ছেড়ে দিয়েছে পরিবার
হত্যাকাণ্ডের কোনো কূল-কিনারা নেই; তদন্ত শেষ হয়নি ৯ বছরেও।
ঢাকার গোপীবাগে মুরিদ সেজে বাসায় ঢুকে কথিত পীর লুৎফর রহমান ফারুকসহ ছয়জনকে হত্যার পর নয় বছর পেরিয়ে গেলেও খুনিদের বিচারের মুখোমুখি করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা।
মামলা তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের পরিদর্শক মো. সোহরাব হোসেন বলছেন, এখনও কোনো ‘ক্লু’ তারা পাননি, তদন্তে তেমন কোনো অগ্রগতিও হয়নি।
এতদিনেও বিচার না পেয়ে ক্ষুব্ধ, হতাশ, লুৎফর রহমানের ছেলে আবদুল্লাহ আর ফারুক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এ নিয়ে তারা আর গণমাধ্যমে কথা বলতেও চান না।
“কথা বলে, অনুযোগ জানিয়ে কী হবে? আমরা বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছি।”
২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় রামকৃষ্ণ মিশন রোডের ৬৪/৬ নম্বরে চার তলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় ঢুকে একদল লোক কথিত পীর লুৎফর রহমান ফারুক, তার ছেলে সারোয়ার ইসলাম ফারুক ওরফে মনির, পীরের খাদেম মঞ্জুর আলম মঞ্জু, মুরিদ মো. শাহিন, রাসেল ও মুজিবুল সরকারকে গলা কেটে হত্যা করে।
ওই সময়টায় দেশে লেখক, প্রকাশক, ব্লগার ও ভিন্ন ধর্মমতের ওপর জঙ্গিবাদী হামলা, হত্যার ঘটনা ঘটছিল প্রায়ই। সে কারণে পুলিশের সন্দেহের তালিকায় ছিল জঙ্গিরাই।
পরের বছর ২৭ অগাস্ট রাতে রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারে একই কায়দায় খুন করা হয় ইসলামী ফ্রন্টের নেতা, হাই কোর্ট মাজার জামে মসজিদের খতিব নুরুল ইসলাম ফারুকীকে। পুলিশ তখন বলেছিল, গোপীবাগের পীর আর ফারুকী হত্যার মোটিভ একই।
মামলার নথিপত্রে দেখা যায়, ছয় খুনের ঘটনায় এ পর্যন্ত ১২ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। থানা পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশের হাত ঘুরে মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। এ পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য প্রায় ৯৭ বার সময় নিয়েছে বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা। কিন্তু অভিযোগপত্র জমা পড়েনি।
ওই ১২ জনের মধ্যে হাদিসুর রহমান সাগর, জুলফিকার বিন সাদ ওরফে আবু ওয়াক্কাস, মামুনুর রশীদ রিপন, সৈয়দ জিয়াউল ইসলাম ওরফে জিতু ওরফে নিরব ওরফে নিয়ন ওরফে হিমু, সৈয়দ আল আমিন, তরিকুল ইসলাম, আবু রায়হান ওরফে মাহমুদ ওরফে আ. হাদী, জাহাঙ্গীর হোসেন ও রফিকুল ইসলাম কারাগারে আছেন। এছাড়া মো. আজমির অমিত, মো. গোলাম সরোয়ার আছেন জামিনে।
কারাগারে থাকা আসামিদের মধ্যে জেএমবির জঙ্গি হাদিসুর রহমান সাগর ও মামুনুর রশীদ রিপন হোলি আর্টিজানে মামলার ফাঁসির আসামি। ২০১৯ সালে তাদের ছয় খুনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
সর্বশেষ গত ২১ নভেম্বর এ মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। সেদিনও প্রতিবেদন না পেয়ে ঢাকার মহানগর হাকিম শেখ সাদী ২১ ডিসেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের পরবর্তী তারিখ রাখেন। কিন্তু এদিনও তা জমা পড়েনি, তারিখ পিছিয়ে গেছে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে।
মামলার বাদী আব্দুল্লাহ আল ফারুক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নতুন তদন্ত কর্মকর্তা আসেন, চলে যান, তদন্ত আর শেষ হয় না। এর আগের তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন পরিদর্শক আবদুল্লাহ। তিনি মাসখানেক আগে আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সর্বোচ্চ শ্রম দিয়ে তদন্ত শেষ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তার জায়গায় এখন আরেকজন দায়িত্ব পেয়েছেন।
“তার আগে অন্য একজন তদন্ত কর্মকর্তা আমাকে বলেছিলেন, ‘হয়ত এ মামলার চরমপন্থি জঙ্গি আসামিরা কোনো অপারেশনে মারা গেছেন অথবা অন্য কোনো মামলায় কারাগারে রয়েছেন। হত্যার মোটিভ সবাই জানি, কিন্তু ক্লু এখোনো বের করা যাচ্ছে না’।”
পুলিশ ঘটনার কিনারা করতে না পারায় হতাশ ফারুক বলেন, “আমার মা সালমা বেগমের সামনেই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। যদিও তার চোখ বাঁধা ছিল। কিন্তু সবই তো শুনেছেন যা ঘটেছে। স্বামী-সন্তান হারানোর কষ্ট কেউ ভুলতে পারে না। মায়ের ক্ষেত্রেও সেটা হয়েছে। বাকিরাও আমার মায়ের কাছে ছিল সন্তানের মত। মা এখনো কাঁদেন তাদের জন্য।”
বর্তমানে মামলা তদন্তের দায়িত্বে থাকা কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের পরিদর্শক সোহরাব হোসেন বলেন, “এখনো খুনের আসল রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। কোনো ক্লু নেই। কাজেই এ মামলার তদন্তে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। তদন্তের দায়িত্বে আসার পর কারাগারে আটক আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। কিন্তু তারা কেউ এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে মুখ খুলছে না। তবে রহস্য উদঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।”
পীর লুৎফর রহমান ফারুকসহ ছয়জন খুনের ঘটনায় তার ছেলে আব্দুল্লাহ আল ফারুক ২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর ওয়ারী থানায় মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, লুৎফর রহমান ফারুক পীর ছিলেন। তার অনেক মুরিদ ছিলেন, যারা বাসায় যাতায়াত করতেন।
লুৎফর নিজেকে ‘ইমাম মাহদীর প্রধান সেনাপতি’ দাবি করতেন। তার ধর্মীয় মতাদর্শের সঙ্গে প্রচলিত ধর্মীয় মতাদর্শের পার্থক্য ছিল। সে কারণে আগেও কয়েকবার তার ওপর হামলা হয়েছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।
এজাহারে বলা হয়, ঘটনার দিন মাগরিবের নামাজের আগে ১০/১২ জন লোক ধর্মীয় বিষয়ে আলাপ করার কথা বলে গোপীবাগের ওই বাসায় যান। লুৎফর তাদের দরবার ঘরে বসতে দিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য মুরিদ শাহিনকে বাজারে পাঠান।
এরপর সন্ধ্যা ৬টার দিকে লুৎফর রহমান ফারুক, তার বড় ছেলে সরোয়ার ইসলাম ফারুকসহ ছয়জনের মুখে টেপ আটকে, হাত-পা বেঁধে কুপিয়ে হত্যা করে। ওই সময় বাসায় থাকা অন্যদের হাত-পা-মুখ বেঁধে দরবার কক্ষে ফেলে রাখে।
এজাহারে বলা হয়, লুৎফর রহমান ফারুকের আরেক ছেলে কোথায় তাও জানতে চাইছিল খুনিদের একজন। চলে যাওয়ার সময় খুনিরা লুৎফর রহমান ফারুকের স্ত্রী ও তার পুত্রবধূকে বলে যায়, ওই ছয়জনকে ‘মারার অর্ডার ছিল’। পুলিশ বা মিডিয়ার কাছে মুখ খুললে তাদেরও একটি অবস্থা হবে।
