বন্দর নিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ রক্ষা কমিটির
“বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক কনটেইনার টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদি ইজারার মাধ্যমে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।”
চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা ‘স্থবির মানের ছিল’ বলে নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম রবি যে মন্তব্য করেছিলেন, তার প্রতিবাদ জানিয়েছে বন্দর রক্ষা কমিটি।
শনিবার বন্দর রক্ষা কমিটি চট্টগ্রাম এবং বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়নের নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে নৌপরিবহন মন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘বাস্তবতাবিবর্জিত ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে দেশবাসীকে বিভ্রান্তির অপপ্রয়াস’ বলে আখ্যায়িত করেছে।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) যুগ্ম সম্পাদক ও বন্দর রক্ষা কমিটির সদস্য ইফতেখার কামাল খান স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে এ অভিযোগ তোলা হয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার ওয়ার্ল্ড মেরিটাইম ডে ও বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির ৬৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে একাডেমিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে আসেন নৌপরিবহন মন্ত্রী।
ওই অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম রবি বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক যে জাহাজ ব্যবস্থাপনা, কনটেইনার ও কার্গো ব্যবস্থাপনা—এটা একটা স্থবির মানের ছিল; প্রয়োজন মত ছিল না। সেখানে যদি আপনি যান, পিসিটি, এনসিটি, সিসিটি, লালদিয়া, বে টার্মিনাল-১,২,৩ এগুলোতে কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগ, টেকনোলজিক্যালি আরো কীভাবে ডেভেলপ করা যায়…
“কনটেইনারের লোড-আনলোড কীভাবে বাড়ানো যায়, উন্নত বিশ্বে যে সমস্ত বড় বড় পোর্ট আছে- তার সাথে প্রতিযোগিতায় থাকা যায়। এবং বিশ্বে কনটেইনার ও পোর্ট হ্যান্ডলিং করতে যারা জানে-বোঝে, সেসমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখানে এনে আমরা আরো বেশি সমৃদ্ধ হবার পথ উন্মুক্ত করেছি; প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং প্রতিষ্ঠার পর্যায়ে আছে।”
শনিবারের বিবৃতিতে বন্দর রক্ষা কমিটি চট্টগ্রাম ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা ‘স্থবির পর্যায়ে’ ছিল এবং সেই স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে আনার পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে- নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের এমন দাবি কোনোভাবেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এই ধরনের বক্তব্য জাতিকে বিভ্রান্ত করার শামিল।”
নেতাদের কথায়, “দীর্ঘদিন ধরে বন্দর শ্রমিক-কর্মচারী, কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও দেশীয় দক্ষ জনশক্তির নিরলস শ্রম, অভিজ্ঞতা ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় চট্টগ্রাম বন্দর তার কার্যক্রম সচল রেখেছে এবং কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ধারাবাহিকভাবে সক্ষমতা দিন দিন বৃদ্ধি করেছে।”
বিবৃতিতে নেতারা বলেন, বৈরি আবহাওয়া, সমুদ্রের সতর্ক সংকেত ও নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীরা ঝুঁকি নিয়ে বন্দরের কার্যক্রম সচল রেখেছেন। চট্টগ্রাম বন্দরের আয় ও হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি থাকলেও সেটিকে ‘স্থবিরতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা বাস্তবতার সঙ্গে ‘অসঙ্গতিপূর্ণ’।
“আমরা বন্দরের আধুনিকায়ন চাই, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন চাই, সক্ষমতা বৃদ্ধি চাই; কিন্তু জাতীয় স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বিসর্জন দিয়ে নয়। চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন দেশের শ্রমিক-কর্মচারী, কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও দেশীয় দক্ষ জনশক্তিকে সঙ্গে নিয়েই করতে হবে।”
বর্তমানে আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে বন্দর সচল রয়েছে এবং এখানে নতুন করে বিনিয়োগের কোনো সুযোগ নেই বলে দাবি করে নেতারা বলেন, “লাভজনক চট্টগ্রাম বন্দরের টাকা দিয়ে পায়রা বন্দর মাতারবাড়ি গভীর সমুন্দ্রবন্দরসহ বহু স্থাপনা তৈরি করেছে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চট্টগ্রাম বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
“তবে উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক কনটেইনার টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদি ইজারার মাধ্যমে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।”
চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে দীর্ঘমেয়াদী ইজারার মাধ্যমে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে দাবি করে বিবৃতিতে নেতারা বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, শ্রমিকস্বার্থ, রাজস্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ওপর এর প্রভাব প্রকাশ্যে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
“নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনালের (সিসিটি) মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।”
চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক কন্টেইনার টার্মিনাল দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, “একই সঙ্গে বন্দরের প্রকৃত সক্ষমতা, আয়, কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং এবং দেশীয় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা নিয়ে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রকাশ করা প্রয়োজন।
“অতীত সরকারের সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত কিংবা পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে নেওয়া উদ্যোগ, কোনোটিই জনস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে হতে পারে না।”
বন্দরের সিসিসি-এনসিটিসহ বিভিন্ন স্থাপনা দেশি-বিদেশি ইজারাদারদের কাছে ইজারা না দেওয়ার দাবিতে গত কয়েকমাস ধরে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করছে বন্দর রক্ষা কমিটিসহ কয়েকটি সংগঠন।
বিবৃতি দেওয়া নেতারা হলেন, বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার ও সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু, জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এ এম নাজিমুদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, টিইউসি চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি তপন দত্ত, যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান, ডক জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি মো. হারুন, সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম, বন্দর লেসিং-আনলেসিং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. ইকবাল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মো. পারভেজ, বন্দর মার্সেন্ট ইউনিয়নের নেতা মো. হারুন, আলমগীর হোসেন সাজু, স্টিভিডারিং স্টাফ ইউনিয়নের নেতা মো. ফয়েজুল্লাহ, উইসম্যান কল্যাণ সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইমাম হোসেন খোকনসহ আরও অনেকে।
