Published : 05 Apr 2026, 04:31 PM
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন তোফাজ্জল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় আত্মসমর্পণের পর দুই আসামিকে জামিন দিয়েছে আদালত।
ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসাইনের আদালত রোববার এ আদেশ দেন।
দুজনেই ফলিত রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী, তারা হলেন আবু রায়হান, রেদোয়ানুর রহমান পারভেজ।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ বলেন, “আসামিদের পক্ষে তাদের আইনজীবীরা জামিন চেয়ে শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে জামিনের বিরোধিতা করি। শুনানি শেষে আদালত তাদের জামিন দিয়েছেন।”
এর আগে এ মামলায় গত ১৫ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী রাশেদ কামাল অনিক আত্মসমর্পণের আবেদন জমা দিয়ে পালিয়ে যান।
গেল ১০ মার্চ ২৮ আসামির বিরুদ্ধে দেওয়া পিবিআইর অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আদালত। এদের মধ্যে ২২ জন পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
অপর আসামিরা হলেন-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক উপ-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. জালাল মিয়া, ওই হলের আহসান উল্লাহ ওরফে বিপুল শেখ, ভূগোল বিভাগের আল হোসাইন সাজ্জাদ, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের মো. মোত্তাকিন সাকিন শাহ, মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী সুমন মিয়া, ওয়াজিবুল আলম, ফিরোজ কবির, আব্দুস সামাদ, সাকিব রায়হান, ইয়াছিন আলী, ইয়ামুজ্জামান ওরফে ইয়াম, ফজলে রাব্বি, শাহরিয়ার কবির শোভন, মেহেদী হাসান ইমরান, রাতুল হাসান, সুলতান মিয়া, নাসির উদ্দিন, মোবাশ্বের বিল্লাহ, শিশির আহমেদ, মহসিন উদ্দিন ওরফে শাফি, আব্দুল্লাহিল কাফী, শেখ রমজান আলী রকি, মনিরুজ্জামান সোহাগ, রাব্বিকুল রিয়াদ এবং আশরাফ আলী মুন্সী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের অতিথি কক্ষে ৩২ বছর বয়সি তোফাজ্জল হোসেন নির্যাতনের শিকার হন ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, তোফাজ্জলকে মারধরের আগে তাকে ভাত খাওয়ানো হয়, তখন তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, ভাত খেতে তার কেমন লাগছে। রাত ১২টার দিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী ওই যুবককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শাহবাগ থানায় এই ঘটনায় মামলা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ। মামলাটি তদন্ত করে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন শাহবাগ থানার পরিদর্শক মো. আসাদুজ্জামান। অভিযোগপত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ শিক্ষার্থীকে অভিযুক্ত করা হয়।
এরপর মামলার ‘তদন্ত সুষ্ঠু হয়নি’ জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে নারাজি দাখিল করা হয়। গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার তৎকালীন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুজ্জামান পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কে মামলাটি পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন। পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হান্নানুল ইসলাম গত ১৫ ডিসেম্বর নতুন করে আরও সাত জনসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
মামলার তদন্ত সুষ্ঠু হয়নি উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে নারাজি দাখিল করা হয়। গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার তৎকালীন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুজ্জামান পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কে মামলাটি পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন। পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হান্নানুল ইসলাম গত ১৫ ডিসেম্বর নতুন করে আরও সাত জনসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, “১৮ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৮টায় এক যুবক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের গেইটে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করছিলেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র তাকে আটক করে প্রথমে ফজলুল হক মুসলিম হলের মূল ভবনের অতিথি কক্ষে নিয়ে যান। মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগ করে তারা ওই যুবককে এলোপাতাড়ি চড়-থাপ্পড় মারেন। জিজ্ঞাসাবাদে ওই যুবক তার নাম তোফাজ্জল বলে জানান।
“তোফাজ্জল মানসিক রোগী বুঝতে পেরে তাকে হলের ক্যান্টিনে নিয়ে খাবার খাওয়ানো হয়। এরপর তাকে হলের দক্ষিণ ভবনের গেস্ট রুমে নিয়ে জানালার সঙ্গে হাত বেঁধে স্ট্যাম্প, হকিস্টিক ও লাঠি দিয়ে উচ্ছৃঙ্খল কিছু ছাত্র বেধড়ক মারধর করলে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।”
এর কয়েকদিন পর ২৫ সেপ্টেম্বর ফজলুল হক মুসলিম হলে প্রভোস্ট অধ্যাপক শাহ মুহাম্মদ মাসুমসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে নিহতের ফুফাতো বোন মোছা.আসমা আক্তার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আক্তারুজ্জামানের আদালতে মামলার আবেদন করেন। আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যায় কর্তৃপক্ষের দায়ের করা মামলার সঙ্গে এ মামলা একইসঙ্গে তদন্তের নির্দেশ দেন।
এ মামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জালাল মিয়া, সুমন মিয়া, ফিরোজ কবির, আবদুস সামাদ, মোত্তাকিন সাকিন শাহ, আল হোসাইন সাজ্জাদ, ওয়াজিবুল আলম, আহসান উল্লাহ, ফজলে রাব্বি, ইয়ামুস জামান, রাশেদ কামাল অনিক, শাহরিয়ার কবির শোভন, মেহেদী হাসান ইমরান ও মো. সুলতানকে আসামি করা হয়।
তোফাজ্জলের বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নে। বরিশাল বিএম কলেজ থেকে হিসাব বিজ্ঞানে মাস্টার্স করলেও মানসিক সমস্যার কারণে কোনো কাজকর্ম করছিলেন না।
আরও পড়ুন
চোর সন্দেহে তোফাজ্জলকে পিটিয়ে হত্যা: এবার ২৮ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র