মহাস্থানগড়ে নির্মাণকাজে স্থিতাবস্থা, আপিলের অনুমতি
গত ২ জুলাই সুপ্রিম কোর্টে লিভ টু আপিল করা হয়েছিল।
বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড় প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকার সীমানার মধ্যে যেকোনো ধরনের নির্মাণকাজের ওপর স্থিতাবস্থা জারি করেছে আপিল বিভাগ।
একইসঙ্গে মহাস্থানগড় সংরক্ষণের নির্দেশনা দিয়ে ২০১২ সালে হাই কোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে সরকারকে আপিল করার অনুমতি দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।
রোববার শুনানি নিয়ে এ আদেশ দেয় প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ।
বেঞ্চের অন্য তিন সদস্য হলেন—বিচারপতি মোহাম্মদ রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
আদালতে সরকারের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। অন্যদিকে রিটকারী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।
পরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, “আজ বিষয়টি আপিল বিভাগের শুনানির জন্য ওঠে। অ্যাটর্নি জেনারেল অতিরিক্ত কয়েকটি যুক্তি তুলে ধরে আপিলের অনুমতি (লিভ) দেওয়ার কথা বলেন।
“আদালত স্থগিতাদেশ (স্টে) দিতে চাইলে এর বিরোধিতা করে আমরা বলি, স্টে করলে তো কাজ হয়ে যাবে। তখন তো আর আপিলের কোনো কার্যকারিতাই থাকবে না, কাজ তো হয়েই যাবে। পরে আদালত সরকারকে স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস কো) বজায় রাখার নির্দেশ দেন।”
এই আইনজীবী বলেন, ২০২৩ সালের ১৭ মে মহাস্থানগড় ইউনেসকোর টেন্টেটিভ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এখন প্রত্নতাত্ত্বিক অখণ্ডতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবিষ্যতে বিশ্ব ঐতিহ্যের চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
“সেখানে কোনো কাজ-টাজ হলে আমরা কিন্তু ফাইনাল তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাব।”
মামলার নথি অনুযায়ী, মহাস্থানগড়ে অবৈধ খনন ও স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ সামনে এলে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে জনস্বার্থে রিট আবেদন করে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ, আসাদুজ্জামান সিদ্দিকী ও সরওয়ার আহাদ চৌধুরী।
দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি দেওয়া রায়ে হাই কোর্ট মহাস্থানগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ও স্মৃতিস্তম্ভ সংরক্ষণে বেশ কিছু নির্দেশনা দেয়।
রায়ে প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা সংরক্ষণে মুনতাসীর মামুন কমিটির সুপারিশ অনুসরণ করে মূল সাইট থেকে প্রায় ২০০ ফুট দূরে রাস্তার পূর্ব পাশে জমি অধিগ্রহণ করে নতুন মসজিদ নির্মাণ এবং মহাসড়কের ওপর একটি ফুটব্রিজ নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, এতে একদিকে মহাস্থানগড়ের ঐতিহাসিক নিদর্শন অক্ষত থাকবে, অন্যদিকে মুসল্লিদের নামাজের প্রয়োজনও পূরণ হবে। মূল মসজিদের ঐতিহাসিক চরিত্র ও কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
হাই কোর্টের রায়ে মহাস্থানগড় প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় যেকোনো ধরনের অগ্রাসন বা অবৈধ নির্মাণ ঠেকাতে কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ নির্দেশনাকে রুল অ্যাবসলিউট ঘোষণা করে আদালত বলে, রায়টি কনটিনিউয়াস ম্যান্ডামাস হিসেবে কার্যকর থাকবে। অর্থাৎ মহাস্থানগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা সংরক্ষণ এবং সেখানে অগ্রাসন ও অবৈধ নির্মাণ ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর আদালতের নির্দেশনা ধারাবাহিকভাবে কার্যকর থাকবে।
পরে ২০২০ সালে একই রিট মামলার ধারাবাহিকতায় করা সম্পূরক আবেদনের শুনানি নিয়ে হাই কোর্ট সংরক্ষিত এলাকায় খনন ও স্থাপনা নির্মাণ বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়।
ওই বছর মো. মোশাররফ হোসেন নামে এক ব্যক্তি মহাস্থানগড়ের ভেতরে ব্যক্তিগত জমিতে স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি চেয়ে আরেকটি রিট আবেদন করেছিলেন। হাই কোর্ট ২০১২ সালের রায়ের কথা তুলে ধরে আবেদনটি খারিজ করে দেয়।
আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলছেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় মসজিদ ও মাজারে নারীদের জন্য একটি বিশ্রামাগার ও অজুখানা নির্মাণে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুমোদন চান। প্রস্তাবটি অনুমোদন না পেলেও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ৭৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় এবং মহাস্থানগড়ে নির্মাণকাজ শুরু হয়।
গত ১৭ জুন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বগুড়া আঞ্চলিক কার্যালয় চিঠি দিয়ে কাজ বন্ধ করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসককে অনুরোধ জানায়। এরপর নির্মাণকাজ আটকে যায়।
এরপরই গত ২ জুলাই সুপ্রিম কোর্টে ১৪ বছর আগের রায় হওয়া মামলায় তড়িঘড়ি লিভ টু আপিল করা হয়। এতে ২০১২ সালের চূড়ান্ত রায় এবং ২০২০ সালের সম্পূরক আদেশ সংশোধন (মডিফাই) ও স্থগিত চাওয়া হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, শাহ সুলতান বলখী মাহীসাওয়ার (রহ.) মাজার ও মসজিদে প্রতি সপ্তাহে জুমার নামাজ ও ওরস উপলক্ষে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী আসেন। কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত শৌচাগার, অজুখানা, বিশ্রামাগারসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
প্রত্নস্থলের মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখেই প্রয়োজনীয় উন্নয়নকাজের সুযোগ দিতে আগের রায় সংশোধন করার আর্জি জানানো হয় আবেদনে।
