Published : 02 Feb 2026, 10:32 PM
জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সময় থেকে ৯৭টি মাজারে হামলার তথ্য দিয়ে সুফি-সমাজকেন্দ্রিক গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম’ বলছে, এসব ঘটনার বিপরীতে মামলা হয়েছে কেবল ১১টি।
হামলার ঘটনাগুলো ঘটেছে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে; মোট আক্রমণের দুই-তৃতীয়াংশ ঘটেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে।
আর জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লা, নরসিংদী ও ঢাকায়।
সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে ‘মাজারে হামলা’ বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
ডিজিটাল ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদন, ফেইসবুক থেকে সংগ্রহ করা ভিডিও সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের পাশাপাশি ‘যথেষ্ট তথ্য না পাওয়া’ কিংবা ভয়াবহ বা সন্দেহপূর্ণ ঘটনার ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে কাজ করার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করার কথা বলছে মাকামের গবেষণা দল।
মাকামের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ইমরান হুসাইন তুষারের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের সারাংশ পাঠ করেন মাকামের কোঅর্ডিনেটর মোহাম্মদ আবু সাঈদ।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, “৯৭টি হামলার ঘটনায় ৫৯টির ক্ষেত্রে (৬১%) ধর্মীয় মতবিরোধের কারণে হামলা করা হয়েছে। ২১টি হামলা হয়েছে স্থানীয় মতবিরোধের কারণে, যা মোট ঘটনার ২১%। রাজনৈতিক কারণে হামলা হয়েছে ১৬টি (১৭%)। মাজার কমিটির অন্তর্দ্বন্দ্ব তথা পারিবারিক দ্বন্দ্বের ফলে হামলা হয়েছে একটিতে।
“হামলার শিকার ৯৭টি মাজারের মধ্যে অন্তত ৪৪টি মাজার পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে এবং মাজারের বার্ষিক উরস বন্ধ রয়েছে।”
হামলার ভিডিও বিশ্লেষণের বরাতে ‘মাকাম’ বলছে, মাজার সংশ্লিষ্ট অন্তত সাতটি মসজিদেও হামলা করা হয়েছে। অন্তত ১০টি হামলার পূর্বে মাইক ব্যবহার করে হামলাকারীরা সংগঠিত হয়ে আক্রমণ করে। অন্তত ছয়টি মাজারে বুলডোজার/ভেকু ব্যবহার করে মাজার ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণের বরাতে মাকাম বলছে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে অন্তত ১৩টি হামলার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা অন্তত চারটি করে হামলায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা অন্তত দুটি হামলায়, এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের অংশগ্রহণে অন্তত একটি করে হামলায় জড়িত বলে অভিযোগ ও প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মাজার, দরগাহ, খানকাগুলোকে ক্ষতিপূরণ, পুনঃসংস্কার কার্যক্রম এবং সার্বিকভাবে দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের পরিকল্পনা নির্বাচনি ইশতেহারে যুক্ত করতে ১২টি রাজনৈতিক দলকে মাকামের পক্ষ থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
হামলা কেন ঠেকানো যায়নি, সেই প্রশ্নে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, “জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বড় আঘাত করা হয়েছে মাজারে হামলার মাধ্যমে। জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ছাত্রজনতার মাঝে যে বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও সহাবস্থানের সমাজ গড়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, সংঘবদ্ধভাবে মাজার হামলার মধ্য দিয়ে তা ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।
“এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে সুফি-সমাজের সমর্থক ও প্রভাব সবচেয়ে বেশি হবার পরও কেন এই হামলা প্রতিরোধ করা যায়নি, এটিও একটি প্রশ্ন। সংখ্যায় ও প্রভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও, সামাজিকভাবে অসংগঠিত ও রাজনৈতিকভাবে জনবিচ্ছিন্ন হবার কারণে দেড় বছর ধরে পরিচালিত ধারাবাহিক হামলার ন্যূনতম প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।”
মাকামের কোঅর্ডিনেটর আবু সাঈদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার মুখে বলা ছাড়া প্রতিরোধের তেমন ‘চেষ্টা করেনি’। রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও ‘অনুল্লেখযোগ্য’ ও ক্ষেত্রবিশেষ ‘প্রশ্নবিদ্ধ’।
“সরকারের অকার্যকর বাগাড়ম্বর হামলাকারীদের পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করেছে। হামলার ফলে যে সকল মাজার, দরগাহ, খানকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলোর ক্ষতিপূরণ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ঘোষণা আসেনি। এক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের দিক থেকে চূড়ান্তভাবে রাষ্ট্রীয় ও সরকারি ব্যর্থতা স্পষ্ট।”
চব্বিশের অভ্যুত্থান পরবর্তী ২০২৫ সালের জুনে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’। সে বছরের ২৫ অক্টোবর ‘বাংলাদেশের মাজার সংস্কৃতি: সহিংসতা, সংকট ও ভবিষ্যৎ ভাবনা’ শিরোনামে রাজধানীতে জাতীয় সংলাপের আয়োজন করে প্রতিষ্ঠানটি।
এর ধারাবাহিকতায় সারা দেশে সংঘটিত মাজার, দরগাহ, খানকায় হামলার বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিষ্ঠানটি। মাকাম রিসার্চ টিমের সদস্য আবু হাসান মুহাম্মদ মুখতার এবং মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম যৌথভাবে প্রতিবেদন তৈরির কাজ করেন।
লেখক ও গবেষক তাহমিদাল জামি, আইনি সহায়তা কেন্দ্র ব্লাস্টের প্রতিনিধি আহমেদ ইব্রাহীম, সেন্টার ফর ইসলামিক হেরিটেজের সহ-সমন্বয়ক মুহাম্মদ মিজানুর রহমান, মাকাম রিসার্চ টিমের সদস্য তৌহিদুল ইসলাম, আবু হাসান মুহাম্মদ মুখতার ও মুনীর উদ্দিন আহমদ, হামলার শিকার মুর্শিদপুর দরবারের প্রতিনিধি মাওলানা মতিউর রহমান, চাঁদপুরী শাহ দরবারের প্রতিনিধি মাওলানা গোলাম জিলানীসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন সংবাদ সম্মেলনে।
পুরনো খবর-
সংঘাতের জন্য 'সবাই মুখিয়ে' আছে, কয়েক মাসের মধ্যেই দেখা যাবে: মাহফুজ