তেল থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চায় সরকার, খরচ বাড়বে ছয়গুণ
“মাঝে মাঝে তো গভর্মেন্টকে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট করতে হয়,” বলেন পিডিবি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম।
শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো বেশি চালাতে চাইছে সরকার। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তবে সেই লক্ষ্য পূরণের পথে বড় বাধা জ্বালানি তেলের সংকট।
বেসরকারি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর বড় অংশ প্রয়োজনীয় তেল না থাকায় সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। অন্যদিকে গ্যাসের বদলে ফার্নেস অয়েলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ালে শিল্পের জন্য কিছু গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব হলেও তার জন্য বিদ্যুৎ খাতকে ছয়গুণ বেশি অর্থ গুনতে হবে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের (এনএলডিসি) ২৪ থেকে ৩০ অগাস্টের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেসরকারি এইচএফও বা ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ৩৯টি কেন্দ্র ও ইউনিটের বর্তমান সক্ষমতা প্রায় ৪ হাজার ৩২৮ মেগাওয়াট।
২৩ অগাস্ট সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে চালু থাকা ৩৬টি কেন্দ্র থেকে প্রায় ২ হাজার ৯১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল। এরপর উৎপাদন কমতে থাকে। ২৯ অগাস্ট সন্ধ্যায় তা নেমে আসে প্রায় ২ হাজার ৫৭০ মেগাওয়াটে।
এ সময়ে অনেক কেন্দ্রের উৎপাদন কম থাকার কারণ হিসেবে ‘লিকুইড ফুয়েল শর্টেজ’ বা তরল জ্বালানির সংকট দেখানো হয়েছে।
২৪ অগাস্ট গোগনগরের ১০২ মেগাওয়াট কেন্দ্র, মেঘনাঘাটের ১০৪ মেগাওয়াট ওপিসিএল কেন্দ্র এবং রূপসার ১০৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে কোনো বিদ্যুৎ দিতে পারেনি।
এনএলডিসি তিন কেন্দ্রের ক্ষেত্রেই জ্বালানি তেলের সংকটের কথা বলেছে। একই সময়ে ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার আনোয়ারা কেন্দ্র থেকে পাওয়া যায় মাত্র ১৬ মেগাওয়াট। বরিশালের ১১০ মেগাওয়াট কেন্দ্র দেয় ৩২ মেগাওয়াট।
পিডিবি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে তাদের। তবে প্রয়োজনীয় তেল সংগ্রহে কিছু সময় লাগবে।
“আমাদের টার্গেট আছে এবারে ৪,০০০ মেগাওয়াট আমরা এই যে তেল থেকে জেনারেট করব।”
দেশে এইচএফওভিত্তিক সরকারি-বেসরকারি মোট ৫৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট স্থাপিত সক্ষমতা ৫ হাজার ৬৩০ মেগাওয়াট। কিন্তু সেই সক্ষমতার বড় অংশ কাজে লাগাতে হলে আগে তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে সেই তেল কেনার অর্থ জোগাতে বকেয়া পাওনা পরিশোধের বিষয়টিও সামনে আসছে।
বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধের বিষয়টিও পরিকল্পনায় আছে বলে জানান পিডিবি চেয়ারম্যান রেজাউল। তার ভাষ্য, কেন্দ্রগুলো যাতে সামনে উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারে, সেজন্য জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া হয়েছে। পাশাপাশি বকেয়া অর্থও ধীরে ধীরে পরিশোধ করা হচ্ছে।
বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাতও বলেছেন, পিডিবি তাদের প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিতে বলেছে। এজন্য আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের চিঠিও দেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য, বিদ্যুৎ বিক্রির বকেয়া না পাওয়ায় অনেক কেন্দ্রের হাতে জ্বালানি তেল কেনার পর্যাপ্ত অর্থ নেই। বকেয়ার একটি অংশ পরিশোধ হলে নতুন করে তেল আমদানি করে উৎপাদন বাড়ানো যাবে।
ডেভিড হাসনাতের হিসাবে, তাৎক্ষণিকভাবে বেসরকারি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে বাড়তি ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিতে চাইছে সরকার।
২৮ অগাস্ট সন্ধ্যায় বেসরকারি এইচএফও কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ২ হাজার ৫২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে। সেখান থেকে উৎপাদন ৪ হাজার মেগাওয়াটে নিতে হলে বাড়াতে হবে প্রায় ১ হাজার ৪৭৬ মেগাওয়াট।
ডেভিড হাসনাতের ভাষ্য, প্রয়োজন হলে বর্তমানের চেয়ে প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বেশি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব।
তার হিসাবে, সেই পরিমাণ তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ দিয়ে সমপরিমাণ গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন কমানো গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ৫০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরিয়ে শিল্পে দেওয়া যেতে পারে।
এই হিসাব বিপ্পার করা জানিয়ে তিনি বলেন, “এটা আমরা করেছি। আমরা করে সরকারকে দিয়েছি।”
তার হিসাবে প্রতি এক হাজার মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ২০০ এমএমসিএফডি গ্যাস লাগে।
গ্যাসে ব্যয় সাড়ে তিন টাকার নিচে, তেলে ২০ টাকার বেশি
তেলভিত্তিক উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা উচ্চব্যয়। এনএলডিসির হিসাবে, ২৫ অগাস্ট এইচএফও থেকে ৫৭ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
একই দিনে গ্যাস থেকে ১২৪ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি ব্যয় ছিল প্রায় ৪২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ ওই দিন গ্যাস দিয়ে এইচএফওর দ্বিগুণের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও জ্বালানিতে খরচ হয়েছে তেলের এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি।
২৬ অগাস্টও একই চিত্র ছিল। সেদিন এইচএফও থেকে ৫৪ দশমিক ৭০ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি খরচ হয়েছে প্রায় ১১৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা। গ্যাস থেকে ১২২ দশমিক ৮১ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ৪২ কোটি ২২ লাখ টাকা।
গত ২৪ থেকে ২৮ অগাস্ট পর্যন্ত পাঁচ দিনের তথ্য বিশ্লেষণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের গড় জ্বালানি ব্যয় দাঁড়ায় ইউনিটপ্রতি প্রায় ৩ টাকা ৪৫ পয়সা। এইচএফওভিত্তিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রে তা প্রায় ২০ টাকা ৬৯ পয়সা। অর্থাৎ শুধু জ্বালানি ব্যয়ের হিসাবে ফার্নেস অয়েলে এক ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ টাকা লাগছে।
২৫ অগাস্ট মোট বিদ্যুতের প্রায় ১৬ শতাংশ এসেছিল এইচএফও থেকে। কিন্তু ওই দিনের মোট উৎপাদন ব্যয়ের ৪১ শতাংশের বেশি গেছে এ জ্বালানির পেছনে।
পিডিবি চেয়ারম্যান অবশ্য বাড়তি ব্যয়কে বর্তমান সংকট মোকাবিলার অংশ হিসেবে দেখছেন।
রেজাউল করিমের ভাষায়, “মাঝে মাঝে তো গভর্মেন্টকে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট করতে হয়।”
তিনি বলেন, একটি এফএসআরইউ (এলএনজি টার্মিনাল) রক্ষণাবেক্ষণে যাওয়ায় গ্যাস সরবরাহ আরও কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ বাড়ানোর মতো ব্যবস্থা সরকারকে নিতে হবে।
বিদ্যুতে গ্যাস সরবরাহ কমছে
এ পরিকল্পনা এমন সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহও কমেছে। পেট্রোবাংলার হিসাবে ২৫ থেকে ২৬ অগাস্ট ২৪ ঘণ্টায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৩৭৯ দশমিক ৩ এমএমসিএফডি। এর মধ্যে এলএনজি থেকে এসেছিল ৭৫১ দশমিক ৯ এমএমসিএফডি।
২৬ থেকে ২৭ অগাস্ট মোট সরবরাহ কমে হয় ২ হাজার ৩৬৬ এমএমসিএফডি। বিদ্যুৎকেন্দ্রে দেওয়া হয় ৮৮০ দশমিক ৪ এমএমসিএফডি।
পরের দিন মোট সরবরাহ আরও কমে ২ হাজার ৩৬০ এমএমসিএফডিতে নামে। বিদ্যুৎকেন্দ্র পায় ৮৭৩ দশমিক ২ এমএমসিএফডি। এ সময়ে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে বড় পরিবর্তন হয়নি। কমেছে মূলত এলএনজি সরবরাহ।
একই সময়ে বিদ্যুতের ঘাটতিও বেড়েছে। ২৪ অগাস্ট সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ লোড শেডিং ছিল ৯১২ মেগাওয়াট। ২৫ অগাস্ট তা বেড়ে হয় ১ হাজার ৮০৮ মেগাওয়াট। ২৬ অগাস্ট ছিল ১ হাজার ৪৭৪ মেগাওয়াট। ২৭ অগাস্ট তা বেড়ে ২ হাজার ৮৩৭ মেগাওয়াটে ওঠে।
গত ১ অগাস্ট বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকেও শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস সরবরাহের সময় ভাগ করার বিষয়টি বিবেচনার সিদ্ধান্ত হয়। ভোলার গ্যাস বেসরকারি উদ্যোক্তারা ট্রাকে পরিবহন করতে চাইলে প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
ডেভিড হাসনাতের ভাষ্য, তৃতীয় এফএসআরইউ চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ বাড়িয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্যাস শিল্পে সরানো একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হতে পারে।
