১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

'মুক্তিযুদ্ধের কোনো ইতিহাসই পরাজিত শক্তি পাল্টে দিতে পারবে না'

দিনভর নানা আয়োজনে মানুষের এই মিলনমেলায় জাতীয় স্মৃতিসৌধ হয়ে উঠেছিল বিজয় উদযাপনের চিরায়ত প্রতীক।

'মুক্তিযুদ্ধের কোনো ইতিহাসই পরাজিত শক্তি পাল্টে দিতে পারবে না'
বিজয় দিবসে মঙ্গলবার সকালে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে পরিবারের সঙ্গে শ্রদ্ধা জানাতে আসে শিশুরাও। ছবি: আব্দুল্লাহ আল মমীন

বিডিনিউজ২৪

প্রশান্ত মিত্র

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 17 Dec 2025, 03:28 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:20 PM

“এই দিনটি আমাদের স্বাধীনতার স্মৃতি, এই দিনে প্রতিবছরই এখানে আসি। আমরা ছোটবেলা থেকেই আসি, এখন ছেলেদের নিয়ে আসছি। তারাইতো আগামীতে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।”

পাকিস্তানকে পরাজিত করে বাঙালির একটি স্বাধীন দেশ- বাংলাদেশ অর্জনের বিজয়ের দিনে এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে স্মৃতিসৌধে আসার বিষয়ে এভাবেই বলছিলেন ব্যবসায়ী ফারুক আহমেদ।

মঙ্গলবার বিকালে সাভারের এই বাসিন্দা বলেন, “এই যে বিজয়, বিজয় কী জিনিস এটা দেখাইতে আনছি ছেলে মেয়েদেরকে। আমাদের দেশ স্বাধীন হইছে ওটা ওরা তো বুঝে না, দেখে নাই। ছোটদেরকে বোঝানোর এবং জানানোর একটা দায়বদ্ধতা থেকেই আসছি।”

কথাপ্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন মহলের বিতর্কের বিষয় তুলতেই তিনি বোঝালেন- বিষয়টি তিনি জানেন, বোঝেন।

তার ভাষ্য, “এগুলো বললেইতো আর এটা ধামাচাপা দেওয়া যাবে, স্বাধীন না হলেতো আমরা বাঙালিই হইতাম না।”

প্রাথমিকে পড়ুয়া মেয়ে আর কলেজ পাস করা ছেলের হাত ধরে বিজয়ের সাজে স্মৃতিসৌধে ঢাকা থেকে এসেছিলেন মোবারক নামে আরেক বাবা।

তিনিও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বিজয়ের শিক্ষাটা দিয়ে যেতে চান সন্তানদের মধ্যে। বলছিলেন, “এসেছি তাদেরকে জানানোর জন্য, যে আমরা ১৯৭১ সালে কিভাবে এই দেশটা স্বাধীন হয়েছিল। তার গৌরবগাঁথা উজ্জ্বল ইতিহাস জানার জন্য এখানে নিয়ে এসেছি।”

তার মতে, মুক্তিযুদ্ধের কোন ইতিহাসই পরাজিত শক্তি পাল্টে দিতে পারবে না। বলেন, “তারাতো হল পরাজিত শক্তি, তারা এখন মনে করে স্বাধীনতা মানে তারাই। পরাজিতরাতো অনেক কথাই বলে, পরাজিত শক্তির কথা কানে দেওয়ার কিছু নাই।”

বাবার মুখের কথা টেনে নিয়ে কলেজের গণ্ডি পেরুনো মোস্তাফিজুর রহমান সাব্বির বলছিল, “প্রায় ৩০ লাখ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা দেশটাকে পেয়েছি। আমি রাজনীতি সম্পর্কে সেরকম ধারণা রাখি না, কিন্তু স্বাধীনতা নিয়ে কিছু বললে খারাপ লাগে। আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে ওরা যা তুলে ধরতেছে, সেটা তো চাইলেই হবে না তাই না?”

ভিড় ঠেলে দুই শিশু সন্তানকে আগলে রেখে স্মৃতিসৌধের দিকে এগিয়ে যাওয়া আরেক বাবা বললেন, “এখন আমাদের এখানে আসা দায়িত্ব হয়ে গেছে। এখন যে অবস্থা... এতদিন পালন করার মত অনেকেই ছিল, কিন্তু এখন মনে হয় মুক্তিযুদ্ধ ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে।”

নাম বলতে না চেয়ে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ফুল হাতে শ্রদ্ধা নিবেদনের ভিড়ে হারিয়ে গেলেন তিনি।

এবারের বিজয়ের মাসের শুরু থেকেই বিভিন্ন মহল থেকে নানান প্রশ্ন তোলা হচ্ছিল। বাঙালি জাতির জীবনে মুক্তিযুদ্ধ এবং এর নানান মীমাংসিত বিষয়গুলোকেও সামনে আনা হচ্ছিল বারংবার।

সেগুলো উপেক্ষা করেই মঙ্গলবার ৫৪তম বিজয় দিবসের সূর্য উদয়ের মুহূর্ত থেকে দিনভর সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে নানান বয়সি বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চিরায়ত ঢংয়েই। 

ঘুরেফিরে আলোচনায় এসেছে পাঁচ দশক পেরিয়ে এসেও একটি গোষ্ঠীর স্বাধীনতার বিষয়ে তোলা প্রশ্নের বিষয়গুলো।

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতি কর্মী, মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের প্রায় সবাই বিষগুলো নিয়ে ‘আক্ষেপ’ প্রকাশ করেছেন।

একইসঙ্গে শুনিয়েছেন স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খা পূরণ না হওয়ার নানান গল্পও। তরুণ প্রজন্ম অপশক্তিকে ভবিষ্যতে ‘রুখে দেওয়ার’ প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

নানান আলোচনার মধ্যেও ১৯৭১ সালে ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় আসার দিনটি উদযাপন করতে রাজধানীসহ দেশেজুড়ে দিনভর ছিল নানা আয়োজন।

রাজধানীসহ আশপাশের মানুষের জন্য বরাবরের মত এবারও উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ।

মঙ্গলবার ভোরের আলো ফুটতেই রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। এসময় সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সকাল সাড়ে ৭টার পর থেকে স্মৃতিসৌধ উন্মুক্ত করে দিলে বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষের স্রোত নামে পুরো এলাকাজুড়ে।

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এই জনস্রোতে শ্রদ্ধা নিবেদনে সামিল হয়েছেন বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও।

কোলের শিশু থেকে বয়স্ক কেউ এসেছেন ফুল হাতে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে, পরনে লাল-সবুজ রঙের পোশাক, কারো মুখে স্লোগান, কারো কণ্ঠে ছিল দেশাত্ববোধক গান। 

দিনভর নানান আয়োজনে মানুষের এই মিলনমেলায় জাতীয় স্মৃতিসৌধ হয়ে ওঠেছিল বিজয় উদযাপনের চিরায়ত প্রতীক।

দিনের শুরুর ভাগেই বিজয়ের লাল-সবুজ সাজে নিজের শিশু সন্তানকে কাঁধে চড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের বেদির দিকে আসছিলেন এক বাবা। শিশুটির হাতে পতাকার সঙ্গে গালেও আঁকা ছিল লাল-সবুজের পতাকা আর মুখে যেন বিজয়ের হাসি।

সাহস যুগিয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা

একাত্তরের সহযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে এদিন দিনভর স্মৃতিসৌধে এসেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধারাও। 

স্মৃতিসৌধের সামনে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেকোনো অপতৎপরতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস যুগিয়েছেন তারা।

এক নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা শেখ রুহুল আমিন বলছিলেন, “আমাদের সঙ্গে চিটিং করার মত অবস্থা ঘটে গেছে। যেখানে আমাদের গণতন্ত্রের বালাই নেই, ধর্মনিরপেক্ষতার ধারে কাছে নেই। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে, যে যেই বয়সেই থাকেন না কেন। একাত্তরের আকাঙ্খা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে হবে।”

জাতির সূরর্য সন্তানদের শ্রদ্ধা জানাতে এসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী লামিশা জামান বলেন, “গত ১৬ বছর পড়ে এসেছি এক ইতিহাস, এখন আবার গত এক বছর ধরে পড়ছি আরেক ইতিহাস। যারা ইতিহাসগুলো নতুনভাবে রচনা করে তারা হয়তোবা ভুলে যায় যে, নতুন প্রজন্ম অবশ্যই ইতিহাস সম্পর্কে কিছুটা অন্তত জানে।

“তারা যতই ইতিহাস যতভাবেই রচনা করুক না কেন, আমরা আসলে বুঝতে পারি আসলে যে বিজয়টাকে, স্বাধীনতাকে বা মুক্তিযুদ্ধকে কারা ধারণ করে।

“একটা স্বাধীন দেশে দাঁড়িয়ে এমন কোনো দল, যারা মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করে মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে বা এমন কোনো দল যারা শুধু মুখেই মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে। এমন কোনো দলকে আমরা ভবিষ্যতে এই দেশের রাজনীতিতে বা এই দেশের প্রেক্ষাপটে আগাতে দেবো না।”

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার নামের একটি সংগঠনের প্রচার সম্পাদক আব্দুল হাকিমও কথাপ্রসঙ্গে বলছিলেন, “বিজয় দিবস আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। লাখ লাখ জীবনের বিনিময়ে আমরা এ বিজয় অর্জন করেছি। বিগত বছরগুলোর চেয়ে স্বৈরাচার হাসিনা পতনের পর থেকে এখন একটি গোষ্ঠী আমাদের এ মহান অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে;   বিজয় দিবস এবং একাত্তরকে ছোট করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে।

“এই সংকট সময়ে আমাদের আরো একতাবদ্ধ হতে হবে; একাত্তর ও বিজয়কে আরো প্রাসঙ্গিক করে তুলতে আমাদেরকে বিজয়গাঁথা এবং বীরদের স্মরণ করতে জাতীয় স্মৃতিসৌধে সম্মান প্রদর্শনকে আরো উদ্বুদ্ধ করতে হবে। একাত্তর এবং বিজয় দিবসের গৌরব অক্ষুণ্ণ, চিরঅম্লান এবং প্রাসঙ্গিক রাখতে আমাদের সকলকে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে যেন কোনো অপশক্তির মর্যাদা ক্ষুন্ন করতে না পারে।”

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে ‘সুযোগ সন্ধানীদের’ বিষয়ে তাদের মত স্মৃতিসৌধে আসা অনেকেই সচেতন। তাদের মত অনেক রাজনৈতিক নেতাকেও এ নিয়ে কথা বলতে দেখা গেছে এদিন।

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেছেন, “আমরা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ নামে একটা রাষ্ট্র নির্মাণ করেছি। এটা আমাদের সবচেয়ে বড় এচিভমেন্ট। জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটি সুন্দর মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার একটা সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতা বিরোধীরা তারা আজকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ৭২ এর সংবিধান এবং আমাদের মীমাংশিত বিষয়গুলো বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

“এতে চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরে আমাদের দেশে গণতন্ত্র এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার যে একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এই যে বিভক্তি এবং বিভাজন এবং মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করার যে একটা অপচেষ্টা, তার ফলে কি হচ্ছে? আমরা মনে করছি যে এই অর্জনটাও আমাদের বাধাগ্রস্ত হতে পারে।”

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “আমরা আজকে এই বিজয় দিবসে আসছি, আমরা দেখছি স্বাধীনতা বিরোধীদের আস্ফালন। এই একাত্তরের ঘাতক রাজাকারদের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। একই সাথে গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।”

বিজয়ের দিনে তিনি বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে প্রকৃত ইতিহাস জানার আহ্বান রেখে বলেন, “তারা জানুক মুক্তিযুদ্ধকে কেউ বিকৃতি করছে, কেউ মুক্তিযুদ্ধকে ছুড়ে ফেলে দিতে চাইছে। আর কেউ ক্ষমতায় থাকার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। এদের থেকে মুক্তিযুদ্ধকে উদ্ধার করে প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে।”