Published : 08 Aug 2026, 03:48 PM
এক-এগারোর সেনাসমর্থিত সরকারের সময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ডিজিএফআইয়ের গোপন বন্দিশালা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল-জেআইসিতে নির্যাতনের তথ্য পাওয়ার কথা বলেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম।
শনিবার ঢাকা সেনানিবাসে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর-ডিজিএফআই কমপ্লেক্সে থাকা জেআইসি পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “এক-এগারোর সময়ে আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের অহংকার জনাব তারেক রহমানকে আজকের যে জেআইসি সেলটি আমরা পরিদর্শন করেছি, তারই কোনো একটি কামরায় তাকেও সেখানে আনা হয়েছিল এবং তার ওপর নির্যাতন করা হয়েছিল।”
সাক্ষীদের বর্ণনা থেকে পাওয়া তথ্য পর্যায়ক্রমে বিচারে প্রতিফলিত হবে, বলেন তিনি।
সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ৭ মার্চ ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল সড়কের বাসা থেকে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করে যৌথ বাহিনী। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় ১৩ মামলা। যৌথ বাহিনীর হেফাজতে তাকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তারেক রহমানকে ভর্তি করা হয় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে।
এক বছর পর, ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতের জামিনে মুক্তি পান তারেক। সেই রাতেই স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে ‘উন্নত চিকিৎসার জন্য’ লন্ডনে চলে যান তিনি। শুরু হয় নির্বাসিত জীবন। প্রায় দেড় যুগ পর গত বছর ডিসেম্বরে দেশে ফিরেন তারেক রহমান। ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে তার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বিএনপি।
বিগত সরকারের সময়ে জেআইসিতে ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরে আমিনুল ইসলাম জানান, “এটি মূলত মানুষকে ধরে এনে অত্যাচার ও নির্যাতন চালানোর একটি সেল ছিল, যা পরে ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিতি পায়। এই বন্দিশালার কক্ষগুলো ছিল সাউন্ডপ্রুফ এবং জানালা-দরজাবিহীন অন্ধকার প্রকোষ্ঠ।
“সেখানে ভারী এক্সজস্ট ফ্যান লাগানো ছিল, যাতে বন্দিদের কান্নার শব্দ বাইরে যেতে না পারে। এখানে ব্রিগেডিয়ার আযমীসহ অনেককে দিনের পর দিন অমানবিকভাবে আটকে রাখা হয়েছিল।”
দীর্ঘদিন পরিবার ও আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত করে আটকে রাখাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, “একটা মানুষকে যখন আপনি দিনের পর দিন বন্দি করে রাখবেন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখবেন, আইনের সহায়তা লাভ থেকে বঞ্চিত করবেন, এটা—এটা সবটাই কিন্তু ‘ক্রাইমস অ্যাগেইনস্ট হিউম্যানিটি’।”
প্রচলিত আইনে ২৪ ঘণ্টার বেশি আটকে রাখার সুযোগ না থাকলেও মাসের পর মাস বন্দি রাখার কোনো যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করে আমিনুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “কী কারণে এই আয়নাঘরের প্রয়োজন হয়েছিল, রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্টদেরই এর ব্যাখ্যা দিতে হবে।”
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটা আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ‘গুম’, খুনের অভিযোগ ওঠে। অভ্যুত্থানের পর ‘গুমের শিকার’ কেউ কেউ ফিরে আসেন। গুমের ঘট্না তদন্তে কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ভারতে আশ্রিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। । বিচার চলছে তার সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, এমপি ও আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে।
৫ আগস্টের পর জেআইসিতে নতুন করে রং ও প্লাস্টার করে প্রমাণের আলামত নষ্ট করার চেষ্টার অভিযোগও করেন প্রধান কৌঁসুলি।
তিনি বলেন , “সেখানে বন্দি থাকা হুম্মাম কাদের চৌধুরীর নিজ হাতে লেখা ‘HQ3’ প্রতীকী চিহ্নটি সাদা রং করে প্লাস্টার করে দেওয়া হলেও তা এখনো একটি কক্ষে বিদ্যমান। জেআইসি ও টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন-টিএফআই সেলে পাওয়া এসব আলামত সিলগালা করে প্রসিকিউশনের হেফাজতে রাখা হয়েছে।”
আমিনুল ইসলাম জানান, জেআইসিতে ২৬টি এবং টিএফআইতে ২৯টি কক্ষ ছিল। এর বাইরে র্যাব-২ এর দপ্তরে আরও একটি ‘আয়নাঘর’ ছিল, যেখানে নির্যাতনের জন্য ইলেকট্রিক চেয়ার বসানো হয়েছিল।
এছাড়া গোয়েন্দা পুলিশ-ডিবির টিএফআই সেলটিও সিলগালা করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে পরিদর্শন করা হবে, বলেন তিনি।
এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীদের সমালোচনা করে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, “শেখ হাসিনা তার যখন যেমন মন চায়, সেভাবে কথা বলেন, তাদেরই প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের ডিফেন্সের বন্ধুরাও একই ভাষায়, একইরকম করে বিভ্রান্তিমূলক কথা বলেন।”
বিগত সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুম-খুনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে আমিনুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক আন্দোলনে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছে এবং ১ হাজার ৪০০ জন ‘শহীদ’ হয়েছে। এছাড়া ৪ হাজারের বেশি মানুষ খুন ও ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন। ইলিয়াস আলীসহ ২৫০ জনের এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি।
বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, “আমরা কোনো গোপনীয় ট্রায়াল করছি না, আমরা কোনো ক্যামেরা ট্রায়াল করি না। আমরা যে ট্রায়ালটা করছি, এটা অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে, সারা পৃথিবীর মানুষ আমাদের এই ট্রায়াল দেখছে।”
তিনি বলেন, “আমার মনে হয় বাংলাদেশ পৃথিবীতে একটা নজির হয়ে থাকবে যে এর চেয়ে স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক মানের বিচার, আমার মনে হয় পৃথিবীতে অন্তত বাংলাদেশ করে দেখিয়েছে।”
ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আর কোনো গোপন বন্দিশালা যেন প্রতিষ্ঠিত না হয়, সেই আহ্বানও জানান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি।
এদিন সকালে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার, সদস্য বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী এ বন্দিশালা পরিদর্শন করেন।
এ সময় প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রসিকিউশন টিম, আসামিপক্ষের আইনজীবী, ডিজিএফআইয়ের প্রধান, পূর্বনির্বাচিত সংবাদমাধ্যমকর্মী সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ডালিম, কার্যনির্বাহী সদস্য মাজহারুল হক মান্না, ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি মো. ইয়াসিন, সাধারণ সম্পাদক আরাফাত মুন্না এবং সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।