ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য নজির বাংলাদেশ: পোপ
বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে বিশ্বের জন্য অনন্য নজির হিসেবে তুলে ধরেছেন ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস।
তিন দিনের সফরের শেষ দিন শনিবার সকালে তেজগাঁওয়ে মাদার টেরিজা হাউজে যাজক ও ধর্মীয় নেতাদের উদ্দেশে বক্তৃতায় বাংলাদেশের প্রশংসা ঝরে তার কণ্ঠে।
এরপর নটরডেম কলেজে তরুণদের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার পর বিকালে শাহজালাল বিমানবন্দর হয়ে ফিরে যান পোপ ফ্রান্সিস।
পোপ ফ্রান্সিস বাংলাদেশ সফরে আসা তৃতীয় পোপ। সর্বশেষ সফরে এসেছিলেন পোপ জন পল ৩০ বছর আগে।
পোপ ফ্রান্সিসকে বিদায় জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী
মাদার টেরিজা হাউসে বক্তৃতায় মানুষ-মানুষে বিভেদকে ‘সমাজের খুঁত’ আখ্যায়িত করে পোপ বলেন, “বাংলাদেশ হল আন্তঃধর্ম ও ঐকতানের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।”
পোপ তার ভাষণে খ্রিস্টান যাজক, ধর্মগুরু ও ধর্মীয় নেতা প্রত্যেককে ‘শুভ বীজ’ অভিহিত করে বলেন, “বীজের বেড়ে উঠার খেয়াল রেখো, বীজকে কোমল রেখো। অশুভ বীজ ও আগাছা থেকে সাবধান থাকতে হবে।
“ঈশ্বরের কাছে প্রতিদিন প্রার্থনা করবে যাতে তিনি বীজকে শুভ রাখেন, কারণ তিনিই বীজ তৈরি করেছেন। বীজকে এমনভাবে পরিচর্যা কর, যাতে তা ঈশ্বরের আত্মজ্ঞান হিসেবে প্রতীয়মান হয়।”
তেজগাঁওয়ে হলি রোজারিও চার্চে যাজক ও ধর্মীয় নেতাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন পোপ ফ্রান্সিস- ছবি: পিআইডি
পোপ তার ভাষণে সবাইকে সমালোচনা ও পরনিন্দা থেকে দূরে থেকে আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকার মন্ত্র দেন।
“কারও সম্পর্কে নিন্দা করা একটি মানুষের একটি ত্রুটি। পিছনে কথা বলা সমাজের শান্তি বিঘ্নিত করে। পরনিন্দা করা এক ধরনের সন্ত্রাসবাদ, কারণ যেমন পরনিন্দা আড়ালে হয়ে থাকে তেমনি সন্ত্রাসবাদও।
“কোন মানুষকে অপছন্দের কথাটি যদি সম্ভব হয় মুখের সামনে বলে দাও, যদি তা না পারও তাহলে এই কাজে সহায়তা করতে পারে এমন শুধু একজনকে বলবে, আর কাউকে নয়।”
“উদ্বিগ্নতা ও ভারাক্রান্ত মন থেকে অশুভ বীজ সৃষ্টই হয়, তাই নিজকে সব সময় উৎফুল্ল রাখবে। জীবন সবচেয়ে কঠিন সময়েও তোমাকে হাসতে হবে,” বলেন পোপ।
ভাষণের পর চার্চের কবরস্থান পরিদর্শন করেন পোপ ফ্রান্সিস।
তেজগাঁওয়ে হলি রোজারিও চার্চের কবরস্থান পরিদর্শনে পোপ ফ্রান্সিস- ছবি: পিআইডি
নটরডেম কলেজে প্রায় ৭ হাজার তরুণের সামনে বক্তৃতায় পোপ আত্মকেন্দ্রিকতা পরিহারের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, যখন কোনো ব্যক্তি কিংবা কোনো সমাজ কিংবা কোনো ধর্ম বলে তারাই সেরা, তখনই তাদের পতনের শুরু হয়।
‘আমি ভালো, তুমি মন্দ’- এটা বাদ দিয়ে সবাইকে ‘আমাদের’ ভাবতে আহ্বান জানান পোপ।
নটরডেম কলেজে পোপ ফ্রান্সিসের বক্তৃতা শুনছেন তরুণরা- ছবি: পিআইডি
রোহিঙ্গা সঙ্কটের মধ্যে পোপের এই বাংলাদেশ সফর বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছিল বিশ্ব সম্প্রদায়।
ঢাকায় আসার আগে মিয়ানমার সফরে রাখাইনে নিপীড়নের সমালোচনা করলেও রোহিঙ্গাদের নাম উচ্চারণ না করায় সমালোচনা হচ্ছিল তার।
তৃতীয় পোপ হিসেবে বাংলাদেশ সফর করলেন পোপ ফ্রান্সিস
বৃহস্পতিবার ঢাকায় আসার পর বঙ্গভবনে এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় মিয়ানমারের নিপীড়িত মুসলিম জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন ক্যাথলিক ধর্মগুরু। বিশ্ববাসীকে আহ্বান জানান এই সঙ্কট মোকাবেলায় বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে।
পরদিন কাকরাইলের সেন্ট মেরিস ক্যাথেড্রালে রোহিঙ্গাদের তিনটি পরিবারের ১৬ জন সদস্যের সাক্ষাৎ দেন পোপ। তাদের দুর্দশার কথা নিজের কানে শুনে আবেগময় হয়ে পড়েন তিনি; তখন রোহিঙ্গা নামটিও তিনি উচ্চারণ করেন।
ঢাকায় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে পোপ ফ্রান্সিস
রোহিঙ্গা সঙ্কটে পোপের এই বার্তাকে নিজেদের পক্ষে অর্জন হিসেবেই দেখছে বাংলাদেশ সরকার।
