Published : 03 Sep 2026, 01:01 AM
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে বিরোধী দলের সদস্যদের ‘সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের’ কথা লেখা নিয়ে সংসদে বিতর্ক হয়েছে।
বিরোধী দলের সদস্যরা বলেছেন, তারা বিল দুটির বিস্তারিত আলোচনায় অংশ নেননি। নিজেদের আপত্তি জানিয়ে কমিটির বৈঠক থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তাই প্রতিবেদনে ‘সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ’ লেখাটা ঠিক হয়নি।
সরকারি দলের মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কমিটির সভাপতিরা বলেছেন, বিরোধী দলের সদস্যরা বিল নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন। ফলে সেটিও আলোচনায় অংশগ্রহণ হিসেবে ধরা হয়েছে।
বুধবার জাতীয় সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬ এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর এ বিতর্ক হয়।
একই দিনে ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬ নিয়েও আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
বিল তিনটি গত ২৭ অগাস্ট সংসদে তোলা হয়েছিল। এরপর পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের কমিটির আলোচনায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিরোধী দল।
‘সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ’ নিয়ে আপত্তি
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুহাম্মদ নওশাদ জমির জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।
প্রতিবেদনের এক জায়গায় বিলটি পরীক্ষায় যেসব সদস্য ‘সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ’ করেছেন, তাদের মধ্যে বিরোধী দলের সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান ও আল ফারুক আব্দুল লতিফের নামও রাখা হয়।
অন্য অংশে বলা হয়, বিলের ওপর আলোচনার শুরুতে বিরোধী দলের সদস্যরা বক্তব্য দেওয়ার পর কমিটি কক্ষ ত্যাগ করেন।
এ নিয়ে আপত্তি জানান নাজিবুর রহমান। তিনি বলেন, কেন তারা বিলের আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন না, সেটি বৈঠকে বিস্তারিতভাবে জানিয়েছিলেন। লিখিত বক্তব্যও কমিটিকে দিয়েছিলেন।
তার অভিযোগ, সেই বক্তব্য প্রতিবেদনে রাখা হয়নি। আবার তাদের ‘সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের’ কথা লেখা হয়েছে।
নাজিবুর বলেন, তারা বলেছিলেন, সরকার ভুক্তভোগী, অংশীজন এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থার মতামত উপেক্ষা করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ রহিত করেছে।
আরও শক্তিশালী আইন করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও নতুন বিলটি আগের চেয়ে দুর্বল ও সীমিত বলে তাদের অভিযোগ ছিল।
বিলটি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ‘প্যারিস প্রিন্সিপলস’ এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সনদ ও ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও তারা আপত্তি জানিয়েছিলেন।
দুই কার্যদিবসের মধ্যে সংসদীয় কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলায় অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ও যথাযথ পর্যালোচনার সুযোগ সীমিত হয়েছে বলেও দাবি করেন নাজিবুর।
এসব কারণে বিরোধী দলের সদস্যরা বিলের আলোচনা ও পাসের প্রক্রিয়ায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।
‘বক্তব্য দিয়েই আলোচনায় অংশ নিয়েছেন’
জবাবে কমিটির সভাপতি নওশাদ জমির বলেন, বিরোধী দলের সদস্যরা কমিটির সামনে তাদের বক্তব্য দিয়েছিলেন।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “ইনঅ্যাকশন ইজ অলসো অ্যাকশন।”
তার যুক্তি ছিল, বিরোধী দলের সদস্যরা বিলের বিরোধিতা করে নিজেদের মত প্রকাশ করেছেন। সেটিও এক ধরনের অংশগ্রহণ।
এর জবাবে নাজিবুর রহমান বলেন, ‘ইনঅ্যাকশন ইজ অলসো অ্যাকশন’ আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার বিষয়, সংসদের নয়।
তিনি বলেন, তারা সক্রিয়ভাবে আলোচনা করেননি। তাই ‘সক্রিয়’ না লিখে শুধু ‘অংশগ্রহণ’ লেখা যেতে পারে।
তিনি আবারও তাদের লিখিত বক্তব্য প্রতিবেদনে যুক্ত করার দাবি জানান।
বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহেরও বলেন, বিরোধী দলের সদস্যরা কমিটিকে লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন এবং পড়ে শুনিয়েছেন। সেটি প্রতিবেদনে থাকা উচিত।
‘সক্রিয় শব্দটা কেটে দিতে পারেন’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধী দলের সদস্যরা যদি তাদের বক্তব্য ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত হিসেবে দিতেন, তাহলে সেটি প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত করা যেত।
তবে নাজিবুর দাবি করেন, বক্তব্যটি লিখিতভাবেই কমিটিকে দেওয়া হয়েছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে সদস্যদের সব বক্তব্য আলাদাভাবে লেখা হয় না। তাদের বক্তব্য সংসদের কার্যবিবরণীতে থাকবে।
তবে ‘সক্রিয়’ শব্দটি নিয়ে আপত্তির বিষয়ে তিনি বলেন, স্পিকারের এখতিয়ার থাকলে শব্দটি বাদ দেওয়া যেতে পারে।
তিনি বলেন, “অংশগ্রহণ থাকুক। সক্রিয় শব্দটা উনার আপত্তি আছে।”
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, বিলটি পাসের আগে দফাওয়ারি আলোচনায় সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা বিস্তারিত মত দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
আলোচনার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ বিলটি সংসদে অনুমোদিত হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এরপর কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপিত হয়েছে বলে ঘোষণা করেন স্পিকার।
গুম বিলেও একই আপত্তি
এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬-এর প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।
প্রতিবেদনেও কমিটির সদস্যদের ‘সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের’ কথা লেখা ছিল।
এ নিয়ে আপত্তি জানান বিরোধী দলের সদস্য নূরুল ইসলাম।
আরমানের অভিযোগ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পাল্টা বক্তব্য
গুমের শিকার হয়েছিলেন উল্লেখ করে সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমানকে এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেন স্পিকার।
আরমান বলেন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে স্বাধীন কমিশনকে কোনো নোটিস ছাড়াই আটককেন্দ্র পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
নতুন বিলে তদন্তের প্রক্রিয়াকে জটিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার অভিযোগ, এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জবাবদিহির বাইরে রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি বলেন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে বরং দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ ছিল। নতুন বিলে গুমের শিকার ব্যক্তি বা তার পরিবারকে সরাসরি আদালতে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন ধরনের গুমকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
ক্ষতিপূরণ, ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের নিরাপত্তার ব্যবস্থাও বিলে রাখা হয়েছে বলে দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
মানবাধিকার কমিশন প্রয়োজন হলে কোনো নোটিস ছাড়াই সংশ্লিষ্ট স্থান পরিদর্শন করতে পারবে বলেও তিনি জানান।
বিল পাসের সময় বিরোধী দলকে সংশোধনী আনার আহ্বান জানিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, যৌক্তিক প্রস্তাব থাকলে তা বিবেচনা করা হবে।
মানবাধিকার কমিশনে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি রাখার সুপারিশ
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলে কয়েকটি পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
বিলে একজন চেয়ারপারসন ও চারজন কমিশনার নিয়ে কমিশন গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত একজন নারী রাখার কথা বলা হয়েছিল।
সংসদীয় কমিটি এর সঙ্গে অন্তত একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি রাখার সুপারিশ করেছে।
কমিশন গঠনের বাছাই কমিটিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি বা তার মনোনীত মানবাধিকার বিষয়ে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সাংবাদিক প্রতিনিধিকে রাখার সুপারিশও করা হয়েছে।
বিলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের সময় যেকোনো ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে’ যেকোনো স্থান, অফিস-আদালত, হাজতখানা বা আটককেন্দ্র পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়ার কথা ছিল।
সংসদীয় কমিটি ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে’ কথাগুলো বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে।
সুপারিশটি গৃহীত হলে মানবাধিকার কমিশন তদন্তের প্রয়োজনে আটককেন্দ্রসহ সংশ্লিষ্ট স্থান পরিদর্শনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আগাম অনুমতি নিতে হবে না।
সম্পত্তি হস্তান্তর বিলেও বিরোধী দলের ভিন্নমত
এদিন ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬ নিয়েও আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন নওশাদ জমির।
তিনি বলেন, বিলটি পরীক্ষার সময় বিরোধী দলের সদস্যরা ভিন্নমত দিয়েছেন।
বিলটির বিষয়ে ইসলামি স্কলার ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মতামত নেওয়া প্রয়োজন বলে তারা মত দেন।
কমিটি সংশোধিত আকারে বিলটি পাসের সুপারিশ করেছে।