২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

মানবাধিকার কমিশনকে তদন্তে ফৌজদারি ক্ষমতা, সংসদে বিল

আইনশৃঙ্খলা ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগেও কমিশনকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 27 Aug 2026, 11:07 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:28 PM

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে ফৌজদারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তার মত ক্ষমতা, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার এবং কোনো কর্তৃপক্ষকে আগে না জানিয়েই যেকোনো স্থান পরিদর্শনের সুযোগ দিয়ে নতুন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন করতে যাচ্ছে সরকার।

এতে আইনশৃঙ্খলা ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগেও কমিশনকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

এগুলো ছাড়াও আরো কিছু বিধান রেখে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

বিলটি উত্থাপনের পর পরীক্ষা করে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।

বিলটি পাস হলে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন বাতিল হবে।

এর আগে ‘খণ্ডিত সংস্কারের’ অভিযোগ তুলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল উত্থাপনের পর্বে অংশ না নিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল।

পাঁচ বছর মেয়াদে নতুন কমিশনে একজন চেয়ারপার্সন ও চারজন কমিশনার থাকবেন। তাদের অন্তত একজন নারী হতে হবে।

চেয়ারপারসন ও কমিশনার নিয়োগে গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আবেদন বা মনোনয়ন নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। বাছাই কমিটি প্রতিটি পদের বিপরীতে দুজনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে।

কীভাবে অভিযোগ নেওয়া হবে

বিলে মানবাধিকারের সংজ্ঞায় সংবিধান ও দেশের আইনে নিশ্চিত অধিকারের পাশাপাশি বাংলাদেশের অনুসমর্থন করা এবং দেশের আইনে বলবৎযোগ্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিলে স্বীকৃত অধিকারও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘন বা লঙ্ঘনের প্ররোচনার অভিযোগ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার পক্ষে অন্য কেউ লিখিত, মৌখিক কিংবা কমিশনের নির্ধারিত অন্য কোনো মাধ্যমে করতে পারবেন। এর জন্য কোনো ‘ফি’ লাগবে না।

গণমাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যম থেকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য পেলে কমিশন নিজ উদ্যোগেও অভিযোগ নিতে পারবে। 

সাধারণভাবে ঘটনার ছয় মাসের মধ্যে অভিযোগ করতে হবে।

তবে ভুক্তভোগীর আইনগত বা শারীরিক অসামর্থ্য, ভয়ভীতি, বিশেষ পরিস্থিতি অথবা জনস্বার্থের যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকলে কমিশন বিলম্ব মওকুফ করতে পারবে।

১৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত

অভিযোগ পাওয়ার পর ১৫ দিনের মধ্যে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিশনারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সেটি তদন্তে নেওয়ার মত কি না।

কমিশনার অভিযোগ তদন্তে না পাঠালে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে ভুক্তভোগী কমিশনের কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারবেন।

কমিশনকে ৩০ দিনের মধ্যে সেই আবেদন নিষ্পত্তি করতে হবে।

তদন্ত কর্মকর্তার হাতে ফৌজদারি ক্ষমতা

বিল অনুযায়ী, কমিশনের তদন্ত কর্মকর্তা ফৌজদারি কার্যবিধিতে একজন তদন্ত কর্মকর্তাকে দেওয়া ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।

তবে গ্রেপ্তারের ক্ষমতাটি নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে রাখা হয়েছে।

তদন্তের সময় যদি দেখা যায়, কমিশনে অভিযোগ ওঠা একই ঘটনার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো আমলযোগ্য অপরাধের মামলা হয়েছে, তাহলে কমিশনের তদন্ত কর্মকর্তা তাকে গ্রেপ্তার করে থানায় সোপর্দ করতে পারবেন।

এরপর ওই ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তার অধীনে থাকবেন।

মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত কর্মকর্তা ওই মামলার অগ্রগতি পর্যালোচনা করে নিজের প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেবেন।

তদন্তে সর্বোচ্চ চার মাস

তদন্তের আদেশ পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে।

বিশেষ কারণে তদন্ত কর্মকর্তা আবেদন করলে আরও ৩০ দিন সময় দেওয়া যাবে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দায়ী বলে কমিশন মনে করলে তা তার ‘অদক্ষতা ও অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হবে।

বিষয়টি তার বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনে লেখা হবে এবং চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

তদন্ত প্রতিবেদন কমিশনে দেওয়ার পাশাপাশি অভিযোগকারীকেও একটি কপি দিতে হবে।

অভিযোগ সত্য হলে কী হবে

তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে কমিশন তা পর্যালোচনার জন্য দিন ঠিক করবে।

অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নোটিস দিয়ে শুনানি করতে হবে।

প্রথম শুনানির দিন থেকে দুই মাসের মধ্যে শুনানি শেষ করে অভিযোগ নিষ্পত্তির বিধান রাখা হয়েছে।

বিষয়টি আপস অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হলে বা কোনো আদালত কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান কমিশনের চেয়ে বেশি কার্যকর প্রতিকার দিতে পারবে বলে মনে হলে কমিশন তদন্ত প্রতিবেদন সেখানে পাঠাবে।

কমিশনের সেই প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কার্যধারায় সাক্ষ্য আইনের অধীন সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য হবে।

অন্য ক্ষেত্রে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভাগীয়, শৃঙ্খলামূলক বা প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে পারবে কমিশন।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুই মাসের মধ্যে সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন করে কমিশনকে জানাতে হবে।

ক্ষতির দ্বিগুণ বা তারও বেশি ক্ষতিপূরণ

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার আইনগত প্রতিনিধিকে ক্ষতির দ্বিগুণ বা তারও বেশি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবে কমিশন।

ক্ষতিপূরণের অর্থ দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি থেকে আদায় করা যাবে।

অর্থ পরিশোধ না করলে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা কালেক্টরের মাধ্যমে তা আদায়ের ব্যবস্থা থাকবে।

অনাদায়ী ক্ষতিপূরণ আদায়ে ম্যাজিস্ট্রেট পরোয়ানা জারি করতে পারবেন।

প্রয়োজনে দায়ী ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ তিন মাস অথবা অর্থ পরিশোধ হওয়া পর্যন্ত, যেটি আগে ঘটে, কারাদণ্ড দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।

অনুমতি ছাড়াই পরিদর্শন

নতুন আইনে কমিশনকে রাষ্ট্রীয় বা সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবেদন, নথি ও তথ্যপ্রমাণ তলব করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

অন্য কোনো আইনে যা-ই থাকুক, কমিশন তার কাজের প্রয়োজনে যেকোনো সময় যেকোনো স্থান পরিদর্শন করতে পারবে।

এ জন্য ওই স্থান নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নিতে বা আগে থেকে জানাতে হবে না।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কমিশনের পরিদর্শনে সহযোগিতা করতে হবে।

কমিশন সাক্ষীকে সমন দিতে, হাজিরা নিশ্চিত করতে, জিজ্ঞাসাবাদ করতে, শপথের মাধ্যমে সাক্ষ্য নিতে, দলিল তলব করতে এবং ঘটনাস্থল থেকে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারবে।

কারাগার, থানা, হাজতখানা, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র, মানসিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, সেফ হোমসহ যেখানে মানুষের ব্যক্তি-স্বাধীনতা সীমিত রাখা হয়, সেসব জায়গায় আগাম ঘোষণা ছাড়াই পরিদর্শনের জন্য কমিশনের অধীনে ‘জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা ইউনিট’ গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে।

শৃঙ্খলা-বাহিনীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা

বিলে ‘শৃঙ্খলা-বাহিনী’র মধ্যে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, আনসার ও ব্যাটালিয়ন আনসার, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, সরকারি গোয়েন্দা ও তদন্ত সংস্থা এবং র‍্যাবকে রাখা হয়েছে। বিশেষ বা যৌথ বাহিনীও এর আওতায় পড়বে।

এ ধরনের বাহিনী বা সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এলে কমিশন সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে।

প্রতিবেদন সন্তোষজনক না হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে সুপারিশ করতে পারবে কমিশন।

সেই সুপারিশ পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে প্রতিষ্ঠানকে গৃহীত ব্যবস্থা জানাতে হবে।

তারা না জানালে বা ব্যবস্থা কমিশনের কাছে সন্তোষজনক না হলে কমিশন নিজ উদ্যোগে অভিযোগ নিষ্পত্তির সাধারণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে পারবে।

এছাড়া কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে তদন্ত চললে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ বা সুপারিশও করতে পারবে কমিশন।

অভিযোগকারী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সংবাদমাধ্যমে তথ্য প্রকাশকারী, ভুক্তভোগী এবং সাক্ষীর পরিচয় ও গোপনীয়তা রক্ষায় কমিশন আদেশ দিতে পারবে।

প্রতিশোধ, ভয় দেখানো, হুমকি বা অন্য কোনো বিরূপ পদক্ষেপ থেকে তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থাও নিতে পারবে কমিশন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আইনি কাঠামো নিয়ে চলতি বছর কয়েক দফা পরিবর্তন হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০০৯ সালের আইন বাতিল করে নতুন অধ্যাদেশ করা হয়েছিল। সেই অধ্যাদেশের অধীনে ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে নতুন কমিশন গঠন হয়।

ত্রয়োদশ সংসদ বসার পর এপ্রিলে ওই অধ্যাদেশগুলো বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন আবার কার্যকর করা হয়।

সরকার তখন বলেছিল, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ও যাচাই-বাছাই করে মানবাধিকার কমিশনের জন্য আরও শক্তিশালী আইন আনা হবে।

অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার পর এর অধীনে নিয়োগ পাওয়া কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের দায়িত্বও শেষ হয়ে যায়।

পরে নতুন আইনের খসড়া নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ মতামত দেয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ নিয়োগের বাছাই কমিটিতে সরকারের প্রতিনিধিত্ব বেশি থাকায় কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।

সংস্থাটি অন্তত দুজন নারী এবং নৃ-গোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী থেকে অন্তত একজন কমিশনার রাখার সুপারিশও করেছিল।

সংসদে ওঠা বিলে অন্তত একজন নারী রাখা বাধ্যতামূলক করা হলেও নৃ-গোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি বাধ্যতামূলক করা হয়নি; যোগ্য প্রার্থী থাকলে তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

১০ অগাস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়।