সরু গলি, তাপ ও পানির ঘাটতি ‘কঠিন করেছে’ চকবাজারে আগুন নেভানোর কাজ
আশেপাশের মার্কেটগুলো যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হইতে না পারে, সেই চেষ্টা চালিয়ে গেছি এবং সেই চেষ্টা সফল হইছি।”
পুরান ঢাকার চকবাজারে মুনসুর খান প্লাজায় আগুন লাগার ১৭ ঘণ্টা পরও তা পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান বলছেন, তাপ, সরু গলি, পানির ঘাটতি, গুদামের পণ্য, শাটারের তালা কাটার মতো কাজ তাদের ‘দায়িত্বকে কঠিন’ করে তুলেছে।
মঙ্গলবার বেলা ১১টার পর ঘটনাস্থলে তিনি এসব কথা বলেন।
নজমুজ্জামান বলেন, “আগুন ভেতরে নাই। কিন্তু যে মালামালগুলো আছে, সেই মালাগুলোর নিচে হালকা-পাতলা ধোঁয়া আছে।
“যখনই আমরা পানিটা বন্ধ করে দেব, তখন এই ধোঁয়া থেকে- হিট থেকে আগুনটা আবার বাড়তে পারে।”
সোমবার বিকাল ৫টার দিকে মুনসুর খান প্লাজায় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিটের চেষ্টায় মঙ্গলবার ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর আরো ৮ ঘণ্টা পেরোলেও আগুন নির্বাপণের ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
কাজী নজমুজ্জামান বলেন, মার্কেটের ষষ্ঠ তলায় ৭-৮টি গুদামে বিপুল পরিমাণ মালামাল রয়েছে, যেগুলো পুরোপুরি সরানোর আগে তারা আগুন নির্বাপণ ঘোষণা করতে পারবেন না।
“এইটা একটু সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। আমাদের প্রায় ৬টা ইউনিটের কার্যক্রম চলমান আছে এবং আমরা পানি দিচ্ছি এবং মালামালগুলো সরানোর চেষ্টা করতেছি।”
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, সোমবার বিকাল ৫টা ৪ খবর পাওয়ার পর তারা ৫টা ২২ মিনিটে গিয়ে কাজ শুরু করেন। প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের ৩টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে যোগ দিয়েছিল, পর্যায়ক্রমে ইউনিট বাড়িয়ে ১০টি করা হয়।
আগুনের শুরুর প্রসঙ্গ টেনে ফায়ার কর্মকর্তা কাজী নজমুজ্জামান বলেন, “আমরা এসে দেখি ছয়তলা এবং সাততলায় প্রচণ্ড ধোঁয়া এবং প্রচণ্ড হিট। হিটের ভেতরেই আমরা আমাদের ফায়ার সার্ভিসের যে টেকনিক, সেসব অ্যাপ্লাই করে আমরা আগুন নিভানোর চেষ্টা করি।
“কিন্তু ছয়তলার মধ্যে যে গুদামগুলো ছিল, সবগুলো ছিল শাটার এবং তালা মারা। এই ধোঁয়া এবং হিটের ভেতরে আমরা…এক একটা গুদামে চারটা-পাঁচটা তালা। আবার ভেতর দিয়ে কলাপসিবল গেইটের তালা।
“এই ধোঁয়া এবং হিটের ভেতরে এই তালাগুলোকে আমাদেরকে কাটতে হয়। কাটার পরে আমরা ফায়ার ফাইটিং করি এবং ভোর পাঁচটা পাচটা ২০ মিনিটে আগুনটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসি।”
অগ্নিনির্বাপণের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “প্রথম গতকালকে ওই সময়টা ছিল পিকআওয়ার। যে যথাসময়ে আমাদের গাড়িগুলো পৌঁছার কথা, সেগুলো পৌঁছতে একটু সময় নিছে। যেহেতু চকবাজার রাস্তা অত্যন্ত সরু থাকে, যার কারণে গাড়িগুলো আসতে একটু সময় লাগছে।
“দ্বিতীয় কথা হলো—এই ভবনের যে ধোঁয়াগুলো আছে সেগুলো বের হওয়ার কোনো রাস্তা নাই। যার কারণে আমাদের ফায়ার ফাইটাররা প্রচণ্ড হিটের ভেতরে কাজগুলো করছে এবং আগুন নেভানোর জন্য কার্যক্রম আমাদের চলমান ছিল।”
আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পানির ঘাটতি ছিল জানিয়ে কাজী নজমুজ্জামান বলেন, “আরেকটা চ্যালেঞ্জ ছিল, আমাদের পানির একটু সমস্যা ছিল। আশেপাশে যে রিজার্ভার ছিল, রিজার্ভগুলোর পানিগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছিল বারবার।
“যার কারণে আমাদের পাম্প চেঞ্জ করে অর্থাৎ রিজার্ভার চেঞ্জ করে করে আরেকটা রিজার্ভারে নিয়ে আমরা আগুনটা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চলমান রেখেছি।”
সবশেষ পরিস্থিতির কথা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, “বর্তমানে যে পরিস্থিতি আছে, সেটা হলো ভেতরে আগুন নাই। কিন্তু যে মালামালগুলো আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হইছে সেই মালামালগুলো পুরা গুদাম ভর্তি করা। এই মালামালগুলো সরানো হচ্ছে, পানি দেওয়া হচ্ছে। যার কারণে মাঝে মাঝে ধোঁয়া বের হচ্ছে।”
গুদামগুলোর মধ্যে ছাতা, কসমেটিকস, আতরসহ অন্য মালামাল রয়েছে জানিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা নজমুজ্জামান বলেন, “মালামালগুলো সম্পূর্ণ গুদাম ভর্তি করা। এই মালামালগুলো সরানোর আগ পর্যন্ত এই আগুনটা আমরা সম্পূর্ণভাবে নির্বাপণ দিতে পারি না। আমাদের দিক দিয়ে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এবং ডাম্পিংয়ের পর্যায়ে আছে।
“আমরা যদি চলে যাই, হঠাৎ করে আগুন ধরতে পারে, ধোঁয়া বের হইতে পারে। যার কারণে আমরা অবস্থান করতেছি, চেষ্টা করতেছি যাতে সম্পূর্ণ মালামাল সরানো হবে এবং আমরা নির্বাপণ (ঘোষণা) দিয়ে দিব। যত তাড়াতাড়ি সারানো যাবে ততো তাড়াতাড়ি আগুনটা নির্বাপণ দিতে পারব।”
এক প্রশ্নের জবাবে ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা বলেন, “আগুন নির্বাপণের কার্যক্রম আমাদের এখনো চলমান। আমরা বিভিন্ন গুদামগুলো আমরা দেখতেছি, কিন্তু এই মালামালগুলো যে মালিক কর্তৃপক্ষ আছে, তারাই বলতে পারবে তার কত টাকার মাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এটা একটু সময় সাপেক্ষে ব্যাপার।
“আর আগুনের কারণটা এখন আমরা বলতে পারব না। যেহেতু আমাদের আগুন নির্বাপণ কার্যক্রম চলমান অবস্থায় আছে, যার কারণে কারণটা এখনই বলতে পারব না। আমাদের একটা তদন্ত কমিটি হবে, তদন্ত হওয়ার পরে বলতে পারব আগুনটা কী কারণে লাগছে। বিশেষ করে আমরা যাদের সাথে আলাপ করছি কেউ বলতে পারেনি আগুনের কারণটা। যেহেতু এখানে বৈদ্যুতিক লাইন ছিল, একটা সম্ভাবনা থাকতে পারে শর্ট সার্কিটের। তদন্ত করার পর বোঝা যাবে আগুনটা কেন লাগছে।”
আগুনের ভয়াবহতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “জনগণ যেভাবে মনে করছিল অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেভাবে কিন্তু মার্কেটটা ক্ষতিগ্রস্ত হয় নাই। এই প্লাজার সাথে আরো তিন থেকে চারটা মার্কেট একসাথে অ্যাড করা আছে। আমরা চেষ্টা করছি আগুনটা যাতে আশেপাশে কোন জায়গায় ছড়ায়ে যাইতে না পারে।
“বিশেষ করে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল, মাঝে মাঝে আগুনটা বের হয়ে যাচ্ছিল। আমরা আমাদের আপ্রাণ চেষ্টা করেছি, আগুনটা যাতে অন্যান্য ভবনে যেতে না পারে। শুধুমাত্র ছয়তলাটাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হইছে, সাততলা হালকা ক্ষতিগ্রস্ত হইছে, তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় নাই। ছয়তলাতে ১২টা থেকে ১৪টা গুদাম আছে। যে গুদামের ভেতরে ৭-৮টাতে আগুন ছিল, বাকিগুলাতে আগুন ছিল না, পানির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হইছে।”
ফায়ার সার্ভিসের ‘যথাসময়ে যথাযথ পদক্ষেপের কারণে’ আশেপাশের ভবনগুলো রক্ষা পেয়েছে বেল ভাষ্য কাজী নজমুজ্জামানের।
“আপনারা দেখতে পাইছেন, প্রচণ্ড ধোঁয়া আর হিটের কারণে আমাদের একজন ১৫-২০ মিনিট কাজ করতে পেরেছি, আবার চেঞ্জ করে আরেকজনকে আমরা পাঠাচ্ছি। এভাবে আমরা আগুনটা আমরা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পেরেছি। আশেপাশের মার্কেটগুলো যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হইতে না পারে, সেই চেষ্টা চালিয়ে গেছি এবং সেই চেষ্টা সফল হইছি।”
আগুনে কোনো হতাহতের খবর পায়নি ফায়ার সার্ভিস। তবে প্রচণ্ড ধোঁয়া এবং তাপে কাজ করতে গিয়ে তাদের চার কর্মী আহত হয়েছেন বলে জানান তিনি।
আহত হয়ে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নেওয়া চারজন হলেন- ফায়ার ফাইটার জিল্লুর রহমান, টিম লিডার নজরুল ইসলাম, মাহাফুজুর হক মজুমদার ও স্টেশন অফিসার মারুফ।
